প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হালদাপারের জেলেদের হাসি

আবু হোসাইন শুভ : দেশে কার্প জাতীয় মাছের ডিম সংগ্রহের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী। এখানে এবার বিগত ১০ বছরে সর্বোচ্চ ডিম ছেড়েছে মা-মাছ। গত কয়েক বছর অপেক্ষা করে ডিমছাড়া ঘরে ফিরলেও এবার খালি হাতে ফিরতে হয়নি কোনো জেলেকে। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ডিম সংগ্রহ করতে পারায় খুশি হালদা পাড়ের জেলেরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হালদায় ড্রেজার চলাচল, বালি উত্তোলন ও ইঞ্জিনচালিত বোট চলাচল বন্ধ, মা-মাছ নিধন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ, সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ায় মাছের ডিম দেওয়া এবং সংগ্রহ বেড়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে এ হার আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হালদায় ডিম সংগ্রহকারী ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ২২ হাজার ৬৮০ কেজি ডিম সংগ্রহ হয়েছে। গতবার হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৬৮০ কেজি। এই হিসাবে এবার রেণু মিলবে প্রায় ৩৭৮ কেজি। গতবার প্রতিকেজি রেণু ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি হলেও এবার ৭০ থেকে ৮০ হাজারে নেমে আসতে পারে। সরকারি হিসেবে ২০১২ সালে নদী থেকে সংগৃহীত ডিমে রেণু হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ কেজি। ২০১৩ সালে ৬২৪ কেজি এবং ২০১৪ সালে মাত্র ৫০০ কেজি।

গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে হালদা নদী ও আশপাশের এলাকায় প্রবল বজ্রবৃষ্টি হয়। কার্প জাতীয় মা-মাছ এ ধরনের সময়কেই ডিম ছাড়ার জন্য উপযোগী বলে মনে করে। আবহাওয়া বুঝে ডিম সংগ্রহকারীরাও ছিলেন প্রস্তুত। হালদা নদীর হাটহাজারী অংশের মাদার্শা এলাকায় ৬টি নৌকা নিয়ে মাছের ডিম সংগ্রহে গত মঙ্গলবার থেকে নদীতে অপেক্ষা করছিলেন স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারী আশু বড়ুয়া।

তিনি বলেন, বুধবার নমুনা ডিম ছাড়ে মা-মাছ। বৃহস্পতিবার রাত দেড়টা থেকে পুরোদমে ডিম ছাড়ে। যারা নদীতে ছিলেন, তারা বেশি সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ছয়টি নৌকার মধ্যে চারটি নৌকা ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় ১৩ বালতি ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছি। এতে অন্তত সাড়ে পাঁচ কেজি রেণু হবে। এবার প্রতি কেজি রেণু ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হতে পারে।

স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর ধরেই হালদায় মা-মাছের ছাড়া ডিমের পরিমাণ ক্রমে কমছিল। পুরোদমে ডিম দেওয়ার আগে বুধবার অল্প পরিমাণে নমুনা ডিম ছাড়ার পর প্রস্তুতি নিয়ে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেন জেলেরা। বৃহস্পতিবার রাত দেড়টা থেকে হালদা নদীর রাউজান ও হাটহাজারী অংশের গড়দুয়ারা, আজিমের ঘোনা, অঙ্কুরিয়া ঘোনা, কাগতিয়া, নাপিতের ঘোনা, রামদাশ মুন্সীর ঘাট, মাছুয়া ঘোনাসহ একাধিক স্থানে ডিম সংগ্রহে নামেন জেলেরা। শুক্রবার দুপুরে ডিম সংগ্রহ শেষ হয়।

হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া আমাদের সময়কে বলেন, গতবার ১০৫টি নৌকা ডিম সংগ্রহে গিয়েছিল। কিন্তু এবার ৪০৫টি নৌকা ডিম সংগ্রহে নামে। এর পরও সবাই ডিম পেয়েছেন। বিগত ১০ বছরের মধ্যে এবার ডিমের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, হালদায় এবার কয়েকটি ডলফিন মারা যাওয়ার ঘটনায় প্রশাসনের নজরদারি বেশি ছিল। ফলে অন্যবারের মতো মা-মাছ নিধন করতে পারেনি। এ ছাড়া ড্রেজার চলাচল, বালি উত্তোলন বন্ধ, দূষণ রোধ, ইঞ্জিনচালিত বোট চলাচল বন্ধ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নজরদারি, এনজিও সংস্থা পিকেএসএফ ও আইডএফের বিশেষ উদ্যোগ এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মা মাছের সংখ্যা বেড়েছে।

জানা গেছে, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে হালদায় মা-মাছ রক্ষায় কাজ শুরু হয়। গত বছর ডিম সংগ্রহের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে অভিজ্ঞতার আলোকে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। হালদার দুই পাড়ে ৩০ জন পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের প্রত্যেককে রেইনকোট, টর্চলাইট, হ্যান্ডমাইক, মোবাইল এবং একটি স্পিডবোট ও দুটি সোলার বোট দেওয়া হয়। তারা নিয়মিত দিনরাত পাহারা দিয়েছেন। রাতে অভিযান চালিয়েছেন, পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করেছেন। আইডিএফের সিনিয়র সহকারী কো-অর্ডিনেটর শাহ আলম বলেন, ইতিবাচক এসব পদক্ষেপের কারণে হালাদায় এবার বেশি ডিম পাওয়া গেছে।

হালদায় মূলত রুই, কাতল, মৃগেল, কালিবাউশ জাতীয় মা-মাছ ডিম দেয়। চট্টগ্রামের রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলাজুড়ে বয়ে গেছে হালদা নদী। চোরা শিকারির তৎপরতায় নদীতে মা-মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতিবছরই হালদায় ডিম উৎপাদনের পরিমাণ কমছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র : আমাদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত