প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাগেরহাটে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ ও বেত শিল্প

এস.এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট: বাগেরহাটের ৯উপজেলায় গ্রামীণ বাংলার আবহমানকাল থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় ও অন্যতম প্রতিচ্ছবি বাঁশ ও বেত দিয়ে প্রস্তুতকৃত শিল্প সামগ্রী সকল সমাজের মানুষ ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে আসছে। কালেরগর্ভে এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় পাল্টে দিয়েছে সর্বত্র গ্রাম বাংলার চালচিত্র। দিন দিন বাঁশ ও বেত শিল্পের কদর কমে যাচ্ছে, পাশাপাশি চরম দূর্দিন নেমে এসেছে শিল্পটির সাথে জড়িত কারিগরদের জীবনে। প্লাস্টিক সামগ্রি জিনিষ পত্র ব্যবহারে এ শিল্প ধংসের কারন ।

সরেজমিনে জানা গেছে,বাগেরহাট জেলার নয় উপজেলায়এক সময় বাংলার শহর-নগরে বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি নানা প্রকার শিল্প সামগ্রীর বেশ কদর ছিল। বাঁশ ও বেত দিয়ে বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত সামগ্রীর মধ্যে: ঝুড়ি, ডালা, কুলা, চাঙ্গারী, মুড়া, ঢুষি, হাতপাখা, চালোন, টোকা, বাঁশি, গোলা, ডোলা, আউড়ি, চাঁচ, ধামা, পাতি, চেয়ার, টেবিল, বই রাখার তাক সহ বিভিন্ন প্রকার শিল্প সামগ্রী ব্যবহার করা হত। ধনী-গরীবসহ সকল পেশার মানুষ কম বেশি অনায়াসেই বাঁশ ও বেত জাত সামগ্রী ব্যবহার করত। পাশাপাশি এ শিল্পের সাথে জড়িত মানুষ তাদের জীবন-জীবিকা চালাতো অনেক সুন্দরভাবে।

কিন্তু বর্তমানে সময়ের ব্যবধানে আধুনিক ষ্টীল, প্লাষ্টিকের তৈরি নিত্য নতুন ডিজাইনের বিভিন্ন সামগ্রী খুব সহজে অনেক কম মূল্যে হাতের নাগালে টেকসই হওয়ার কারণে এবং প্রচুর পরিমানে এ সামগ্রী ব্যবহারের কারণে বাঁশ ও বেত দিয়ে প্রস্তুতকৃত শিল্প সামগ্রী সকলের কাছে গ্রহণ যোগ্যতা হারিয়ে ফেলছে বলে অনেকেই জানায়। সাথে সাথে এ শিল্পের কারিগররা সীমাহীন কষ্টের মধ্যে থেকেও পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে। অনেকে পেশা বদল করে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িত হয়েছে। বাঁশ ও বেত শিল্পের সাথে যারা জড়িত তাদের প্রায় সবাই ঋষি সম্প্রদায়। এরা শুধু সমাজে অবহেলা বঞ্চিত নয়। পাশাপাশি সরকারের দেওয়া প্রায় সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতা থেকেও অনেকটা বঞ্চিত বলে তাদের অভিযোগ। সাথে তাদের তৈরি শিল্প সামগ্রীর চাহিদা কালেরগর্ভে হারিয়ে যাবার কারণে অনেকে করছে মানবেতর জীবন-যাপন।

মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৫নং মোরেলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের গ্রামের শাথিরানি, চায়না, সুজিতা, রতনও নিমাই চন্দ্র সহ এ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক কারিগররা বলেন, বাঁশ ও বেত সংগ্রহ করে বাড়িতে পরিবারের সবাই মিলে প্রস্তুত করে বাজারে বিক্রয় করে বেশি লাভ থাকে না। বাজারে একটি ধামা ৩৫০-৮শ, পাতি ৭০-২৫০, ঝুড়ি ৮০-১০০, দোলনা ২০০-২৫০, কুলা ৫০-৮০, মুরগী ঢাকা ঝুড়ি ৮০-১০০, মাপার জন্য পাল্লা ২শ থেকে ৪শ টাকায় বিক্রয় করা হয়ে থাকে। তৈলকুপী গ্রামে ১শ ঘরের মধ্যে ৪০ ঘর এখনো পূর্বপুরুষদের পেশা ধরে রেখে অনেক কষ্টে জীবন যাপন করে থাকি। আমাদের এ কাজের উপর কেহ ঋন দেয় না।

১৬নং খাউলিয়া ইউনিয়নের গ্রামের সাধন সরদার, মনোরঞ্জন, নিমাই চন্দ্র, চিত্ত হালদার, বাবু হালদার, শাথিরানি, চায়না, সুজিতা বৈরাগী, লিচু রানী, বরুনা সরদার সহ অনেকে জানায়, সেই পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য ধরে রেখে আজও বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঁশ ও বেত সংগ্রহ করে ঝুড়ি, ডালা, ধামা, পাতি, চাঁচ, কুলা সহ বিভিন্ন প্রকারের সামগ্রী তৈরি করে থাকি। এলাকায় ঝোপ-ঝাড় না থাকায় বেত অনেকাংশে পাওয়া যায় না। ভাল বাঁশ ও বেত তেমন পাওয়া যায় না। শিল্পের সামগ্রী জোগাড় করতে অনেক সময় ও অর্থ লেগে যায়।

এগুলো তৈরি করতে আমাদের কেহ ঋন দেয় না। এখানে ৭শ ৫০ ঋষি সম্প্রদায় বাস করে। কিন্তু প্রতিনিয়ত আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করার কারণে এবং বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসের চাহিদা মানুষের কাছে তেমন না থাকায় এখান থেকে অনেকই এ পেশা ছেড়ে দিয়ে বাজারে জুতা সেলাইয়ের কাজ, সেলুনের কাজ, ঢাক-ঢোক তৈরি, ক্ষেত-খামারের কাজ সহ বাজারে বিভিন্ন প্রকারের ব্যবসা গড়ে তুলেছে। আমরা কারোর কাছ থেকে তেমন কোন সাহায্য পাইনা। তারা আরো জানায়, মহিলারা গৃহস্থলির কাজের পাশাপাশি বাঁশ ও বেতের তৈরি সকল জিনিস তৈরিতে পুরুষের সমান পারদর্শী।

সে কারণে সকল প্রতিকুলতার সত্ত্বেও আজও অন্য কাজে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথে মহিলারা পরিবারের বাড়তি আয় হিসেবে প্রতিদিন কাজ করে প্রায় পুরুষের কাজের পাশে বাড়তি আয় ১০০-১২০টাকা যোগ হয়।

সর্বোপরি বাঁশ ও বেত শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট কারিগর ও সর্ব মহলের ধারণা: আধুনিক সরঞ্জমের ব্যবহার কমিয়ে সরকারি, বে-সরকারিভাবে কারিগরদের বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে বাঁশ ও বেত শিল্প অর্থাৎ আমাদের দেশের হস্তশিল্প টিকিয়ে রাখা এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত