প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হালদায় উৎসবমুখর পরিবেশ

এম.ইউছুপ রেজা, চট্টগ্রাম: এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রস্থল হালদা নদীতে ডিম ছেড়েছে রুই জাতীয় মা মাছ।

প্রতিটি ডিম প্রদানের উপযোগী মাছের ওজন পাঁচ কেজি থেকে এক মণ পর্যন্ত। হালদা নদীতে মাছের রেণু সংগ্রহ করার প্রধান মৌসুম হল বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসের অমাবশ্যা এবং পূর্ণিমার প্রবল বর্ষণ এবং মেঘের গর্জন মুহূর্তে। এ সময় মা-মাছ নদীতে ডিম ছাড়ে।

গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টা দিকে মা মাছ ডিম ছাড়ে বলে জানান স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারীরা। গত কয়েকদিন ধরে হালদা পাড়ে নৌকা নিয়ে অপেক্ষারত জেলেরা মা মাছেরা ডিম ছাড়ার পর পরই ডিম সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময় প্রাকৃতিক বৈরিতা উপেক্ষা করে রাউজান-হাটহাজারীর প্রায় পাঁচ শতাধিক জেলে সারারাত হালদা নদীতে মা মাছের ডিম সংগ্রহ করে। গতবছর দুই শতাধিক নৌকা মাছের ডিম সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করেছিল দিনের পর দিন। ডিম না পেয়ে অনেকে হতাশ হয়ে পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।

শুক্রবার সকাল ৯টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম উপজেলার রাউজানের হালদা পাড়ের আজিমারঘাটে গিয়ে দেখা গেছে সারারাত নদীতে ডিম সংগ্রহ শেষে স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারীরা সংগৃহিত ডিম নিয়ে হালদা পাড়ে নৌকা নোঙর করেছেন। তাদের কেউ কেউ হালদা পাড়ের সনাতন ডিম নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া খননকৃত অগভীর কূপে ডিম রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

হালদায় ডিম সংগ্রহকারী রওশনগীর আলম (৪৫) বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটা থেকেই নৌকা নিয়ে আমরা হালদা নদীতে অবস্থান নিই। মধ্যরাতে মা মাছ ডিম ছাড়ে। ভোর নয়টা পর্যন্ত আমি ৫টি নৌকায় ১৫ বালতি (৩৭৫০গ্রাম) ডিম সংগ্রহ করেছি। তবে কারো কারো নৌকায় ২০-২৫ বালতি পর্যন্ত ডিম ধরা পড়েছে। বিগত ১০ বছর আগের মত এবার জালে ডিম ধরা পড়ে। এবার ডিম সংগ্রহকারীরা মহা খুশি।

রাউজান উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার রাত থেকেই উপজেলার প্রায় পাঁচ শতাধিক নৌকাযোগে স্থানীয় জেলেরা ডিম সংগ্রহ করেন। সারারাত ধরে নদীর বেশ কয়েকটি পয়েন্টে জাল পেলে ডিম সংগ্রহ করেন তারা। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে আনুমানিক তিন হাজার কেজি মাছের ডিম সংগৃহিত হয়েছে। অতীতের মতো যাতে কেউ মা-মাছ শিকার করতে না পারে সে জন্য হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা হালদা নদীতে টহল দিচ্ছে। স্থানীয় পুলিশকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।

এব্যাপারে রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন রেজা কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, হালদা আমাদের জাতীয় সম্পদ। হালদার মা মাছ রক্ষায় মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মোতাবেক উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহন করেছি।

রাউজানের সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এম.পি মহোদয় হালদার ঐতিহ্য রক্ষায় খুব আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন এবং কেউ যাতে মা মাছের কোনো প্রকার ক্ষতি সাধন করতে না পারে সে ব্যাপারে উনার কঠোর দিক নির্দেশনা দেওয়া আছে। মা মাছের ডিম ছাড়ায় সময় কেউ মা মাছ ধরেছে এ ধরণের খবর পেলে সাথে সাথে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

উল্লেখ্য,এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র চট্টগ্রামের হালদা নদী। এ নদী পার্বত্য রামগড় তানার বদনাতলী পাহাড় থেকে সৃষ্ট হয়ে ফটিকছড়ির র্উাজান, হাটহাজারী অতিক্রম করে কর্ণফুলী নদীতে মিশে গেছে।

নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৫ কিলোমিটার। নদীর উৎস মানিকছড়ি, ধুরং, বারমাসিয়া, মন্দাকিনী, লেলাং, বোয়ালিয়া, চানখালী, সর্ত্তারঘাট,আঙ্গুনিরঘোনা, খলিফাঘোনা,কাগতিয়া, সোনাইখাল, পারাখালী, খাটাখালীসহ বেশকিছু ছোট ছোট ছড়া। নদীটির গভীরতা স্থান বিশেষ ২৫ থেকে ৫০ ফুট। হালদা নদী থেকে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ প্রভৃতি কার্প জাতীয় মাছের সরাসরি ডিম সংগ্রহ করা হয়।

গত শতকের পঞ্চাশ দশকে দেশের মোট মৎস্য চাহিদার ৭০ ভাগ পুরন করতো হালদা নদীর পোনা। কিন্তু রাষ্ট্রের সুষ্ঠ পরিকল্পনা ও সঠিক পদক্ষেপের অভাবে, মা-মাছ শিকার, নদীর বাঁক কাটাসহ বিভিন্ন কারণে হালদা নদীর ঐতিহ্য আজ ধ্বংস প্রায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হালদা নদীর ৪টি বাঁক কেটে ফেলা, অপরিকল্পিতভাবে সুইচগেট নির্মাণ, মা-মাছ নিধন, হালদা সংলগ্ন এলাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠাই এ নদীতে মাছের প্রজনন কমে যাচ্ছে।

১৯৪৬ সালের হিসাব অনুযায়ী হালদা নদী ৪ হাজার কেজি ডিম দেয়। এখান থেকে ডিম আহরণ করা হয়েছে ১৯৯৭ সালে ৩শ কেজি, ২০০৫ সালে ১শ ৫০ কেজি, ২০০৭ সালে এর পরিমাণ বেড়ে ৩শ পঞ্চাশ কেজিতে উন্নতি হয়।

মৎস্য বিশেষজ্ঞ মতে, প্রতিটি ডিম প্রদানের উপযোগী মাছের ওজন পাঁচ কেজি থেকে এক মণ পর্যন্ত। হালদা নদীতে মাছের রেণু সংগ্রহ করার প্রধান মৌসুম হল বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসের অমাবশ্যা এবং পূর্ণিমার প্রবল বর্ষণ এবং মেঘের গর্জন মুহূর্তে। এ সময় মা-মাছ নদীতে ডিম ছাড়ে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত