প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপি’র লন্ডন-চ্যাপ্টার কি শেষের পথে?

মাসুদা ভাট্টি : যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডন শহর সব সময়ই নিজেকে বৈশ্বিক আলোচনায় কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চায়। সেটা ইরাক আক্রমণ করেই হোক কিংবা সিরিয়ায় আক্রমণ করেই হোক অথবা রাশিয়ার সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও তার কন্যাকে রাসায়নিক প্রয়োগে হত্যার অভিযোগ এনে গোটা ইউরোপকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার মাধ্যমেই হোক। কিন্তু লন্ডন আরও একটি কারণে বিশেষভাবে বিখ্যাত সবার কাছে। তা হলো, লন্ডন শহরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার গঠন ও পতনের ষড়যন্ত্রও হয়ে থাকে বলেও গুঞ্জন শোনা যায়। আমরা স্মরণ করতে পারি ১৯৭৫ সালের কথা। বাংলাদেশের বাইরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা-চক্রান্তের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে খুনিচক্র লন্ডনকে বেছে নিয়েছিল। শুধু তাই-ই নয়, বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নামগ্রস্ত করার জন্য লন্ডন থেকে যেভাবে প্রচারণা চালাতো হতো, তার কেন্দ্রে খন্দকার মুশতাকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সৈয়দ ওয়ালী আশরাফ থাকলেও বাংলাদেশের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও জড়িত ছিল। টাইম পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বৈধতা অর্জন করতে চেয়েছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে। প্রথমে বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের বিরুদ্ধে কুৎসা সম্বলিত বিজ্ঞাপনটি ৯ আগস্ট প্রকাশ করার কথা থাকলেও সেটি তারিখ বদলে ১৬ আগস্ট সকালে প্রকাশিত হয়। গবেষক ও সাংবাদিক প্রয়াত আব্দুল মতিন জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুকে প্রাথমিকভাবে ৮ আগস্ট বেতবুনিয়ায় হত্যা করার কথা ছিল, আর সে কারণেই বিজ্ঞাপনটি প্রথমে ৯ আগস্ট তারিখে প্রকাশের কথা ছিল। কিন্তু যখন হত্যার তারিখ বদলে ১৫ আগস্ট করা হয়, তখন বিজ্ঞাপনটি ৯ আগস্টের বদলে ১৬ আগস্ট প্রকাশিত হয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক বিখ্যাত জাতীয় নেতাকে হত্যা এবং দেশে দেশে সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রাগার হিসেবে লন্ডন কুখ্যাত হয়ে আছে।

কিন্তু গত কিছুদিন যাবৎ বাংলাদেশকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে লন্ডন যেন এর আগের সব ঘটনাকে পিছে ফেলে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশকে নিয়ে আলোচনায় লন্ডন যেন একেবারেই সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ দূতাবাসে যুক্তরাজ্য বিএনপি’র পক্ষ থেকে হামলা চালানোর পর থেকে ওখানে বিএনপি-জামায়াতের কর্মকাণ্ড এতটাই মাত্রা ছাড়িয়েছে–যে কেউ মনে করতেই পারেন, বাংলাদেশে বিএনপি নামক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটি কিছু করতে পারুক বা না পারুক, লন্ডনে ঠিক তারা জমিয়ে দিয়েছে সরকারবিরোধী আন্দোলন; এদেশে তো সরকারবিরোধী আন্দোলন জমিয়ে দেওয়ার অর্থই হচ্ছে নানাবিধ সহিংসতা দিয়ে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করা, মানুষ হত্যা করা এবং সরকারকে চাপে রাখা যে চাইলেই তারা দেশের ভেতর নৈরাজ্য সৃষ্টি করে দেশকে অচল করে দিতে পারে। যেহেতু বিএনপি-জামায়াত দেশে সে কাজটি পুরোপুরি করে উঠতে পারছে না সেহেতু তারা নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানান দিতে লন্ডন শহরকে বেছে নিয়েছে।

বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক জিয়া যখন থেকেই তার দল ও সরকারি বিভিন্ন কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে শুরু করেছেন ঠিক সেদিন থেকেই বিএনপি নামক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটি পথ হারিয়েছে বলে মনে করেন বিএনপি’র ঘনিষ্ঠজনরাই। নাম না বললেও একথা আর গোপন নেই, তারেক জিয়ার কারণেই অনেক নামকরা বিএনপি নেতা দল থেকে সরে গিয়েছেন, নয় নিজেদের কর্মকাণ্ডকে সীমিত করে রেখেছেন। বাংলাদেশ থেকে যখন তাকে মুচলেকা দিয়ে রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে বেরিয়ে যেতে হলো তখন বিএনপি নিয়ে কেউ কেউ নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। আজকে বিএনপি’র নেতৃত্ব প্রকাশ্যে না হলেও ব্যক্তিগত আলোচনায় একথা স্বীকার করেন, তারেক জিয়ার নেওয়া বিভিন্ন হটকারী সিদ্ধান্তের কারণেই বিএনপি এতদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে রয়েছে এবং শুধু তাই নয়, তারেক জিয়ার কৃতকর্মের জন্য তার মা বেগম খালেদা জিয়াকে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে।

বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবন যদি শেষ হয়, তাহলে সেটার জন্য আর কেউ নয়, তারেক জিয়াই দায়ী– একথা বিএনপির একজন প্রথম সারির নেতাই বলেছিলেন একটি নৈশভোজ অনুষ্ঠানে। নাম প্রকাশ করে তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবনটা আরও দুর্বিষহ করে দিতে চাই না এই মুহূর্তে।

তারেক জিয়া যখন লন্ডনে গিয়ে জেঁকে বসলেন এবং একের পর অপকর্ম দিয়ে দেশের বাইরে বাংলাদেশের সুমান নষ্ট করতে শুরু করলেন তখন এই প্রশ্নটি সাধারণের মুখেই উচ্চারিত হতে দেখা গিয়েছে, তারেক জিয়া কি আসলেই বাংলাদেশে ফিরে এসে রাজনীতি করতে আগ্রহী? নাকি তিনি আর রাজনীতিতে ফিরতে আগ্রহী নন? ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র এবং ঘুষ-দুর্নীতি-মানি লন্ডারিং ইত্যাদি মামলাগুলোকে যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবেও বিবেচনা করি তাহলেও কি এতদিন ধরে লন্ডনে অবস্থান করে তারেক জিয়া এমন কিছু করেছেন, যাতে কেউ বলতে পারেন তা দেশের জন্য বা তার দলের জন্য সুনাম বয়ে এনেছে? না, একথা তার পরম মিত্রও বলতে পারবেন না। বরং তিনি লন্ডনে একের পর দুর্ঘটনার জন্ম দিয়ে চলেছেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৭ বছর হতে চললো। ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর খুনিরা বাংলাদেশ হাইকমিশন ভবনে ঢুকে বঙ্গবন্ধুর ছবি তছনছ করেছিল এবং প্রায় হাইকমিশনকে দখল করে রেখেছিল। আবারও আমরা দেখতে পেলাম, তারেক জিয়া লন্ডনে থাকা অবস্থাতেই বিএনপি’র একদল নেতাকর্মী বঙ্গবন্ধুর ছবিকে অবমাননা করাসহ বিদেশে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিজস্ব ভবনকে আক্রমণ করছে। হাইকমিশনকে ভাঙচুর যদি রাষ্ট্রদ্রোহ না হয় তাহলে আর কিসে হয় সেটা আমার জানা নেই। বিএনপি কি এখনও এসব নেতাকর্মীকে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করেছে? নাকি তারেক জিয়া এ বিষয়ে কোনও বক্তব্য দিয়েছেন এতদিন পরেও? তার মানে হচ্ছে, এদেশে যেমন রেললাইন উপড়ে, মানুষকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার পথ পরিষ্কার করা হয়, বিএনপি ভাবছে লন্ডনেও বাংলাদেশ দূতাবাসে ভাঙচুর করে বিশ্বকে জানান দেওয়া যায় যে তারা বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল।

একেবারে গত সপ্তাহে যখন ৭১টি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের সম্মেলন চলছে লন্ডনে তখন বিএনপি’র পক্ষ থেকে শেখ হাসিনা সরকারবিরোধী সমাবেশ করা হয়েছে এবং সেটা খুবই যৌক্তিক কাজ হয়েছে বলে মনে করা যায়। কারণ, এদেশে যখন বিএনপি সভা-সমাবেশ করতে পারছে না তখন যেখানেই সে সুযোগ আসবে সেখানেই সেটি করতে হবে এবং করা উচিত। কিন্তু সভা-সমাবেশ করলেই যদি সেই সভা-সমাবেশ থেকে হিংস্র আক্রমণ করা হয় মানুষের ওপর তাহলে একথা তো আজকেই বলাই যায়,বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে দেওয়াটা কোনোভাবেই যৌক্তিক হবে না– কারণ তাতে মানুষের জীবনের ওপর হামলা আসতে পারে। লন্ডনে বিএনপি’র সমাবেশ থেকে একজন উপমন্ত্রীর ওপর যেভাবে হামলা চালানো হলো এবং উপমন্ত্রী পাশের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক কার্যালয়ে ঢুকে আশ্রয় গ্রহণ করলেন তাতে কি বাংলাদেশের সম্মান বেড়েছে? বিএনপিরই কি খুব বেশি কিছু লাভ হয়েছে? বরং এটাই কি প্রমাণ হয়নি সর্বত্র, বিএনপি একটি সন্ত্রাসী দল এবং তারা সুযোগ পেলেই মানুষের ওপর আক্রমণ চালায়? বিএনপি’র পক্ষ থেকে এই হামলার বিষয়ে কি কোথাও কোনও বক্তব্য দেওয়া হয়েছে? এর জন্য কাউকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে? তারেক জিয়া তো এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন, কই তিনিও তো এ ব্যাপারে কোনও বক্তব্য কোথাও দিয়েছেন বলে জানা যায় না।

বাংলাদেশের মিডিয়া নিয়ে আমরা সারাক্ষণ অভিযোগ শুনে আসছি বিএনপি’র কাছ থেকে। কিন্তু সত্যি কথা হলো, এদেশের মিডিয়াই বিএনপি’র রাজনীতিটাকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু কথা নেই বার্তা নেই দেশের মিডিয়ার ওপর সুযোগ পেলেই হামলা চালানো হয়। লন্ডনে একাত্তর টেলিভিশনের ক্যামেরা ছিনতাইর ঘটনায় আমরা এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া পাইনি বিএনপি’র কাছ থেকে। লন্ডনের মতো জায়গায় কমনওয়েলথ সম্মেলনে আমন্ত্রিত সাংবাদিক অতিথিকে এভাবে কারা আক্রমণ করলো সেটি খুঁজে বের করতে ব্রিটিশ পুলিশ তৎপর হবে সেটাই স্বাভাবিক। যদি এতেও বিএনপি-জামায়াতের সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই থাকবে না। কিন্তু তাতে লাভটা হবে কার?

সদ্য শেষ হওয়া এই কমনওয়েলথ সম্মেলনের কথাই ধরুন। আন্তর্জাতিকভাবে একথা প্রমাণ করা আওয়ামী লীগ তথা সরকারের পক্ষে সহজ হলো, বিএনপি-জামায়াত কোনও যৌক্তিক দাবি নিয়েও সমাবেশ করার যোগ্যতা রাখে না। কারণ, এই সমাবেশ জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে। আর সে কারণেই তাদের দেশের ভেতর কোনও সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে একথাও সত্য, বিএনপি এসকল চিহ্নিত ব্যক্তিদের দলে আশ্রয় দেয় এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। একাধিক প্রমাণ দিয়ে সরকার একথা বিদেশিদের সামনে প্রমাণ করতে পারবে এবং তাতে সরকারকে কোনও মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে না।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই যে গত কিছুদিন যাবৎ লন্ডনে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত নিজেদের একটি আক্রমণ-প্রবণ দল হিসেবে প্রমাণ করছে ক্রমশ, তাতে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে যদি সে দেশে না রাখার ব্যাপারে জনমত তৈরি হয় ক্রমশ, তাহলে তাকে কি ব্রিটিশ সরকার সত্যিই বেশি দিন আর থাকার সুযোগ দেবে? কেন যেন মনে হচ্ছে শেখ হাসিনা যে তারেক জিয়াকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন সেটা কিছু এই চিন্তা থেকেই। হতে পারে খুব দ্রুতই তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির তৎপরতা দেখা যাবে। বিষয়টি বিএনপি নেতৃত্ব ভেবে দেখলে ভালো করবে বলেই মনে হয়।

লেখক : সিনিয়র নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি
[email protected]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ