প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘উন্নত চুলায়’ বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনধারা

ডেস্ক রিপোর্ট : উন্নত চুলা ব্যবহারে লাকড়ি কম লাগে, দ্রুত রান্না হয়, চোখে ধোঁয়া লাগে না, পাতিলের নিচে কালি কম হয়, পরিবেশের ক্ষতি কম হয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও কম। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের সর্ধনকুটি গ্রামের গৃহিণী রওশন আরা কালের কণ্ঠ’র কাছে এভাবেই উন্নত চুলা ব্যবহারের সুফল বলছিলেন।

রওশন আরা জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কম্পানি লিমিটেড (ইডকল) থেকে প্রথম যখন তাঁকে উন্নত চুলা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়, তখন আমলে নেননি। অনেক বোঝানোর পর এই চুলা বসাতে রাজি হন তিনি। গাবতলী উপজেলা ঘুরে দেখা গেল, ঘরে ঘরে এখন উন্নত চুলার ব্যবহার হচ্ছে। সর্ধনকুটি গ্রামের জোলেখা বেগম, ফাতেমা ও শাহীনুর আক্তারের মতে, মাটির চুলা ব্যবহার করলে ধোঁয়া অনেক বেশি হয়।

ধোঁয়ার কারণে হাঁপানিতে ভুগতে হয়েছে তাঁদের। চোখ দিয়ে অনবরত পানিও পড়ত। উন্নত চুলা ব্যবহারের পর হাঁপানি ও চোখ দিয়ে পানি পড়া বন্ধ হয়েছে। তাঁরা বলেন, মাটির চুলায় লাকড়িও বেশি লাগত। রান্না করতে সময়ও বেশি লাগত। পাতিলের নিচে অনেক কালি জমা হতো। যা ওঠাতে অনেক সময় লেগে যেত। শক্তিও খরচ হতো।

ইডকলের দেওয়া তথ্য মতে, শুধু বগুড়া জেলায় তাদের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত এক লাখ ৯০ হাজার উন্নত চুলা বসানো হয়েছে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) গবেষণায় উঠে এসেছে, উন্নত চুলা ব্যবহারে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। একই সঙ্গে এই চুলা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কম কার্বন নিঃসরণ করে। উন্নত চুলা পরিবেশসম্মত হওয়ায় এই খাতে অর্থায়নে এগিয়ে এসেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি এ বাবদ বাংলাদেশকে সহজ শর্তে পাঁচ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্য বলছে, মাটির চুলা ব্যবহারে ধোঁয়ায় প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় এক লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
যার মধ্যে বেশির ভাগই শিশু। শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানি রোগে কষ্ট পায় ২৫ লাখ মানুষ। এখানেও শিশু ও মায়ের সংখ্যা বেশি। মাটির চুলায় রান্নার জন্য বছরে বাংলাদেশে ১৫০ মণ লাকড়ি খরচ হয়। এতে বনায়নের ওপরও নেতিবাচক চাপ পড়ছে। বাংলাদেশে এখনো ৯০ শতাংশ পরিবার রান্নার জন্য প্রচলিত চুলা অর্থাৎ মাটির চুলা ব্যবহার করে বলে ইডকলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ইডকল ২০১৩ সালে পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলার কার্যক্রম শুরু করে। জ্বালানি সাশ্রয়ী উন্নত চুলার কার্যক্রমটি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইডকলের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম দিকে উন্নত চুলা ব্যবহারে সাধারণ মানুষকে বোঝাতে একটু বেগ পেতে হয়েছিল। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। এখন মানুষ নিজ আগ্রহে উন্নত চুলা ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।

ইডকলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ মালিক বলেন, ‘২০১৩ সালে আমরা যখন উন্নত চুলার যাত্রা শুরু করি, তখন লক্ষ্য ছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সারা দেশে ১০ লাখ উন্নত চুলা বসাব। সেই লক্ষ্যমাত্রা ২০১৭ সালেই অতিক্রম করে ফেলেছি। ইডকলের তত্ত্বাবধানে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৫ লাখ উন্নত চুলা বসানো হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রামের প্রতিটি ঘরে উন্নত চুলা বসানো সম্ভব হবে। ৬৬টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ২৯০টি উপজেলায় প্রকল্পটি চলমান।’ মাহমুদ মালিক জানান, এই চুলা উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ। নকশা তৈরি করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। আর নেপালের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সেন্টার ফর রুরাল টেকনোলজি এটিকে অনুমোদন করেছে।

ইডকলের সহযোগিতায় বেসরকারি সংস্থা দিশারীর মাধ্যমে বগুড়ার চারটি উপজেলায় এই চুলা বিতরণ করা হচ্ছে। একাধিক উপজেলা ঘুরে, নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, একমুখী উন্নত চুলা কিনতে খরচ পড়ে ৮০০ টাকা। আর দ্বিমুখী চুলায় খরচ পড়ে এক হাজার টাকা। সংস্থার লাভ থাকে ১০০ টাকার মতো। চুলার ওয়ারেন্টি দেওয়া হয় এক বছর। এই সময়ের মধ্যে চুলার কোনো সমস্যা হলে সংস্থার প্রতিনিধি এসে বিনা পয়সায় তা ঠিক করে দেন।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের দেওয়া তথ্য মতে, উন্নত চুলা ব্যবহারের ফলে ৪৫ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় হয়। পারটিকুলেট মেটার (পিএম) কমায় ২০ শতাংশ। এ ছাড়া উন্নত চুলা ব্যবহারের ফলে ৩০ শতাংশ ব্ল্যাক কার্বন ও ৯০ শতাংশ কার্বন মনোঅক্সাইড নিঃসরণ কম হয়। কালি ও ধোঁয়ার হাত থেকে ব্যবহারকারী রক্ষা পান। ধোঁয়ামুক্ত উন্নত চুলা ব্যবহারের ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও চোখের ছানি পড়া থেকে মুক্ত থাকে ব্যবহারকারীরা।

ইডকলের সহকারী ম্যানেজার রাসেল আহমেদ বলেন, ‘উন্নত চুলার ব্যবহার বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।সূত্র : কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত