প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপির ‘চূড়ান্ত লড়াই’ সেপ্টেম্বরে

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষের দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সেই নির্বাচন না হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা। এমন বাস্তবতায় দলটি বহুমুখী কৌশল ও পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে চায়। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মোক্ষম সময় হিসেবে ধরা হচ্ছে সেপ্টেম্বরকে।

বিএনপির নীতি নির্ধারক পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপে এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

দলটির শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য, খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী রেখে ও নির্দলীয় সরকার ছাড়া তারা একাদশ নির্বাচনে যাবেন না।

বিরোধী মতও আছে। দলটির কয়েক নেতার মতে, শুধু নির্দলীয় সরকারের দাবি পূরণ হলেও নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়টি ভেবে দেখবে দলটি।

বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা যায়, এই মুহূর্তে দলটির দুটি লক্ষ্য- খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করে পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়া। এই লক্ষ্য সামনে রেখে সেপ্টেম্বরকে গণআন্দোলনের মাসে পরিণত করতে চায় বিএনপি। এই মাসটিকেই করতে চায় চূড়ান্ত লড়াইয়ের মাস। সেটি বাস্তবায়নে এখন চলছে উঠান বৈঠক ও সাংগঠনিক সফর।

বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানান, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের বাস্তবতা ভিন্ন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জয়-পরাজয়ে সিটি নির্বাচন ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তাই আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেবে না দলটি।

সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনগণের কাছে খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনকে আরও বেগবান করার চিন্তা নেতাদের। তাই সাবেক দুই মেয়র পদপ্রার্থীর বদলে সাংগঠনিক নতুন দুই নেতাকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

আন্দোলনের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘নির্দলীয় সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে বিএনপি পিছু হটেনি, দাবি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলছে; বরং সেই আন্দোলনের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন।’

এক প্রশ্নের জবাবে ড. মোশাররফ বলেন, ‘আমরা গণআন্দোলনের দিকে যাচ্ছি এমনটা নয়, বরং সরকারই ইস্যু তৈরি করে গণআন্দোলনের দিকে বিএনপিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা এখনো শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। এর জন্য আমাদের অনেক নেতাকর্মীকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে, হচ্ছে।

সময় হলেই দৃশ্যমান হবে বিএনপির আগামী দিনের আন্দোলন। আপাতত ইস্যুভিত্তিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে চাচ্ছি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘অনুমতির বেড়াজালে বন্দী হয়ে পড়েছে বিএনপির আন্দোলন-এই কথাটি সঠিক নয়; বরং সরকার বিএনপির রাজনীতির জালে আটকে পড়েছে। এখন মুক্তির পাঁয়তারা করতে একেক সময় একেক ধরনের কথাবার্তা বলে জনগণের আয়নায় ভালো থাকার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। কেননা ক্ষমতার মোহে তারা ইতিমধ্যে জনগণ থেকে প্রায় বিছিন্ন হয়ে আছে।

মূলত তারা দলীয় সরকার অর্থাৎ, নিজেদের অধীনে নির্বাচন দিতে চায়। কারণ ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসে আওয়ামী লীগের মধ্যে নানা রকম ভীতি কাজ করছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের জনপ্রিয়তা এতটাই তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে যে, কোনো রকমের একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় চলে আসবে।’

এই নেতা বলেন, ‘আন্দোলনের ফসল বিজয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বল্প সময়ে, সহজে আসে না। আমরাও হয়তো এখনো আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে পারিনি। তবে আর খুব বেশি দিন নয়, বিএনপির আন্দোলন এমন জায়গার দিকে যাচ্ছে যে, সেই আন্দোলনের বিস্ফোরণে বর্তমান সরকার বিদায় নিতে বাধ্য হবে এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার আন্দোলন দিন দিন জোরদার হচ্ছে। দলের নেতাকর্মীদের বলেছি, অস্ত্র শুধু থাকলেই ব্যবহার করা যায় না, মাঝে মাঝে সেটাকে শান দিতে হয়, ধারালো করতে হয়। তাহলেই সেটাকে ব্যবহার করা যায়। এখন সেই অস্ত্র শাণিত করার সময়। তাই ঐক্য সৃষ্টি করে যথাসময়ে সেই শাণিত অস্ত্র ব্যবহার করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, আলোচনার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। দাবি আদায়ে বিএনপির চলমান আন্দোলন সময়ের অপেক্ষায় গণআন্দোলনে রূপ নিতে যাচ্ছে। বিএনপিও মিছিল, স্লোগানে সরকার পতনের আন্দোলনে দিকেই অগ্রসর হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, চলতি বছরেই সংবিধান অনুযায়ী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ইতোমধ্যে বিএনপির ৫১টি টিম সারা দেশ সফরে নেমেছে। নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে ঘরোয়া সভা, উঠান বৈঠক ও মতবিনিময় করে যাচ্ছেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন ও নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ের জন্যই বিএনপি ঘর গোছাতে শুরু করেছে।

‘নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে জেলায় জেলায় সমাবেশ করছে বিএনপি। যেসব জেলায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ আছে, সেখানে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে, কোথাও কোথাও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতাকে সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে,’ বলেন স্থায়ী কমিটির ওই সদস্য।

এক প্রশ্নের জবাবে এই নেতা আরও বলেন, ‘সংলাপ-সমঝোতার পথ খোলা রেখেই দাবি আদায়ে রাজপথে গণআন্দোলনে যাওয়ার সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। আপাতত নির্বাচন নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। আওয়ামী লীগ যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করতে চাচ্ছে, তাতে নিজেদের জয় নিশ্চিত করা ছাড়া অন্য কিছু তাদের মাথায় নেই। ফলে বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থাও বিএনপির কাছে সুস্পষ্ট। তাই এত অস্থিরতার কিছু নাই।

গণআন্দোলনেই বর্তমান অনির্বাচিত সরকারের বিদায় হবে। জনগণের দাবি প্রতিষ্ঠিত হবে। এমনও হতে পারে, গণআন্দোলন ছাড়াই সরকার অন্তত রাজনৈতিকভাবে নিজেদের বাঁচাতে সকল দলের অংশগ্রহণে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে বাধ্য হবে।’

আন্দোলনের বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সংলাপ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে। এই মুহূর্তে বিএনপির সামনে পথ একটাই-তা হলো রাজপথের আন্দোলন। আর বিএনপিও মনে করে, আন্দোলনের মাধ্যমেই সরকারের পতন ঘটিয়ে দাবি আদায় করা সম্ভব। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নেই সাংগঠনিকভাবে নিজেদের আন্দোলন উপযুক্ত করতে সতর্ক অবস্তায় সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কারণ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে বিএনপি অন্তত এটা নিশ্চিত হয়েছে, আওয়ামী লীগ যেকোনো মূল্যে আবারও ক্ষমতায় আসতে চায়।

নিজেদের জয় নিশ্চিত হয়, দলীয় সরকারের অধীনে এ রকম একটি নির্বাচনী ছক ইতিমধ্যে তৈরি করেও রেখেছে, যা বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই বিএনপির এখন লক্ষ্য যে করেই হোক, খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করতে হবে।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী বলেন, ‘এখনই সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলনে যাওয়ার চিন্তা করছে না বিএনপি। নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার যে দাবি তারা জানিয়ে আসছে, তা অব্যাহত থাকবে; বরং দাবির পক্ষে জনমত গঠনের কাজ করছে দলটি। এ ছাড়া নির্বাচনের একটি বিস্তারিত রূপরেখাও ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার। তবে সরকার যদি বিএনপির দাবিকে উপেক্ষা করে নির্বাচন করতে চায়, তাহলে শক্ত হাতে প্রতিরোধ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।’

কয়েকদিন আগে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার সমঝোতায় না আসলে বিএনপি হয়তো বা সংলাপের আশায় বসে থাকবে না। আন্দোলনের মাধ্যমেই সব সমস্যা সমাধান হবে। সূত্র : প্রিয়.কম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত