প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি
ইসলামি দলগুলোতে নতুন হিসাব-নিকাশ

ডেস্ক রিপোর্ট: এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি যা, তাতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশা দেখছে না ইসলাম ধর্মভিত্তিক দলগুলো। তবু দলগুলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। এরই মধ্যে দলগুলোতে নতুন হিসাবনিকাশও শুরু হয়েছে।

অতীতে ইসলামি দলগুলোর বড় একটি অংশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে সক্রিয় থাকত। এর ফল পেত বিএনপি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ইসলামী ঐক্যজোট বিএনপিকে ছেড়ে গেছে। আর নারী নেতৃত্ব এড়িয়ে চলা চরমোনাইয়ের পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এবার ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ইসলামি দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, এখন দলগুলোর মধ্যে বিভক্তিও বেড়েছে। কিছু দলের ওপর সরকারের চাপ ও নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার খড়্গ ঝুলছে। পাশাপাশি গত কয়েক বছরে সরকার হেফাজতে ইসলামসহ কওমি আলেমদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে নানা পারিপার্শ্বিকতায় পরিস্থিতি পাল্টেছে। এ অবস্থায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান বদল হতে পারে।

দেশে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ। এখন এই তিনটি দলের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান ও নতুন পরিস্থিতি বিএনপির জন্য প্রতিকূল হতে পারে।

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এখন মানুষের মূল দৃষ্টি দেশের গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আইনের শাসন এবং জীবনের নিরাপত্তার দিকে। সবাই চাইছে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে। এখানে সরকারের বিপক্ষে বিএনপি হচ্ছে মূল শক্তি। নির্বাচনে সময় জনগণ নিশ্চয়ই এটা মনে রেখেই সিদ্ধান্ত নেবে।

অনেকের দৃষ্টি হেফাজতের দিকে
২০১৩ সালের ৫ মে উত্থান ঘটা হেফাজতে ইসলামকেও নির্বাচনী শক্তি হিসেবে দেখছেন অনেকে। ওই রাতে যৌথ অভিযানের মুখে রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে বিতাড়িত কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এই সংগঠনটির অবস্থান আগামী নির্বাচনে কী হয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল আছে।
হেফাজতে ইসলামের নেতারা বরাবরই বলে আসছেন, তাঁরা অরাজনৈতিক সংগঠন, নির্বাচনে যাবেন না। তবে হেফাজতকে শাপলা চত্বর থেকে তাড়ানোর দুই মাসের মাথায় চার সিটি এবং এরপর একটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়। সবগুলোতে হেফাজতের স্থানীয় নেতারা বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন। সবগুলোতে বিএনপি জিতেছে। ওই ফলাফলের পেছনে হেফাজতের সমর্থনও একটা ভূমিকা রেখেছে বলে তখন আলোচনা ছিল।

অবশ্য পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি পাল্টেছে। হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফী, তাঁর ছেলে আনাস মাদানিসহ সংগঠনের একটি অংশের সঙ্গে সরকারের সখ্য গড়ে উঠেছে। তবে সংগঠনের আরেকটি অংশ তা পছন্দ করছে না। তারা চুপচাপ রয়েছে। অনুকূল পরিবেশ পেলে তারা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, এমন আলোচনা আছে।

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, হেফাজতে ইসলাম নির্বাচন করবে না, কাউকে মনোনয়ন দেবে না এবং কাউকে সমর্থনও করবে না। তবে তিনি এ-ও বলেন, ‘ভোট প্রত্যেকের নাগরিক অধিকার। আমাদের নেতৃবৃন্দ, কর্মী-সমর্থকেরা যারা ইসলামের পক্ষে, নাস্তিকদের বিরুদ্ধে-তারা নিজেদের বুদ্ধি, বিবেক সামনে রেখে ভোট প্রয়োগ করবে। আমরা কাউকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেব না।’

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, হেফাজতের একটি অংশ যে সরকারের প্রতি বৈরী, তা সরকারও জানে। কিন্তু সরকারের কৌশল হচ্ছে, নির্বাচনে হেফাজতকে বিএনপি থেকে দূরে রাখা এবং নির্বাচনী মাঠে তাদের নিষ্ক্রিয় রাখা। এটা করা গেলেই সফল ভাববেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।

অবশ্য আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্ল্যাহ বলেন, ‘ওরা বিএনপির সঙ্গে ছিল, বিএনপির সঙ্গেই থাকবে। আমাদের নেতাদের সঙ্গে ওদের যে কথাবার্তা, সখ্য-এগুলো হচ্ছে কৌশল চামড়া বাঁচানোর জন্য।’

৭০ আসনে প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত
জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন না থাকলেও তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে অনেক আগেই কেন্দ্র থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছে। দলের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, তারা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকেই নির্বাচন করতে চায়। তবে এবার দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ না থাকায় তারা স্বতন্ত্রভাবে অংশ নেবে।

দলীয় সূত্র জানায়, জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা ৭০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করেছেন। নির্বাচনবিষয়ক সাংগঠনিক বৈঠক থেকেই ১২ মার্চ জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মুজিবুর রহমানসহ রাজশাহী অঞ্চলের ১০ জন নেতাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

নিবন্ধিত ১০টি দল
নির্বাচন কমিশনে এখন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪০ টি। এর মধ্যে ইসলামি বা ইসলামপন্থী দল ১০ টি। দলগুলো হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট (নেজামী), বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন (নজিবুল বশর), খেলাফত মজলিস (ইসহাক), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (হাবিবুর রহমান), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (আতাউর রহমান), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মান্নান), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (বাহাদুর শাহ), জাকের পার্টি (মোস্তফা আমীর) ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (মোমেন)।

এর মধ্যে তরীকত ফেডারেশন ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ সরাসরি আওয়ামী লীগ এবং খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সরাসরি বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইসলামী ঐক্যজোট (নেজামী), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস একসময় বিএনপির জোটে ছিল। বর্তমানে তারা স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে এ দল দুটির শীর্ষ নেতাদের অনেক বক্তব্য-বিবৃতি বিএনপির বিপক্ষে গেছে। একইভাবে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও জাকের পার্টির অবস্থান সরকারের জন্য সহায়ক বলে মনে করা হয়। অবশ্য বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মান্নান) সম্প্রতি এরশাদের নেতৃত্বাধীন অংশে ‘সম্মিলিত জাতীয় জোটে’ অংশ নিয়েছে।

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, প্রতিটি দল নিজস্ব প্রয়োজন এবং মানুষের স্বার্থে যা করার দরকার, তাই করেছে। এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। মনে হচ্ছে ইসলামি দলগুলোতে এবার নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা আছে।

দুজন সাংসদ নিয়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে আছে তরীকত ফেডারেশন। কথা বলে জানা গেছে, এবার দলটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের কাছে ১০টি আসন চাইবে।

এ বিষয়ে তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিব এম এ আউয়াল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে যেভাবে এগিয়ে নিচ্ছেন, আজকের এ পর্যায়ে এসে ডান-বাম, ইসলামি দল-সবার কাছেই ক্ষমতায় রাজনীতির উপলব্ধি এসেছে। আমরা মনে করি, আগামী নির্বাচনে সব দলেই এর প্রভাব পড়বে।’
নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন-এই দল তিনটি সম্প্রতি ভেঙে ছয়টি হয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোটের মূল অংশটি বিএনপির জোট ছেড়ে গেলেও আবদুর রকিবের নেতৃত্বে খণ্ডিত একটি অংশ ২০ দলে থেকে গেছে। আর ভেঙে যাওয়া জমিয়তের দুটি অংশই এখনো ২০ দলে আছে। এ ছাড়া জাফরুল্লাহ খানের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলনের ভগ্নাংশটি এখনো পরিষ্কার অবস্থান নেয়নি।

অবশ্য আগামী নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর অবস্থান পাল্টানোর সম্ভাবনা সম্পর্কে ভিন্ন মত জানান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি আবদুর রব ইউসুফী। তিনি বলেন, ‘সরকার যাদের কিছুটা সঙ্গে নিতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে, তারা পরিস্থিতির শিকার। চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকবে বলে আমার মনে হয় না।’

এর মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোটের নেজামী অংশ একা প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিএনপির শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (মোমেন) গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সিলেটে এক সাংগঠনিক সভায় ১৯ আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। আর চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন ইতিমধ্যে স্থানীয় ওয়াজ-মাহফিলে শতাধিক আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পরিবেশ ভালো দেখছি না। নির্বাচনের এক-দুই মাস আগে যে পরিবেশ ভালো হয়ে যাবে, তারও আশা দেখছি না। মানুষ ভোট দিতে পারবে কি না, সবার অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কি না-বিষয়গুলো নিয়ে মানুষ আশঙ্কায় আছে। এসবের মধ্যেই আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানায়, সম্প্রতি আরও পাঁচটি ধর্মভিত্তিক ইসলামি দল নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছে। জানা গেছে, নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সব কটি দলই এবার নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকবে। নির্বাচনের সময়ে পরিস্থিতি কেমন থাকে, সেটার ওপর নির্ভর করছে ইসলামি দলগুলোর অবস্থান কী হবে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচন নিয়ে ইসলামি দলগুলোর অবস্থান এখনো চূড়ান্ত নয়। এমনও হতে পারে, তারা স্বতন্ত্র জোট করতে পারে। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে মোড়টা কোনদিকে নেবে, তখন বলা যাবে।

সূত্র: প্রথম আলো

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত