প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

৪০ বছর পর দেখা, তবুও জড়িয়ে ধরা হলো না

নিজস্ব প্রতিবেদক : ৪০ বছর পর দেখা হলো দুই ভাই হরমোহন (৬০) ও প্রহল্লাদ বর্মণের (৭০)। এত দিন পর পরস্পরকে দেখে অঝোরে কেঁদেছেন তাঁরা। যেন সিনেমায় হারিয়ে যাওয়া দুই ভাইয়ের গল্প ।

শুধু একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেননি। মাঝখানে রয়েই গেল সেই কাঁটাতার।

হরমোহন থাকেন বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চণ্ডীপুরে। আর প্রহল্লাদ বর্মণ থাকেন ভারতের শিলিগুড়ির জলডুম ফাড়াবাড়ি এলাকায় ।

১ বৈশাখ উপলক্ষে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া ও পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা, মাগুরমারী, সুকানি ও ভুতিপুকুর সীমান্তে বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকদের দিনব্যাপী মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এখানেই দেখা হয় এই দুই ভাইয়ের।

শুধু তাঁরাই নন, নিজেদের আত্মীয়স্বজন, মা, ভাই বোনদের একবার দেখতে কাঁটাতারের দুই পাশে গতকাল দুই দেশের হাজারো মানুষ ভিড় জমায়। এ সময় কাউকে আনন্দে উচ্ছসিত হতে দেখা যায়। কেউ বা বহু বছর পর আপনজনকে পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদেছেন। কেউ কেউ উঁচু স্বরে কুশল বিনিময় করেছেন আপনজনের সঙ্গে। আবার কেউ কাঁটাতারের ওপারে ঢিল ছুঁড়ে দিচ্ছেন বৈশাখী উপহার। বিস্কুট, চানাচুর, শাড়ি লুঙ্গী আরো কত কী!

সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই মিলন মেলা চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এ সময় কাঁটাতারের দুই পাশে ছিল বিজিবি ও বিএসএফের যৌথ পাহারা।

জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর অনেকের আত্মীয়স্বজন উভয় দেশে থেকে যায়। দুই দেশের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করায় অনেকেরই যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। পাসপোর্ট করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভারত বা বাংলাদেশে যাতায়াত করে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে। তাই এই বিশেষ দিনটিতেই এখন দুই বাংলার মানুষ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পায়।

এ সময় সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি এবং নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে মেলায় আগতদের মধ্যে সুপেয় খাবার পানি, খাবার স্যালাইন বিতরণসহ প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই কাঁটাতারের দুই পাশে হুমড়ি খেয়ে পড়ে দুই বাংলার লাখো শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, নারী-পুরুষ। দুই দেশের নাগরিক হলেও জাতিতে তারা এক। তারা বাঙালি।

ভারতের মাটিগাড়ায় থাকা ভাই নিজেন্দ্রনাথ (৬০) ও ভুষেন্দ্রনাথের (৩৫) সঙ্গে দেখা করতে আসা পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার বোয়ালমারীর রাজেন্দ্রনাথ (৫৫) বলেন, ‘প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে ওপার বাংলায় থাকা ভাইদের সঙ্গে দেখা করি, তাদের খোঁজ খবর নিই। জলপাইগুড়ির কালিবাড়ী পাণ্ডাপারায় থাকেন বাচ্চাবালা নামের অপর এক বোন। তার সঙ্গেও দেখা হয়েছে। ’

বোদা উপজেলার কাদেরপুর ময়দানদীঘি থেকে ৯০ বছরের প্রসন্ন কুমারও দেখা করতে এসেছিলেন ভারতের চোপড়া পথানার দাসপাড়ায় থাকা বোন সনেকার (৪০) সঙ্গে।

পঞ্চগড় শহরের আব্বাস আলী বলেন, ‘ভারতের বিভিন্ন এলাকায় আমার অনেক আত্মীয়-স্বজন আছে। মিলনমেলায় জলপাইগুড়ির ভেলাকোপায় থাকা মামা মোশাররফ হোসেন, শিলিগুড়ির ফুলবাড়ির ভায়রা মোজাফ্ফর হোসেন, জলপাইগুড়িতে থাকা সমন্ধি ময়নুল, শ্যালিকা লিলির সঙ্গে দেখা হয়েছে। কথাও হলো। পঞ্চগড়ের যেকোনো একটি সীমান্তে সরকার যদি সীমান্ত হাট স্থাপন করে তবে তাদের সঙ্গে দেখা হওয়া ও কথা বলার দূরত্বটা কমবে।’

নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল কাজী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘নীলফামারী ও পঞ্চগড় বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনে পঞ্চগড় সদর ও তেঁতুলিয়া উপজেলার অমরখানা, ভূতিপুকুরী, সুকানী ও মাগুড়মারী সীমান্তে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে এই মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক লাখ নাগরিক এই মিলনমেলায় সমবেত হয়। মিলনমেলায় প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে।’

পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল আল হাকিম মো. নওশাদ বলেন, ‘প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের ভূতিপুকুর সীমান্তে বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকদের মিলনমেলা হয়ে থাকে। দুই দেশের নাগরিকরা যাতে তাদের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পায় এজন্য আমরা বিএসএফ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে এই মিলনমেলার আয়োজন করে থাকি। এ বছর উভয় দেশের নাগরিকরা যেন নির্বিঘ্নে দেখা করতে পারে এজন্য বিজিবির পক্ষ থেকে মেডিকেল টিম, স্যালাইন ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। মিলনমেলাটি সুষ্ঠু সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে।’

বিজিবি সূত্রে জানা যায়, অমরখানা সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪৩-এর ৩ সাব পিলার থেকে মেইন পিলার ৭৪৪-এর ২ সাব পিলার, মাগুরমারী সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪২ এর ১১ সাব পিলার থেকে মেইন পিলার ৭৪২ এর ১২ সাব পিলার, সুকানি সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪১ এর ৬ সাব পিলার থেকে মেইন পিলার ৭৪১ এর ৭ সাব পিলার এবং ভুতিপুকুর সীমান্তের মেইন পিলার ৭৩৭ এর ২ সাব পিলার থেকে ৬ সাব পিলার এলাকা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই মিলনমেলা জমে উঠে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অমরখানা বিওপির বিপরীতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কুন্দন আর চাউলহাটি বিএসএফ ক্যাম্প, বিজিবির সুকানি বিওপি ক্যাম্পের বিপরীতে বিএসএফের মদনবাড়ি ক্যাম্প, বিজিবির ভুতিপুকুর বিজিবি ক্যাম্পের বিপরীতে বিএসএফের গাটরা ক্যাম্প, বিজিবির মাগুরমারী বিওপির বিপরীতে বিএসএফের চাউলহাটি ও ভোলাপাড়া বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা এই মিলনমেলার উভয় পাশে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। সূত্র : এনটিভি অনলাইন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত