প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোনও ছাত্রীকে মধ্যরাতে হল থেকে বের করে দেওয়া যায়?

শুভ : শারমীন শুভকে রাত ১২টার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন তার বাবা গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের তিন ছাত্রীকে মধ্যরাতে ‘বের করে’ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে হল প্রশাসনের আচরণ নিয়ে। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্র-শিক্ষক, ছাত্রনেতা, সাবেক উপাচার্য এবং বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, কেউ যদি অপরাধ করে থাকে, তাহলে সেটার বিচার দিনের বেলা হতে পারে। কেন মধ্যরাতে তাদের বের করে দিতে হবে? এর পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে। সেটা হতে পারে উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও ছাত্রনেতাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসন আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত ও আন্দোলনকারীদের হয়রানি করার উদ্দেশ্যে তিন ছাত্রীকে রাতের আঁধারে বের করে দিয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য। এ ধরনের কাজের জন্য হল প্রভোস্টের পদত্যাগ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

কবি সুফিয়া কামাল হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান এশাকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে বৃহস্পতিবার (১৯ এপ্রিল) রাতে হল থেকে তিন ছাত্রীকে অভিভাবকদের সঙ্গে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই তিন ছাত্রী হলেন— গণিত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শারমীন শুভ, থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার লিজা ও গণিত বিভাগের পারভীন। রাত ১০টার দিকে পারভীন ও লিজা এবং রাত ১২টার দিকে শুভকে হল ছাড়তে হয়। অভিভাবকরা এসে তাদের নিয়ে যান। এছাড়া, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রিমির বাবা ধামরাই থেকে সুফিয়া কামাল হলে উপস্থিত হন রাত সাড়ে ১২টার দিকে। পরে তিনি একাই হল অফিস থেকে বেরিয়ে আসেন।

রাতে হল থেকে বের করে দেওয়া নিয়ে মুখ খোলেননি অভিযুক্ত ছাত্রীরা। তবে তাদের নিতে আসা অভিভাবকরা বলেছেন, হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভেতরে যা ঘটেছে, তা নিয়ে বাইরে কিছু না বলার জন্য।

এছাড়া, সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রীদের ডেকে এনে হল প্রভোস্ট সাবিতা রেজওয়ানা বহিষ্কার করার হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুফিয়া কামাল হলের একাধিক ছাত্রী এ তথ্য জানিয়েছেন।

রাতে তিন ছাত্রীকে বের করে দেওয়ার ঘটনাটি জানাজানির পর সমালোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে। কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া রাতের আঁধারে না করে, দিনে সমস্যার সমাধান করা অনেক বেশি শোভনীয় ও কার্যকর হতো বলে মনে করছেন তারা।

বিক্ষোভ মিছিলকোটা সংস্কার আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি সাধারণ ছাত্রীদের ভয় দেখানো ও হয়রানির উদ্দেশ্যে সুফিয়া কামাল হলের তিন ছাত্রীকে রাতে আঁধারে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ছাত্র ফেডারেশন ঢাবি শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির।

তিনি বলেন, ‘এই কাজটা করা হয়েছে আন্দোলনকারীদের ভয় দেখানো ও হয়রানি করার উদ্দেশ্যে। হলে প্রবেশ ও সব প্রশাসনিক কাজ রাতে সাড়ে ৯টার মধ্যে শেষ করার নিয়ম থাকলেও হল প্রশাসন কেন রাত ১২টার পর এই কাজ করলো, এর জবাব দিতে হবে। হল প্রভোস্ট খুবই নিন্দনীয় কাজ করেছেন। আমরা তার পদত্যাগ দাবি করছি। তার উচিত এই নিন্দনীয় ঘটনার জন্য পদত্যাগ করা।’

রাত ১২ টার সময় যতই লোকাল গার্ডিয়ান ডাকা হোক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মধ্যরাতে এই আচরণ করতে পারেন না বলে দাবি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নেত্রী। তিনি বলেন, ‘হল প্রশাসন কোনও ধরনের তদন্ত কমিটি গঠন ও তদন্ত ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছে, তা উদ্দেশ্য প্রণোদিত। কী কারণে এমন আচরণ করা হলো, তার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কবি সুফিয়া কামাল হলের প্রভোস্ট সাবিতা রেজওয়ানা রহমানের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। সংগঠনের পক্ষ থেকে এই দাবি জানান যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর।

ছাত্রীদের সতর্ক করা ও অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি মধ্যরাতে না করে, দিনের বেলা সমাধান করা অনেক বেশি শোভনীয় হতো বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন। তিনি বলেন, ‘এশাকে মারধর ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগ ওঠা ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে হল কর্তৃপক্ষের একটা উৎকণ্ঠা ছিল। এ যেমন সত্যি, ঠিক সেভাবেই রাতের অন্ধকারে অভিভাবকদের কাছে না দিয়ে, দিনের বেলা করাটা আরও বেশি শোভনীয় হতো।’

মধ্যরাতে অভিভাবকদের ডেকে এনে ছাত্রীদের বের করে দেওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গতকাল রাতের ঘটনা আমাকে স্তম্ভিত করেছে, আমি স্তম্ভিত। আমি অবাক যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এরকম একটি আচরণ করতে পারে। এটা ভাবা যায় না। কেউ যদি ভুল করে থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানের নিয়মানুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। আমার মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে কোথাও লেখা নেই যে, রাত ১২টার সময় কোনও ছাত্রীকে স্থানীয় অভিভাবকের হাতে তুলে দেওয়া যায়। নিয়ম ভেঙে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা অগ্রহণযোগ্য। এটা অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

সুফিয়া কামাল হলের তিন ছাত্রীকে সতর্ক করার জন্য অভিভাবকদের ডেকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি নেতিবাচকভাবে দেখছেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে আজাদ চৌধুরী। তবে মধ্যরাতে এ কাজটি করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘সুফিয়া কামাল হলসহ বিভিন্ন হলের মেয়েরা ওই রাতে (১০ এপ্রিল) গেট ভেঙে বেরিয়ে এসেছিল। রাত ১২টার সময় হলের ছাত্রীরা বেরিয়ে আসায় যেকোনও সময় যেকোনও দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো। এই ঘটনাটি কর্তৃপক্ষ খুব সিরিয়াসলি নিয়েছে। ফলে ওইদিন যারা সোশ্যাল মিডিয়াতে পায়ের রগ কাটার গুজব ছড়িয়েছিল, তাদের শুধুমাত্র সতর্ক করে অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে কোনও ধরনের সাসপেন্ড করা হয়নি, সতর্ক করা হয়েছে। কোনও ধরনের ফলস নিউজ যাতে এভাবে না ছড়ায়, এজন্য এই সতর্ক করা। এটা কোনও পানিসমেন্ট না। এতে করে সবার মাঝে একটা মেসেজ দেওয়া যে, তোমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে ফলস নিউজ প্লে করো না।’

তিনি বলেন, ‘যাদেরকে অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, তারা দুই-চারদিন পর আবার হলে ফিরে আসবে। তবে আমার মনে হয়, এ কাজটা দিনের বেলাতে করলেই ভালো হতো। দিনে যদি অভিভাবককে ডেকে এনে অভিযোগের বিষয়গুলো বলা হতো, তাহলে ভালো হতো। এছাড়া, হল কর্তৃপক্ষ হয়তো ভেবেছে, রাতে ছাড়া সব মেয়েদের একসঙ্গে পাওয়া যাবে না। যাই হোক, এই বিষয়টা এখানেই শেষ করা মনে হয় ভালো। কারণ, এটা নিয়ে আবারও কেউ কেউ উস্কানি ছড়াবে। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা নষ্ট হবে।’

তিন ছাত্রীকে হল থেকে রাতে আঁধারে বের করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কবি সুফিয়া কামাল হলের প্রভোস্ট ড. সাবিতা রেজওয়ানা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মোর্শেদা নামে একজন শিক্ষার্থীর রগ কেটে দেওয়া হয়েছিল বলে যে গুজব ১০ এপ্রিল ছড়ানো হয়েছিল, মোবাইল ফোন চেক করে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করেছি। যারা ওই ঘটনায় জড়িত ছিল, তাদের অভিভাবকদের হলে ডেকেছি। তাদেরকে (অভিভাবকদের) ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভিডিওগুলো দেখানো হয়েছে। তখন অভিভাবকরা নিজেরাও লজ্জা পেয়েছেন। তারা স্বেচ্ছায় তাদের মেয়েদের নিয়ে গেছেন।’

একই দাবি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘মেয়েদের বের করে দেওয়া হয়নি। তিন ছাত্রীকে অভিভাবকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বের করে দেওয়ার কথাটা গুজব। এর মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। হল থেকে কাউকেই বের করে দেওয়া হয়নি।’ সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত