প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশের বৈশাখ নিয়ে আনন্দবাজারের প্রতিবেদন ‘অষ্টমীর একডালিয়া’ ও ‘মৌলবাদকে মোকাবিলা’

বাংলাদেশের বৈশাখ উৎসব নিয়ে স্বদেশীয় পত্রিকায় যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও বির্বতনের চিত্রটি ফুটে উঠেনি, সেটিই পরিস্ফূট হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বহুল প্রচারিত আনন্দবাজার পত্রিকায়। সেটি কি আমাদের দৈন্যতা, নাকি চিরায়ত সংস্কৃতি মূল্যায়নের অক্ষমতা? গত ১৪ এবং ১৫ এপ্রিল প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনগুলো দেখলে ও পড়লে বোঝা যাবে তাদের দৃষ্টিতে স্বজাত্যাভিমান, মূল্যায়নপর পর্যালোচনা ও দিকনির্দেশনাটি কতটা বুদ্ধিদীপ্ততায় আলোকিত!

ওই মূল্যায়ন পর চিত্রটি বিধৃত হয়েছে রাজধানী ঢাকা থেকে প্রেরিত অঞ্জন রায়ের ‘ঢাকায় বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রায় শুধুই মানুষ’, দেবদূত ঘোষঠাকুরের ‘ঢাকায় পয়লা যেন অষ্টমীর একডালিয়া’ এবং কুদ্দুস আফ্রাদের ‘মৌলবাদকে পথে নেমে মোকাবিলা বাংলাদেশে’ শীর্ষক প্রতিবেদনগুলোয়। এতে শিরোনামেই শুধুই মাহাত্ম্যটি উদ্ভাসিত হয়নি, বরং নিপুণ লেখনীতে ছিল পটভূমি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন।

সেগুলোই দেখা যাক। অঞ্জন রায় তার প্রতিবেদনটির সূচনায় লিখেছেন, “সেই কবে এই জনপদের কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার গ্রামের আখড়ায় ফকির লালন সাঁইজি উচ্চারণ করেছিলেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। সেই উচ্চারণকে ধারণ করেই সত্যিকারের মানুষ হওয়ার বিষয়ে এবারের শপথ ছিল ঢাকায়, বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। মানুষের ভিড়ে এবারের শোভাযাত্রার মিছিল হয়ে উঠেছিল মহামিছিল। সেই পুরনো পোশাকের ঢাকিরা সার বেঁধে বোল তুলেছেন ঢাকে। তালে তালে নাচছে শিশু থেকে বৃদ্ধ। জানান দিচ্ছে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সব মানুষের উৎসব পয়লা বৈশাখের অমিত শক্তির কথা। অন্ধকার অপশক্তির সঙ্গে লড়াইয়ে সবচেয়ে শক্তিমান বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। সেই ধারণাকে ধারণ করেই আয়োজিত হয়ে চলেছে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার। প্রায় প্রত্যেকের হাতে বিশাল আকারের মুখোশ, শোলার সেই প্রাচীন রূপকথার পাখি, টেপা পুতুল, বিভিন্ন মঙ্গল প্রতীক। ‘এই শোভাযাত্রায় একটাই শপথÑ মানুষের মধ্যে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার যে আকাঙ্খা, প্রতিপাদ্যে সেই বার্তাই ছড়িয়ে দিতে চায় মঙ্গল শোভাযাত্রা’, এমনটাই বললেন শোভাযাত্রা আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। … ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে সেই সময়ের ক্ষমতার দখলদার এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের বার্তা নিয়ে শুরু হয়েছিল পয়লা বৈশাখের দিনের প্রথম ভাগের এই আনন্দ শোভাযাত্রা। ১৯৯৬-তে আনন্দ শোভাযাত্রার নাম বদলে রাখা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। বছর বছর বাড়তে থাকে সেই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা। এখন সেই শোভাযাত্রা রূপ নিয়েছে ঢাকা শহরের প্রধান বর্ষবরণের আয়োজনের। শুধু ঢাকা শহরেরই নয়Ñ জেলা বা উপজেলা পর্যায়েও এখন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়োজন করছে এই শোভাযাত্রার। শেষ পর্যন্ত বাঙালির বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল হেরিটেজ’ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে”।

দেবদূত ঘোষঠাকুর লিখেছেন, ‘কার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে! কখনো মনে হচ্ছিল কলকাতার কলেজ স্কোয়ার বা একডালিয়ার পুজোম-প। কখনওবা শান্তি নিকেতনের বসন্ত উৎসবের চেহারা। তা সে রমনার বটমূলের বৃন্দগানই হোক কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাজপথে মঙ্গল শোভাযাত্রা পুজো। পুজো, বসন্ত উৎসবের মিলমিশে একাকার ঢাকার নববর্ষের সকাল’।

আর কুদ্দুস আফ্রাদ লিখেছেন, “সকাল থেকে লাখো মানুষের ভিড়ে সরগরম ঢাকা। আজ পয়লা বৈশাখ। নতুন বছরের সূচনা। রমনার বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানকে ঘিরে প্রাণের মেলা ছড়িয়েছে গোটা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। এগারোটা বছর আগেও পয়লা বৈশাখের ছবিটা এ রকম ছিল না। বিএনপি-জামায়াতে ইসলামি জমানার বাংলাদেশ তখন নানা ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের খোলা ময়দান। বাংলা নববর্ষ পালন চলবে নাÑফতোয়া দিয়েছিল তারা। আয়োজকেরা সরকারের কাছে গেলে জানিয়ে দেওয়া হয়, পয়লা বৈশাখ পালন করতে চাইলে নিজের ঝুঁকিতে করুণ। এখানেই শেষ নয়। খালেদা জিয়া সরকারের মন্ত্রীরা খোলাখুলিই ঘোষণা করেন, সরকার এই উৎসব পালনে আর পাশে থাকবে না। মুষড়ে ছিল ঢাকা। ঘরোয়াভাবে নববর্ষ পালিত হলেও প্রাণের ছোঁয়া ছিল না। সেই সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্বে আসার পর পরই আরও একটা পয়লা বৈশাখে বাংলাদেশ যেন বন্ধন মুক্তির আনন্দে ফেরে। তার পরে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে মৌলবাদকে মোকাবিলায় নববর্ষের মতো এই সার্বিক অসাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠানকেই হাতিয়ার হিসেবে তুলে নেয়। এর মধ্যেই ইউনেস্কো ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’-এর স্বীকৃতি দেয় নববর্ষে ঢাকার মঙ্গল শোভাযাত্রাকে। তার পরে বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে পয়লা বৈশাখ। চট্টগ্রাম থেকে যশোর, ঠাকুরগাঁ থেকে রংপুর বা রাজশাহী, সর্বত্রই নববর্ষ এখন রঙের উৎসব”।

ই-মেইল: [email protected]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত