প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এত আনন্দ কখনও দেখেনি কেউ

ডেস্ক রিপোর্ট : সমৃদ্ধির পথে উত্তরণে নবআনন্দে জেগে ওঠার উচ্ছ্বাস আর বিনম্র শ্রদ্ধায় উদযাপিত হয়েছে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। গতকাল সোমবার জাতির সূর্যসন্তান একাত্তরের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে কৃতজ্ঞ জাতি। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদি ভরে উঠেছে ফুলে ফুলে। বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের স্বীকৃতি উদযাপনের রেশ ছিল মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন আয়োজনেও। আর পিছিয়ে থাকবে না বাঙালি জাতি, এগিয়ে যাবে অনেক দূর। এই প্রত্যয় নিয়ে এবারের স্বাধীনতা দিবস ছিল লাখো প্রাণের জয়গানে উৎসবমুখর। পাড়া-মহল্লায়, গ্রাম থেকে গ্রামে, দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে লেগেছিল লাল-সবুজের উৎসব। যেন এত আনন্দ কখনও দেখেনি কেউ।

গতকাল ভোরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জাতীয় স্মৃতিসৌধে জাতির সূর্যসন্তান বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে ঢল নামে সর্বস্তরের মানুষের। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ থেকে ফিরে ধানমণ্ডি বত্রিশ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোর সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছে কোটি কণ্ঠ। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’- প্রাণের এই সুরে এককণ্ঠ হয়েছে সারাদেশ।

এর আগে ভোরে মিরপুর সেনানিবাসে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ সুসজ্জিত করা হয় জাতীয় পতাকায়। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে উত্তোলন করা হয় জাতীয় পতাকা। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনেও স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভা ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, সড়কে অলঙ্করণ, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে উৎসবমুখর পরিবেশে।

দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতারসহ বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশনগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার এবং সংবাদপত্রগুলো বিশেষ সংখ্যা ও নিবন্ধ প্রকাশ করে।

বিকেলে বঙ্গভবনে বিশেষ সংবর্ধনার আয়োজন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এতে অংশ নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসকসহ আমন্ত্রিত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর মিলন মেলায় পরিণত হয় এই সংবর্ধনার আয়োজন।

এ ছাড়া গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রী প্রতিবছরের মতো এবারও স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে মোহাম্মদপুরে শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের জন্য ফুল, ফল ও মিষ্টি পাঠিয়েছেন। বিকেলে গণভবনে একটি স্মারক ডাকটিকিট, একটি উদ্বোধনী খাম ও একটি ডাটা কার্ড অবমুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সন্ধ্যা ৭টায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অফিসার্স ক্লাব ঢাকা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সভায় আরও বক্তব্য দেন ক্লাবের সভাপতি মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহীম হোসেন খান। অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, সরকারের সচিবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

জাতীয় স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল : ভোর ৬টা ১ মিনিটে প্রথমে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা জানানোর সময় উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধানরা, ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিকরা এবং সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে জাতির বীর সন্তানদের প্রতি আরও একবার শ্রদ্ধা জানান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলের উপদেষ্টা পরিষদ ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, স্বাধীনতার শত্রুরা এখনও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের বিরুদ্ধে কালো ছায়া বিস্তার করে আছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের বিষবৃক্ষের মূলোৎপাটন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ অগ্রগতির পথে কতদূর এগিয়ে গেছে, তার প্রমাণ জাতিসংঘ কর্তৃক উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রথম ধাপে উত্তরণের স্বীকৃতি।

সকাল ১০টার দিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বিএনপির নেতাকর্মীরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম খান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমানসহ দলের কেন্দ্রীয় ও সাভারের স্থানীয় নেতারা।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, বীর শহীদরা জীবন দিয়েছিলেন; কিন্তু আজ সেই গণতন্ত্র অবরুদ্ধ। তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এখন কারারুদ্ধ। কারও কথা বলার স্বাধীনতা নেই, রাজনীতি করার অধিকার নেই। দেশে গণতন্ত্র বলে কিছুই নেই। বিএনপি গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ এখন সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। বর্তমানের অগ্রগতির ধারা অক্ষুণ্ণ রাখার শপথ নিয়ে দেশ সমৃদ্ধির পথে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

শ্রদ্ধা নিবেদন করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, দেশে পাকিস্তানপ্রেমী শক্তি প্রক্সি খেলায় মেতে উঠেছে। এ কারণে বলছি, বাংলাদেশ এখনও শঙ্কামুক্ত হয়নি। তিনি বলেন, বিএনপি জাতির পিতা মানে না, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা মানে না, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসেও তাদের কোনো কর্মসূচি ছিল না। বিএনপি রাজাকার লালন করে এবং পাকিস্তানিদের ভাবধারায় দেশকে নিতে চায়। এ জন্যই আগামী নির্বাচনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সঠিক সময়ে নির্বাচন করা এবং পাকিস্তানপ্রেমী বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখা।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলমের নেতৃত্বে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সত্যিকারের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ত্রিশ লাখ শহীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এটাই আজকের দিনের শপথ।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠনসহ নানা শ্রেণি-পেশার বিভিন্ন বয়সী মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে। তারা বলেন, বাংলাদেশকে আর পিছিয়ে রাখা যাবে না। স্বাধীনতাবিরোধীদের মূলোৎপাটন এবং দেশকে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।

বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে ছিল গণফোরাম, জাকের পার্টি, ন্যাপ, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, গণবিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, শেরেবাংলা বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বীরশ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম সংগ্রামী ঐক্য পরিষদ, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, ইকবাল সিদ্দিকী এডুকেশন সোসাইটি, অবসরপ্রাপ্ত বিসিএস শিক্ষক অ্যাসোসিয়েশনসহ আরও অনেক সংগঠন। সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত