প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রেলযাত্রায় নানা ভয়

ডেস্ক রিপোর্ট : কিছুক্ষণ আগে কমলাপুর ছেড়েছে চট্টগ্রামমুখী মেইল ট্রেনটি। কেবিনে একটি খোলা জানালার ধারে বসেছেন জহিরুল হক চৌধুরী। হঠাৎ কোত্থেকে ছুটে আসা পাথর পড়ল তার চোখে। সঙ্গে সঙ্গে মাথা ধরে বসে পড়লেন তিনি। ততক্ষণে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে তার কপাল থেকে। ভীষণ যন্ত্রণায় ছটফট করছেন তিনি। কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসাসেবাটুকু যে নেবেন, সে অবস্থাও নেই। গত ২ এপ্রিলের ঘটনা এটি। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী পৌরসভা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক জহিরুল হক এখন গুরুতর আহতাবস্থায় চিকিৎসাধীন।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। রেলযাত্রায় সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে। জিআরপি পূর্ব ও পশ্চিম জোন মিলিয়ে মোট ২৬টি এলাকা চিহ্নিত করেছে, যেখানে ট্রেনের যাত্রীদের উদ্দেশে জানালা দিয়ে পাথর ছুড়ে মারা হচ্ছে। যে রেলযাত্রাকে তুলনামূলক বিচারে নিরাপদ যাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেই যাত্রা এখন যারপরনাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। শুধু পাথর ছোড়ার জন্যই নয়, গামছা পার্টি, অজ্ঞান পার্টি, টানা পার্টি, পকেটমার ছাড়াও আম্মাজান, কৃষ্ণমালা, সুইসগিয়ারÑ এমন সব সংঘবদ্ধ চক্রের দৌরাত্ম্য হালে এতটাই বেড়েছে যে, এদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যরা। লাগাতার অভিযান চালিয়েও এদের রোধ করা যাচ্ছে না। বরং দিন দিন তাদের দুর্বৃত্তপনা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। দুর্বৃত্তরা ঝুঁকি এড়াতে অনেক সময় যাত্রীদের চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব লাশের নাম উঠে যাচ্ছে অপমৃত্যুর খাতায়। অনেক ক্ষেত্রে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেও লাশ ফেলে দেওয়া হচ্ছে রেললাইনে।
জানা গেছে, ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত প্রায় ১৪২ কিলোমিটার রেলপথেই শুধু গত ৮ বছরে (২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত) রেললাইনে কাটা পড়ে ২৩৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে রেলওয়ে পুলিশের হিসাবে। আর চলতি বছরের গত ৩ মাসে রেলপথে মারা গেছে ৮৬ জন। এসব ঘটনার ৯৫ শতাংশের ক্ষেত্রেই অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলপথে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা এই পরিসংখ্যানের অন্তত দ্বিগুণ হবে।
সব মিলিয়ে দেশের ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার রেলপথের সিংহভাগই এখন যাত্রীদের জন্য হয়ে পড়েছে অনিরাপদ। শুধু রাতের অন্ধকারেই নয়, ভয়ঙ্কর এসব চক্র দিনের বেলায়ও যাত্রীরা কিছু ঠাহর করার আগেই তাদের গলায় গামছা, মাফলার অথবা বেল্ট পেঁচিয়ে ডাকাতি-ছিনতাই করছে। কেউ বাধা দিলে তাদের নির্দয়ভাবে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে চলন্ত ট্রেন থেকে। বাড়তি অর্থের লোভে এসব অপকর্মের সঙ্গে জিআরপির কতিপয় সদস্যেরও যোগসাজশ আছে বলে জোর অভিযোগ রয়েছে। এদের কারণেই একের পর এক অঘটন ঘটিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা।
ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি মো. ইয়াসিন ফারুক আমাদের সময়কে বলেন, ট্রেনে ছিনতাই-রাহাজানি ঠেকাতে সব সময়ই তৎপর রয়েছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা। তিনি দাবি করেন, অপরাধীদের দৌরাত্ম্য আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। যদিও পরিসংখ্যান এর উল্টো তথ্যই দিচ্ছে।
ইয়াসিন ফারুক বলেন, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা ছাড়া বাইরে থেকে ট্রেনের ভিতর পাথর ছুড়ে মারা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রেললাইনের পাশে গড়ে ওঠা বস্তি থেকে খেলার ছলে কিংবা দুর্বৃত্তরাও পাথর নিক্ষেপ করে ট্রেন যাত্রীদের ওপর। এতে প্রায়ই যাত্রীদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। কখনো কখনো নিরাপত্তারক্ষীরা পর্যন্ত ট্রেনের জানালা এড়িয়ে চলেন।
একাধিক সূত্রের খবর, দুটো কারণে সচরাচর চলতি ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারা হয়Ñ এক. নিরাপত্তারক্ষীরা যেন রেলের দরজা ও জানালায় না আসেন। এতে করে তাদের নজরদারি না থাকায় অপরাধ সংগঠন অনেক সহজ হয় এবং দুই. শিশুরা নিছক খেলার ছলে অথবা বয়স্কদের ক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতার অভাব।
জিআরপি সূত্র জানায়, যখন-তখন ট্রেন থামানো যায় না; ট্রেনে পুলিশের নজরদারিও থাকে কম, যার ফলে বাস বা অন্যান্য পরিবহনের যাত্রীদের চেয়ে ট্রেনের যাত্রীদের টার্গেট করা সহজ বলে মনে করে দুর্বৃত্তরা।
আর ছিনতাই, লুট ও ডাকাতি প্রসঙ্গে পুলিশের ভাষ্য, টার্গেট যাত্রী যখন তার সিট ছেড়ে বাথরুমে যান বা খোলা দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ান তখনই সুযোগ বুঝে আক্রমণ করে দুর্বৃত্তরা। ছিনতাইয়ে বাধা পেলে ছুরিকাঘাত করে ট্রেন থেকে ফেলে দিতেও তারা দ্বিধা করে না। ট্রেনের ছাদে চড়েন যারা, তাদের টাকা-পয়সা কেড়ে নেওয়া আরও সহজ। লুটের পর প্রয়োজনে যাত্রীকে ছাদ থেকে অনায়াসে ফেলে দেওয়া যায়। কখনো কখনো সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা একটি বগির দুদিকেরই দরজা বন্ধ করে দিয়ে ডাকাতি করে। সূত্র : আমদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত