প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘হালুয়া রুটি’র রাজনীতি ও আমাদের সংকট

লেখার বিষয় বেছে নিতে পারছিলাম না। কোনটা রেখে কোনটা বেছে নেবো? একবার ভাবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে লিখি। উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কীর্তি নিয়ে কাহিনি লেখা যায়। পরক্ষণেই ভাবনায় এসে জড়ো হয়– ছাত্রলীগের বেয়াড়াপনার ফিরিস্তি। দু’টোর ফিউশন করতে যাবো, এমন সময় উঁকি দেয় গণপরিবহনের নৈরাজ্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরুর পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নানা মন্তব্য ভেসে বেড়াচ্ছে। যারা মন্তব্য দিচ্ছেন, তারা সবাই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের, তা নয়। সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরাও যেমন দিচ্ছেন, তেমনি শিক্ষকদের মন্তব্যও দেখা যাচ্ছে। তারা আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি হামলা, উপাচার্যের বাসভবনে তাণ্ডব ও সুফিয়া কামাল হলে ঘটে যাওয়া নাটকীয় ঘটনাগুলোকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। মনে করছেন, এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অহংবোধে চিড় ধরেছে। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে ‘ক্ষমতা’র আরমানে রোদের ঝিলিক দেখে উপাচার্য ও নীল দলের শিক্ষকদের অবস্থান নেওয়াকেও শিক্ষক বা অভিভাবকসুলভ আচরণ মনে করেননি অনেকেই। উপাচার্যের বাড়িতে হামলাকে সমর্থন করেননি কেউই। তবে হামলার ঘটনার পর উপাচার্যের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মধ্যে, শিক্ষাবিদ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকের অবয়ব দেখতে পারেননি বলে সাধারণের অভিমত।

কবি সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রলীগ সভাপতির সঙ্গে আচরণ। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারী ছাত্রীদের হল থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ এবং ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের ভূমিকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রশ্রয় নিয়ে সন্তুষ্ট নন ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীও। তারা বলছেন, অতি উৎসাহী ও দলের সম্মেলনকে সামনে রেখে পারফরমেন্স দেখাতে চাওয়া কর্মীদের কারণে পরিস্থিতি এই রূপ ধারণ করেছে। তারা নিরঙ্কুশভাবে সরকার সমর্থিত শিক্ষকদের স্নেহ পেয়েছে। যা কিনা সার্বিকভাবে ছাত্রলীগকেও ছুড়ে দিয়েছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। সম্মেলনকে সামনে রেখে ছাত্রলীগ এমনিতেই বেসামাল হয়ে আছে। নেতৃত্বের নানা মেরুকরণ ঘটছে মূল দলের নেতাদের কেন্দ্র করে। তারই প্রভাবে ছাত্রলীগ নিজ কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। সাংগঠনিক অনেক সিদ্ধান্তই বুমেরাং হয়ে নিজেদের এসে আঘাত করছে। তবে সব ছাত্র সংগঠনের কর্মী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মূল কথা হচ্ছে– ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিরতার জন্য শিক্ষকরাই দায়ী। তারা ক্লাসরুমে শিক্ষা দেওয়ার চেয়ে গুরুত্ব বেশি দিচ্ছেন রাজনৈতিক সংগঠনকে। রাজনৈতিক সংগঠনের ফরমায়েস বাস্তবায়নে তারা এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, ক্লাস রুমে সময় দিতে পারছেন না। আর সেই ফরমায়েশ প্রয়োগ করতে ব্যবহার করছেন শিক্ষার্থী এবং নিজ মতাদর্শের ছাত্র সংগঠনকে। শিক্ষকরা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে অবস্থান নিতে পারতেন, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ, সব বিদ্যায়তনের অহংবোধ অক্ষুণ্ন থাকতো।

ছাত্রলীগ এককভাবে সাংগঠনিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে আছে বলে মনে হয় না। পাড়া-মহল্লা, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, নগর, বিভাগের কর্মীরা বিভিন্ন রকমের ক্ষমতাসীন ‘ব্যক্তি’ দেখে তাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ‘ব্যক্তি’কে সন্তুষ্ট রেখে তার প্রভাবেই চালাতে থাকেন দখল ও নৈরাজ্য। কেন্দ্র এদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এবং ধৈর্য দুই-ই মনে হারিয়ে বসে আছে। কিন্তু এই দাপট ও নৈরাজ্যের প্রভাব কিন্তু ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে মূল দলের শরীরে এসে বিঁধে যাচ্ছে। সর্বশেষ চট্টগ্রামে একজন ছাত্র নেতার বেপরোয়া হয়ে ওঠার কিচ্ছা আমরা অবগত। ছাত্রলীগসহ সব ছাত্র সংগঠনে একটি ফ্যাশন চালু আছে, কোনও কর্মী বা নেতা কোনও অপকর্ম করলে, তাকে বহিষ্কার করে দায়মুক্তি দেওয়া হয় অথবা বলা হয় তিনি সংগঠনের সঙ্গে অতীতে যুক্ত ছিলেন, বর্তমানে নয়। এই ফ্যাশন হচ্ছে অভিযুক্তকে নিরাপদ বা আইনের আওতায় না আনার কৌশল। অনাদিকালের এই কৌশল ছাত্র সংগঠনগুলোকে কেবল বেপরোয়াই করে তুলছে।

প্রশ্রয় বেপরোয়া করে তুলেছে আমাদের পরিবহন খাতকেও। গণপরিবহন এখন সব ধরনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলা যায়। সড়ক-মহাসড়কের দুর্ঘটনা, রাজধানীতে তাদের বেপরোয়া গতি একের পর এক প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। গণপরিবহনে তাদের শৃঙ্খল চলাচল নেই। বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ, কোনও বিভাগই গণপরিবহনকে শৃঙ্খলার ছাতার নিচে আনতে পারছে না। রাজধানীসহ সারাদেশেই তারা চলছে নিজেদের খেয়াল খুশি মতো। তাদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিলেই, দেশ অচল করে দেওয়ার মতো কর্মসূচি আসে যাত্রী বা আম মানুষকে জিম্মি করে। তাদের এই ঔদ্ধ্যত আচরণের পেছনে আছে রাজনৈতিক প্রশ্রয়, আদর। বা রাজনৈতিক লেনদেন। ফলে গণপরিবহণের মালিক-শ্রমিক সাধারণ যাত্রীদের পরোয়া করেন না, তারা বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশকেও পাত্তা দেন না এক ছটাকও।

এই যে এত অস্বাভাবিকতা, বিশৃঙ্খলা এবং বেপরোয়া হওয়ার ফিরিস্তি দিলাম, তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক কিন্তু রাজনীতি। ক্ষমতায় যাওয়ার এবং ধরে রাখার রাজনীতি। দুই গন্তব্যের জন্যই রাজনৈতিক দলগুলো সমাজের নানা গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। শুধু তো শাসন দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না। ‘হালুয়া-রুটি’ দিয়েও শান্ত বা বশে রাখতে হয়। সম্ভবত এখন রাজনীতিতে ‘হালুয়া রুটি’র বরাদ্দ বেড়ে গেছে, বেড়েছে ক্ষুধার্তের সংখ্যাও। যতক্ষণ পেশাজীবী এবং সেবাদানকারী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো তাদের ক্ষুধা বা লোভকে সংযম করতে না শিখবে ততক্ষণ পর্যন্ত ‘হালুয়া রুটি’র দখল নেওয়ার এই মচ্ছব চলতেই থাকবে। সমাজও পাবে না প্রশান্ত জলাশয়ের দেখা।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ