প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এলএনজি যুগে প্রবেশ করছে দেশ

শিমুল : তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) যুগের প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি মাসের ২৪-২৫ তারিখ নাগাদ কাতার থেকে এলএনজিবাহী জাহাজ কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে এসে পৌঁছবে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ওই গ্যাস রূপান্তরিত হয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির কারণে আগামী মাসেই দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়বে। আর আগামী বছরের শুরুর দিকে বাড়বে আবাসিক গ্যাসের দামও। তবে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় সংযোগ পাবে অনেক নতুন কারখানা।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক ৩৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৭৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাত্ দৈনিক ৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এ সংকট ক্রমেই বাড়ছে। আর এই ঘাটতি দূর করতে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে প্রয়োজনীয় পাইপলাইন নির্মাণের কাজও প্রায় শেষ। কাতারের রাসগ্যাস বছরে ২৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করবে বলে পেট্রোবাংলার সাথে চুক্তি সই করেছে। পাশাপাশি ওমান থেকে এলএনজি আমদানির জন্য ওমান ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের (ওটিআই) সাথে ১০ বছর মেয়াদি চুক্তি আগামী মাসে স্বাক্ষরিত হতে পারে। গত বুধবার ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে চুক্তির খসড়া অনুমোদিত হয়েছে। ১০ বছরের মধ্যে প্রথম ৬ বছর ধরে ওটিআই প্রতি বছর মোট ১৮ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করবে। বাকি মেয়াদে সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে তা প্রতি বছর ২৫ লাখ টন হবে।

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী বলেন, এলএনজি আমদানির সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এটি দেশের গ্যাস সংকট সমাধানে বড় ভূমিকা রাখবে। এলএনজি দেশীয় গ্যাসের সাথে মিশিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করা হবে। এজন্য বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হবে।

এলএনজি আমদানির বিষয়টি সরাসরি তদারক করছে পেট্রোবাংলার আওতাধীন প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল)। কোম্পানিটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, গত ১৬ এপ্রিল কাতার থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস নিয়ে রাসগ্যাসের জাহাজ যাত্রা শুরু করেছে। জাহাজ কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান টার্মিনালে এপ্রিলের ২৪ বা ২৫ তারিখে পৌঁছার কথা রয়েছে। যেহেতু দেশে এই জ্বালানি প্রথমবারের মতো আনা হচ্ছে তাই এটি রূপান্তরসহ আরো কিছু জটিলতা রয়েছে। সব মিলিয়ে মে মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহ নাগাদ এ গ্যাস গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করা যাবে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, এলএনজি আমদানির জন্য কাতার এবং সুইজারল্যান্ডের সাথে জিটুজি চুক্তি হয়েছে। ওমান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও জিটুজি ভিত্তিতে এলএনজি আনতে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। আরো কয়েকটি দেশের খোলা বাজার থেকে এলএনজি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জি ছাড়াও দেশীয় সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে চলতি বছরের মধ্যে আরও ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে। অক্টোবর নাগাদ তাদের এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সম্পন্ন হবে এবং ডিসেম্বর নাগাদ আমদানি শুরুর কথা রয়েছে। এছাড়া কুতুবদিয়া ও পায়রাতে আরো একাধিক স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

শিল্পে নতুন সংযোগ: জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি যুক্ত হওয়ার পর ২ হাজার ৩৯০টি শিল্প-কারখানায় গ্যাসের সংযোগ দেয়া হবে। সরকার ধাপে ধাপে মে মাস থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে এসব সংযোগ দিবে।

বাড়বে গ্যাসের দাম:এ দিকে পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়— সম্পূরক শুল্কসহ অন্যান্য কর-মাশুল বাদে দেশে উত্পাদিত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৪ টাকা ৩০ পয়সা। আর শুল্ক-করসহ প্রতি ঘন মিটার গ্যাসের দাম পড়ে ৯ টাকা ৫৫ পয়সা। কাতার থেকে যে দামে গ্যাস আনা হচ্ছে তা দেশীয় গ্যাসের সাথে মিশিয়ে বিক্রি করা হলে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় দাম পড়বে ১৪ টাকা ৬৪ পয়সা। বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৭ টাকা ৩৯ পয়সা। এলএনজি আনা হলে তা গড়ে ১৩ টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে গ্যাস বিতরণকারী ছয়টি কোম্পানি বিইআরসিতে দামবৃদ্ধির প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে। মে’র প্রথম সপ্তাহে যেকোনো দিন এ সংক্রান্ত শুনানি এবং নতুন মূল্যহার কার্যকর হতে পারে।

জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে অর্থায়ন:এ দিকে জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে এলএনজির অর্থায়নের জন্য গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে অনুরোধ করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। পরবর্তীকালে পেট্রোবাংলা কমিশনের কাছে এ বিষয়ে আবেদন করে। প্রতিষ্ঠানটির আবেদনে বলা হয়, এলএনজি ক্রয়, এফএসআরইউ পরিচালনা ও টার্মিনাল চার্জ বাবদ চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ৮৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৯২২ কোটি টাকা (১ ডলার = ৮২ টাকা হিসেবে) প্রয়োজন হবে। রিভলভিং ফান্ড হিসেবে এ অর্থসংস্থানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কমিশনের কাছে আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সূত্র জানায়, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তায় ২০১৫ সালে গঠন করা হয় জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল। এখন পর্যন্ত এ তহবিলে জমা হয়েছে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এটি একটি রিভলভিং ফান্ড হিসেবে পরিচালিত হবে। এ তহবিলের অর্থ থেকে অর্জিত সুদ ও সারচার্জ তহবিলে জমা হবে। তহবিল পরিচালনায় নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে।

এলএনজি কী এবং এর মানদণ্ড :প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণ চাপ ও তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। শীতলীকরণ (রেফ্রিজারেশন) প্রযুক্তির মাধ্যমে তাপমাত্রা কমিয়ে মাইনাস ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনলে তা তরলে পরিণত হয়। এই তরল প্রাকৃতিক গ্যাসকেই বলা হয় এলএনজি। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, এলএনজিতে মিথেনের পরিমাণ ৮৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এছাড়া ইথেন ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, প্রপেন ২ দশমিক ১৬ শতাংশ ও বিউটেন ১ দশমিক ১২ শতাংশ। আমদানিকৃত এলএনজি গ্যাসের মান নিশ্চিতকরণে তিনটি টিম কাজ করবে। এগুলো হল ক্রেতা পেট্রোবাংলার পক্ষে একটি, এলএনজি বিক্রেতার পক্ষে একটি ও অন্যটি ক্রেতা-বিক্রেতার সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কমিটি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত