প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক সাফেরা খাতুন স্মরণে

শাহাজাদা এমরান, কুমিল্লা : কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের আজীবন সদস্য ও বাংলা একাডেমির সদস্য বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক সাফেরা খাতুন আর নেই। তিনি গত ২০ এপ্রিল ২০১৮ শুক্রবার বিকাল ৪টায় ঢাকার আনোয়ারা মেমোরিয়েল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তিনি স্বামীসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তার স্বামী কুমিল্লার বিশিষ্ট আইনজীবী ফজলুর রহমান । তার প্রথম জানাজা হয় শনিবার ঢাকায় এবং কুমিল্লার আদালত মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে নগরীর টমছমব্রিজ কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

সাফেরা আপা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ছোট ভাই হিসেবে ভালবাসতেন। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে, আপার জানাজায় আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি । এই না পারার ব্যর্থতা হয়তো আমাকে দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াতে হবে। আমি জানতামই না যে আপা মারা গেছেন। শনিবার দিবাগত রাত পৌনে একটায় আমেরিকা থেকে সাপ্তাহিক আমোদ সম্পাদক বাকীন রাব্বী ফোন করে জানালেন,‘তোমার আপা যে মারা গেছে আমাকে তো জানালা না।’আমি বললাম, ‘ভাই কোন আপা?’ বাকীন ভাই বললেন, ‘তোমার সাফেরা আপার কথা বলছি। তিনি শুক্রবার মারা গেছেন। আজ শনিবার দাফন কাফন হয়েছে।’ আমি থ হয়ে গেলাম। কুমিল্লা শহরে থেকেও আপার মৃত্যু সংবাদটি আমি পেলাম না, জানাজায় অংশ নিতে পারলাম না। এ কথা ভাবতেই মন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। পরে রাতে ঘুমের ভান করে থাকলেও আর ঘুমাতে পারলাম না।

হঠাৎ মনে পড়ে গেল ২০১৬ সালের ৬ এপ্রিলের কথা। সেদিন সাফেরা আপা আমাকে বাসায় ডেকে নিয়ে দুটি কাগজ হাতে ধরিয়ে দিয়ে তিনটি একশত টাকার নোট দিয়ে বলল, ‘এমরান, তোমাকে আমি ছেলের মত জানি। মনে কিছু নিও না। এই টাকাটা দিয়ে তুমি তোমার ছেলে মেয়ের জন্য কিছু ফল কিনে নিও। আর এই কাগজ দুটি রাখ। আমার শরীরটা ভাল নেই। কখন জানি মারা যাই জানি না। যদি পার, আমি মারা গেলে এই দুইটা কাগজ দেখে পত্রিকায় আমাকে নিয়ে কিছু লিখ ভাই।’

একজন বিনয়ী, ধার্মিক, পরোপকারী এবং সজ্জন ব্যক্তিত্ব ছিলেন অধ্যাপক সাফেরা খাতুন। সাধারণ মানুষের কল্যাণে আমৃত্যু নিবেদিত ছিলেন তিনি। মানুষকে সহজেই কাছে টানার এক অস্বাভাবিক গুণের অধিকারী ছিলেন তিনি। কথা বলতেন খুব আস্তে আস্তে, কিন্তু খুবই গোছালো।

সাফেরা আপা আমার মায়ের বয়সী হলেও তাকে আমি আপা বলে ডাকতাম। কখন, কোথায়, কীভাবে আপার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে এই মুহূর্তে বলতে পারব না। তবে খুব সম্ভবত সাপ্তাহিক আমোদ অফিসে পরিচয় হয়েছিল। একটা সময় পর্যন্ত প্রায় প্রতি বুধবার তিনি আমোদে আসতেন। আমার সাথে দেখা করে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ/নিবন্ধ ও কবিতা লিখে এনে আমাকে বলতেন, ‘তোমার পত্রিকায় এগুলো ছাপিয়ে দিও।’ আমি আপার অসংখ্য লেখা সাপ্তাহিক আমোদ, মুক্তকাগজ ও নতুনপত্রে এবং কিছু কিছু লেখা দৈনিক আমাদের কুমিল্লায় প্রকাশ করেছি। তিনি প্রায় গর্ব করে বলতেন, ‘আজ যে আমাকে লেখক হিসেবে মানুষ চিনে-জানে, সে তো তোমার জন্যই।’ আপার সম্ভবত ১০/১২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে পবিত্র হজের ওপর ছিল দুটি, কবিতা, গল্প, স্মৃতিচারণমূলকসহ নানা বিষয়ের ওপর তিনি বই লিখেছেন। তার প্রথম দুটি বইসহ অধিকাংশ বইগুলো ছিল আমার হাতে করা। এ বিষয়ে আমার ভাল জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও আপা আমার ওপর আস্থা রেখেছিলেন। আমি চেষ্টা করেছিলাম সেই আস্থার প্রতিদান দিতে।

আজ আপা দুনিয়াতে নেই। কিন্তু আজ একটি কথা এখানে বলে রাখতে চাই, আপার জীবনের শেষ ইচ্ছাটুকু আমি রাখতে পারিনি তাঁর পরিবারের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে। ২০১৬ সালের দিকে হবে। একদিন আপা আমাকে বাসায় ডেকে বললেন, ‘আমার হজের বই দুটি শেষ। আমি চাই এই বই দুটি পুন:মুদ্রণ করতে। যাতে এবারে হাজিরা হজে যাওয়ার আগেই তাদের হাতে দিতে পারি।’ আমি দ্রুত কম্পোজসহ আনুষাঙ্গিক কাজ শেষ করে আপাকে খরচের হিসেব দিলাম। কিছুদিন পর আপা বলল, ‘আগামী নভেম্বর মাসে আমার ছেলের বিয়ে । তোমার দুলাভাই বলছে, ছেলের বিয়ের পর বইয়ের কাজ ধরতে।’ এভাবে চলে গেলে আবার দেড় বছর। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময় বেশ কয়েকবার ফোন করে আপা আবার আমাকে বাসায় ডেকে নিয়ে বললেন, ‘ভাই এবার আমার বই দুটি করে দাও না।’ আমি কিছুটা অভিমান করে বললাম, ‘আপা এবার আমি পারব না। গেলবার প্রুফের কাজ পর্যন্ত শেষ করে আনলাম। তখন করলেন না। এখন মেটার কোথায় আছে আমি জানি না।’ আপার সামনেই নেটওয়ার্ক প্রিন্টিংয়ের অলি ভাইকে ফোন করলাম, ম্যাটারগুলো আছে কি না। অলি ভাই জানাল, ‘নেই, নতুন করে কম্পোজ করতে হবে।’ পেশাগত কারণে অনেক ব্যস্ত থাকার পরেও মায়ের সমতুল্য সাফেরা আপার অনুরোধ আমি ফেলাতে পারিনি। অফিসে দ্রুত কম্পোজের কাজ শেষ করে কবি কাজলকে দিয়ে প্রুফ দেখিয়ে দ্বিতীয় বার নেটওয়ার্কে দিলাম ছাপার কাজের জন্য। এর আগে অলি ভাইয়ের দেওয়া বিল জমা দিলাম আপার কাছে। এই যে বিল জমা দিলাম , দিলামই। আর আপার বই করা হলো না। আজ থেকে কয়েকমাস আগে আপা আমাকে ফোন করে জানালেন, ‘এমরান, সাহেবকে (স্বামী) তোমার বিলটা দিয়েছি। টাকা দিলেই কাগজ কিনে দ্রুত ছাপাবা। জানতো ভাই, আমি তো আর এখন ইনকাম করতে পারি না। সাহেব টাকাটা দিলেই তোমাকে ফোন করব।’ মৃত্যুর আগে এটাই ছিল সম্ভবত আপার সাথে আমার শেষ কথা।

অধ্যাপক সাফেরা খাতুন ১৯৪১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার পাটনা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্সসহ কৃতিত্বের সাথে এমএ পাস করেন। তিনি ঢাকা কামরুননেছা গার্লস হাই স্কুল থেকে ১৯৫৫ সালে এসএসসি এবং ১৯৬৩ সালে টাঙ্গাইল কুমুদিনী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা মুসলিম গার্লস হাই স্কুলে শিক্ষকতার মধ্যে দিয়ে।১৯৬৯সালে দাউদকান্দিস্থ হাসানপুর কলেজে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরে বিসিএস পরীক্ষায় শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৪ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে যোগ দেন। এই কলেজে দীর্ঘ ২৪ বছর শিক্ষকতা করে ১৯৯৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ছাত্র জীবন থেকেই লেখালেখি করে আসছেন। ৬০ এর দশকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত লায়লা সারোয়ার সম্পাদিত ‘পৃথিবী’ নামক পত্রিকায় সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ সাহিত্যপত্রসহ কুমিল্লার বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখছেন গত তিন দশক যাবৎ। সাহিত্য চর্চা ছাড়াও তিনি কুমিল্লা বিতর্ক পরিষদসহ অসংখ্য সামাজিক সাংস্কৃতিক ও প্রতিষ্ঠানিক সংগঠন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক সাফেরা খাতুনের প্রকাশিত গ্রন্থ গুলোর মধ্যে রয়েছে, প্রবন্ধ সম্ভার,নিভৃত মনের বাসনা(কবিতা),নতুন তুমি এসেছ(কবিতা),নীল শাড়ি(গল্প),চোখে চৈত্রের খড়গ(গল্প), আমার হজের প্রতিটি দিন,হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য,সহজ পদ্ধতিতে হজ,ওমরা ও বদলি হজ,সাফেরা খাতুনের রচনাবলী, ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ ও আনুষাঙ্গিক পর্ব, দোয়া দরুদ আর রতœ ভা-ার এবং সাফেরা খাতুনের জীবন স্মৃতি।

নি:সন্তান অধ্যাপক সাফেরা খাতুন বেঁচে থাকবেন তার কর্মে,মেধা মননে। তিনি মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক হিসেবে যেমন আগামী প্রজন্ম বির্নিমাণে নিবেদিত ছিলেন ঠিক, তেমনি লেখালেখির মাধ্যমেও চেষ্টা করেছেন অবক্ষয় ও অপসংস্কৃতির এই সমাজটা সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে। তার প্রয়াণে কুমিল্লা তথা দেশ হারাল এক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে। আর অবহেলিত অসংখ্য মানুষ হারাল তাদের অবলম্বনকে। আমি অধ্যাপক সাফেরা খাতুনের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি,কুমিল্রা জেলা শাখা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত