প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

লাশকাটা ঘরে আটকা ২১শ’ মামলা

রাজধানীর তুরাগে গৃহবধূ রেহেনা পারভীন ও তার তিন শিশুসন্তানের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ কর্তৃপক্ষকে আদালত চারবার তাগাদা দিয়েছেন। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও গত ১০ মাসে অন্তত ১০ বার ধরনা দিয়েছেন মর্গে। তবুও প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। গত বছরের ৮ জুন তুরাগের কামারপাড়ায় একটি বাসা থেকে ওই চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল।

ঢাকার বিমানবন্দর রেলস্টেশনে কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের ছাদে রক্তাক্ত অবস্থায় কিশোর সাকিব খানের লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে কী আসে, সেই অপেক্ষায় অপমৃত্যুর মামলা নেয় পুলিশ। অবশ্য ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ রেলওয়েকেন্দ্রিক এক ছিনতাইকারীকে আটক করে। হত্যার স্বীকারোক্তিও দেয় সে। অপমৃত্যু থেকে হত্যা মামলায় রূপ নিলেও গত দুই মাসেও পাওয়া যায়নি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন।

মা ও তিন সন্তানের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তুরাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় তিনি বুঝতে পারছেন না ওই চারজনকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি তারা আত্মহত্যা করেছেন। ফলে তদন্ত থেমে আছে।

ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াসিন ফারুক মজুমদার বলেন, কিশোর সাকিবকে খুন করা হয়েছে- তা আসামির জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। কিন্তু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত তিনি কাগজপত্রে তা নিশ্চিত হতে পারছেন না। এ জন্য মামলাটি থমকে আছে।

পুলিশের এ দুই কর্মকর্তার তথ্যের সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- শুধু এ দুই মামলাই নয়, দেশের বিভিন্ন থানায় এমন শত শত ঘটনা রয়েছে, যেসব মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া যাচ্ছে না। সারাদেশে অন্তত তিন মাসের বেশি সময় ধরে দুই হাজারের অধিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে রয়েছে মেডিকেল কলেজ ও জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। বিশেষ করে অপমৃত্যু মামলার ক্ষেত্রে মাসের পর মাস ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরি হয় না। ফলে লাশকাটা ঘরের ‘অন্ধকার টেবিলে’ আটকে থাকে এসব মামলার তদন্ত ও ভবিষ্যৎ।

যেসব কারণে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায় না : চিকিৎসকরা বলছেন, ক্লাস পরীক্ষা নেওয়া ও একাডেমিক কাজের বাইরে সশরীরে উপস্থিত থেকে ময়নাতদন্ত করতে হয়। এরপর তার প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়; বিভিন্ন মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিতে হয়। এত কিছুর পর সময়মতো ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হয় না।

জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিতে দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ জনবল সংকট। এ সংকট সারাদেশেই। কিছু ক্ষেত্রে সিআইডির রাসায়নিক পরীক্ষাগারে এবং মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগে নমুনা পাঠানো হয়। এগুলো আসতে দেরি হয়। ভিসেরা প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এসব কারণে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিতে দেরি হয়।

ঢাকার দুটি মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের দু’জন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, ময়নাতদন্ত করতেই তাদের অনীহা আছে। কারণ মূল কাজের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বছরের পর বছর ময়নাতদন্ত ও প্রতিবেদন তৈরি করতে হচ্ছে। ছুটির দিনে এমনকি ঈদের দিনও তাদের মর্গে যেতে হচ্ছে। ডাক পড়লেই আদালতে যেতে হচ্ছে। এসব কাজের জন্য তাদের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না।

ময়নাতদন্তের বিলম্বে থমকে থাকে মামলার তদন্ত : পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত মৃত্যুর কারণ সন্দেহাতীতভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। এটি বিচার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ আলামত। এই প্রতিবেদন ন্যায়বিচার অনেকাংশে নিশ্চিত করে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পেলে মামলার তদন্তই থেমে থাকে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে দেরি হলেও নানা আলামতে তদন্ত চালিয়ে নেওয়া যায়। অবশ্য সময়মতো না পেলে চার্জশিট দিতে দেরি হয়। এতে মামলাজটের সৃষ্টি হয়। কিন্তু অপমৃত্যু ঘটনার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পেলে তদন্তই আটকে যায়। এ ধরনের মামলায় প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তদন্ত শুরু হয়। ময়নাতদন্তে অপমৃত্যু যদি হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হয়, তখন মামলার তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। এ ছাড়া যখন একটি অপমৃত্যুর ঘটনায় হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রতিবেদন পাওয়া যায়, তত দিনে সব আলামত নষ্ট হয়ে যায়। আসামি আটক হলেও জামিনে বের হয়ে লাপাত্তা হয়। ফলে দোষীকে বিচারের মুখোমুখি করা দুঃসাধ্য হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) শেখ নাজমুল আলম বলেন, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত বা ভিসেরা প্রতিবেদন ছাড়া মামলার চার্জশিট বা তা নিষ্পত্তি করার সুযোগ নেই। দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে হত্যা মামলার ক্ষেত্রে আসামি চিহ্নিত এবং ধরা সহজ হয়।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, গত ১৬ এপ্রিল ডিএমপির মাসিক ক্রাইম কনফারেন্সেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে বিলম্বের বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে নানা সমস্যার কথাও উঠে আসে।

২১শ’ অপমৃত্যু মামলার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে আছে : পুলিশ সদর দপ্তরে ২০১৭ সালের সর্বশেষ তিন মাসের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দুই হাজার ১১০টি অপমৃত্যুর মামলায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে রয়েছে। এর মধ্যে তিন মাসের বেশি সময় ধরে ৬৮২টি ও এক মাসের বেশি সময় ধরে এক হাজার ৪২৮টি প্রতিবেদন আটকে রয়েছে। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) চলতি বছরের শুধু মার্চ মাসের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়ায় ঢাকার বিভিন্ন থানায় ৫৭৬টি মামলার তদন্ত আটকে আছে। এর মধ্যে এক থেকে ছয় মাস পর্যন্ত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে আছে ৪৬২টি, ছয় মাসের বেশি সময় আটকে আছে ৯৮টি এবং এক বছরের বেশি সময় ধরে ১৬টি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে আছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, সারাদেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে (অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর-২০১৭) ঢাকা রেঞ্জের বিভিন্ন জেলায় ২৮৭টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জের জেলাগুলোতে ৪৯টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জের বিভিন্ন থানার ১৮৭টি, সিলেট রেঞ্জের ১৫২টি, খুলনা রেঞ্জের ২১৪টি, বরিশাল রেঞ্জের ২৫টি, রাজশাহী রেঞ্জে ১১৭টি ও রংপুর রেঞ্জে ৮৬টি অপমৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে আছে। এ ছাড়া রেলওয়ে রেঞ্জের ৩১২টি, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের থানাগুলোর ৭৭টি ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের ৭৭টি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে আছে। সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত