প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নগরজীবনের তিন সংকট. গ্যাস, পানি ও লোডশেডিং

কোথাও পানি নেই, কোথাও আছে। নেই তো নেই-ই। যেখানে আছে- অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারের উপযোগী নয়, ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত। সংযোগ আছে, কিন্তু কোনো কোনো এলাকায় বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকে না। থাকলেও চাপ কম। বিদ্যুৎ আছে, তবে দিনভর চলে লুকোচুরি খেলা- নাম তার লোডশেডিং। এই তিন নগর যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী। তিন সংকটই পুরনো, কিন্তু সমাধান নেই। কর্তৃপক্ষ আছেন। কিন্তু সংকটের দিকে তাদের নজর কতটুকু, সেই প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের। রেজ্জাকুল ইসলাম মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা। এলাকায় পানি নিয়ে তার তীব্র অসন্তোষ। ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ওয়াসার সাপ্লাইয়ের পানি আছে। কিন্তু পানিতে দুর্গন্ধ, পানের অযোগ্য। তারপরও দীর্ঘক্ষণ ফুটিয়ে এই পানিই পান করতে হয়। এ এলাকায় গ্যাসের সংকটও আছে জানিয়ে রেজ্জাকুল বলেন, এখন অবশ্য অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে।

এলিফেন্ট রোডের গৃহিণী রোকেয়া আক্তার বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ২ থেকে ৩ বার বিদ্যুৎয়ের লোডশেডিং হয়। এটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। পানি সংকট না থাকলেও মাঝেমাঝে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। গতকাল (শনিবার) সকাল ১০টায় রান্না করতে গিয়ে তিনি দেখেন, চুলায় গ্যাসের সংকট। চায়ের পানি গরম হতেই তার সময় লাগে প্রায় আধাঘণ্টা। বিরক্ত হয়ে তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে গ্যাসের এই সংকটে ঠিকমতো রান্না করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ভাত ও তরকারী রান্না করতে ১ ঘণ্টার জায়গায় সময় লাগে ২ থেকে ৩ ঘণ্টারও বেশি। এ সমস্যা মাঝেমধ্যেই হয়।

দক্ষিণ বনশ্রীর বাসিন্দা শাহেদ জানান, বনশ্রী ও আশপাশের এলাকায় গ্যাসের সংকট নেই। তবে গত ৭ দিন যাবত পানির সংকট প্রকট। হঠাৎ করেই এ সংকট। এ ছাড়া যেটুকু সময় পানি পাওয়া যায়, তাতে তীব্র দুর্গন্ধ। তিনি বলেন, পানিতে গন্ধের সমস্যাটা দীর্ঘদিনের। এটি ওয়াসার কোনো সমস্যা, নাকি বাড়িওয়ালা ঠিকমতো পানির ট্যাঙ্ক পরিষ্কার না করার ফলে- সেটা বোঝা যাচ্ছে না। এ ছাড়া ঝড়বৃষ্টি ছাড়া অন্যান্য সময়েও বিদ্যুতের লোডশেডিং হয়।

কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ এলাকায় ২০০৬ সাল থেকেই গ্যাসের সংকট, যা বর্তমানে তীব্র। শীতকালে অবস্থা হয় ভয়াবহ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গ্যাসের যা সাপ্লাই দেয়া হয়, তার সিংহ ভাগ বিভিন্ন কারখানার মালিকরা গ্যাসের মূল পাইপ লাইনের সঙ্গে চুরি করে সংযোগ দিয়ে তাদের কারখানায় নিয়ে যান। এতে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় বাসিন্দা সাফিয়া বেগম জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা তারা গ্যাস পান। তাও সেটা রাত ১টায় এলেও ৩টা বাজতে না বাজতেই আবার চলে যায়। যে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা গ্যাস থাকে, তারও চাপ খুবই কম। এ ছাড়া দিনেরাতে গ্যাসের দেখা মেলে না। ফলে সিলিন্ডারের এলপিজি গ্যাস অথবা লাকড়ি দিয়ে রান্নার কাজ করতে হয়। গ্রীষ্মকালে কিছুটা গ্যাস মিললেও শীতকালে দেখাই মেলে না।

এ সমস্যা কামরাঙ্গীরচরের বেশিরভাগ এলাকার হলেও মুসলিমবাগে তুলনামূলক বেশি। তবে গ্যাস না পেলেও প্রতিমাসে গ্যাস বাবদ বিল তাদের গুনতে হচ্ছে ঠিকই। ফলে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ এ এলাকার বেশিরভাগ মানুষ এখন গ্যাস বিল দেয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন। সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা হয়েও ওয়াসার পানি থেকে বঞ্চিত এ এলাকার মানুষ। ঢাকার অন্যান্য এলাকার মতোই কামরাঙ্গীরচরেও লোডশেডিং থেকে মুক্তি নেই বলে জানান এ এলাকার বাসিন্দারা।

এদিকে উত্তর মুগদাসহ রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় ওয়াসার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে স্থানীয়রা ভিড় করছেন পানির পাম্পগুলোতে। হাতে গ্যালন, জার, বালতি, বোতল নিয়ে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন পানি নিতে। সকাল, দুপুর এবং বিকেলে পাম্পগুলোতে দেখা যায় পানি সংগ্রহ করতে আসা বাসিন্দাদের দীর্ঘ লাইন। উত্তর মুগদা পাড়ার পানির পাম্পে পানি নিতে এসেছেন গৃহিণী সুলতানা বেগম। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, গত ১৫ দিন যাবত বাসার পানি তারা পান করতে পারছেন না। কারণ পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লা দেখা যায়। তাই অন্যান্য কাজের জন্য ওই পানি ব্যবহার করলেও খাবার পানির জন্য তারা ভিড় করছেন পাম্পগুলোতে।

এদিকে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, ঢাকায় বর্তমানে দৈনিক পানির চাহিদা রয়েছে ২৪০ কোটি লিটার। আর ওয়াসা উৎপাদন করছে ২৪৫ কোটি লিটার। চাহিদার চেয়েও সংস্থাটি ৫ কোটি লিটার পানি বেশি উৎপাদন করছে। সেই অনুযায়ী রাজধানীতে পানি সংকট থাকার কথা নয়; কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানীতে পানি সংকট রয়েছে, এ কথা মানতে নারাজ ওয়াসার কর্মকর্তারা। অবশ্য পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকার বিষয়টি একেবারেই উড়িয়ে দেননি তারা।

ঢাকা ওয়াসার জোন-৬ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ইয়ার খান ভোরের কাগজকে জানান, এই মুহ‚র্তে ঢাকার কোথাও পানির কোনো সংকট নেই। চাহিদা যা রয়েছে, তার চেয়েও বেশি পরিমাণ পানি উৎপাদন করছে ঢাকা ওয়াসা। পানিতে গন্ধ ও ময়লা বিষয়ে তিনি বলেন, এ সমস্যা কিছুটা থাকতে পারে। কারণ, ওয়াসার পানির অনেক চোরাই সংযোগ রয়েছে, অবৈধ সংযোগ করতে গিয়ে লাইনে ছিদ্র হয়ে যায়, সেই ছিদ্র দিয়েই পানিতে ময়লা ঢুকে গন্ধ ছড়াতে পারে। এ ছাড়া নদীর পানিতে খুব বেশি পরিমাণ ময়লা আবর্জনা থাকে, সেই পানি রিফাইনিং করে বিশুদ্ধ করতে প্রচুর কেমিক্যাল ব্যবহার করতে হয়। এ কারণেও দুর্গন্ধ হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে যদি কেউ অভিযোগ করেন, তাহলে আমরা তা খতিয়ে পরীক্ষার জন্য আমাদের ল্যাবে পাঠিয়ে সমাধান করতে পারব।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে; প্রতি বছর গ্রীষ্ম মৌসুমে পানির লাইনে সমস্যা দেখা দেয়। পানি সংকটও দেখা দেয়। এবারো তার ব্যতিক্রম নেই। এখনি পানিতে গন্ধ থাকায় তা পান করা মুশকিল হয়ে পড়েছে। কাজেই গরমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াসার পানির সংকটও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর পূর্ব রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ি, মগবাজার, খিলগাঁও, গোড়ান, কালাচাঁদপুর, নতুন বাজার, বাউনিয়া বাঁধ, উত্তর ইব্রাহিমপুর, কদমতলী, শ্যামপুর, মিরপুর-১০, পীরেরবাগ, বড়বাগ, কাজীপাড়া, আগারগাঁও, আরামবাগ, মানিকনগর, কালাপানি, কালশী, পশ্চিম মনিপুর, মুরাদপুর, কেদার নাথ দে লেন, মোহাম্মদপুর ও বাড্ডাসহ অনেক এলাকায় পানির সংকট রয়েছে।

এদিকে, গ্রীষ্মের শুরু হতে না হতেই রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় দেখা দিয়েছে লোডশেডিং। এসব এলাকায় দৈনিক গড়ে ২ থেকে ৩ বার বিদ্যুৎ থাকে না। তবে শুরুতেই এ সংকট খুব একটা বেশি না হলেও গরমের তীব্রতা যতই বাড়বে, ততই লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা ভুক্তভোগীদের। ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারা ও মতিঝিলে লোডশেডিং খুব একটা না হলেও মুগদা, বনশ্রী, মাদারটেক, বাসাবো, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, শ্যামপুর, কামরাঙ্গীরচর, খিলগাঁও, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর, কাফরুলসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে ২ থেকে ৩ বার লোডশেডিং হয়।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রাজ্জাকুল ইসলাম বলেন, আগের তুলনায় বিদ্যুতের লোডশেডিং অনেক কমেছে। মোহাম্মদপুর এলাকায় শীতকালে খুব একটা লোডশেডিং থাকে না। কিন্তু গত প্রায় ২০ দিন যাবত দিনে ২ থেকে ৩ বার বিদ্যুৎ চলে যায়। তবে বেশিক্ষণ থাকে না। ৫ থেকে ১০ মিনিট কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ মিনিট পর আবার চলে আসে। তবে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তার।

লোডশেডিং সংকট কিভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব জানতে চাইলে ডিপিডিসি সূত্রে জানায়, মাটির নিচে বৈদ্যুতিক তারের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করে সাবস্টেশন চালু করা হয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে আরো ২৭টি সাবস্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল ডিপিডিসি। এরমধ্যে ঢাকায় ৩টি পুরোপুরি প্রস্তুত আর ৩টির কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।

ডিপিডিসির প্রকল্প পরিচালক জানান, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন রাস্তা খুঁড়ে তার বসানোর অনুমতি দিলেও, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এখনো অনুমতি দেয়নি। এক বছর আগে প্রাথমিক আবেদন ও গত সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত আবেদন করে অপেক্ষায় আছে ডিপিডিসি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যদি একসঙ্গে সবগুলোর অনুমোদন দেয়া হয়, তাহলে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা বেড়ে যাবে। কিন্তু এটা ছাড়া আমাদের বিকল্প কোনো উপায়ও নেই। কেননা, সোর্স লাইন আনতে হলে আন্ডারগ্রাউন্ড কেবলের লাইনে আনতে হবে। ডিপিডিসির আশঙ্কা সাবস্টেশনগুলো চালু না হলে বিদ্যুতের জোগান থাকলেও সক্ষমতার অভাবে রাজনীতিতে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।

ডিপিডিসি সূত্রে আরো জানা গেছে, রাজধানীর একাংশ কেবল ডিপিডিসি এলাকার বিদ্যুৎ চাহিদা ১২শ মেগাওয়াটে পৌঁচেছে। গত বছর গ্রীষ্ম মৌসুমে সর্বচ্চো চাহিদা ছিল দেড় হাজার মেগাওয়াট। এবার চাহিদা আবার বেড়ে ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে বলে ডিপিপিসির আশঙ্কা। সংস্থাটির দাবি বিদ্যুতের জোগান থাকলেও সাবস্টেশনের সক্ষমতার অভাবে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোনো ঘাটতি নেই। গত বছর আমরা সর্বচ্চো ১০ হাজার ৮৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছি। সাবস্টেশন ও লাইন ওভারলোড হয়ে গেছে। এ কারণেই লোডশেডিং করতে হয়। আমরা যদি নতুন সাবস্টেশন ও লাইন করতে পারি, তাহলে কোনো লোডশেডিং থাকবে না। সূত্র : ভোরের কাগজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত