প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাদাদের কালো স্মৃতি মুছতে মিচ ল্যান্ড্রুর লড়াই

আসিফুজ্জামান পৃথিল: যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্য লুইজিয়ানার প্রধান শহর নিউ অরলিয়েন্স। এই বন্দর নগরীর মেয়রের দ্বায়িত্ব পালন করছেন মিচ ল্যান্ড্রু। ডেমোক্রেট দলীয় এই মেয়র একাই ইতিহাসের দায়শোধের লড়াইয়ে নেমেছেন। দাস রাখা আর না রাখার প্রশ্নে শুরু হওয়া মার্কিন গৃহযুদ্ধের দক্ষিণের কুখ্যাত সেনাপতি জেনারেল রবার্ট ই লি সহ চার বর্ণবাদী কনফেডারেট নেতার ভাষ্কর্য নিউ অরলিন্স থেকে তিনি সরিয়ে ফেলেছেন একক প্রচেষ্টায়! তবে তাকে এজন্য রীতিমত স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে হয়েছে। এই সমস্থ ঘটনা নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘ইন দ্য শ্যাডো অফ স্ট্যাচু: অ্যা হোয়াইট সাউদার্নার কনফ্রন্টস হিস্টোরি’ নামে একটি বই। সম্প্রতি তিনি এসেছিলেন বিখ্যাত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ক্রিস্টিয়ান আমানপোরের টেলিভিশন অনুষ্ঠানে। সেখানে কথা বলেছেন ইতিহাসের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা, মার্কিন গৃহযুদ্ধে কনফেডারেটদের অমানবিক আচরণ এবং আধুনিক মার্কিন সমাজে বর্ণবাদের ভয়াল থাবা নিয়ে।

২০১৭ সালের ১৯ মে জেনারেল ‘লি’এর ভাষ্কর্য অপসারণের আগে জনমত সংগ্রহের জন্য মেয়র মিচ ল্যান্ড্রু একটি ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমাকে আমার এক বন্ধু একটি কথা বলেছিল। ভাবুন একবার, আফ্রিকান-আমেরিকান ৫ম শ্রেনীর এক ছাত্রী জানতে পারলো আমাদের শহরে যাদের ভাষ্কর্য স্বগর্বে দাঁড়িয়ে আছে তারা তাঁর পূর্বপুরুষের সাথে কি করেছে! আপনি কি ভাবতে পারছেন তাঁর শিশুর মনে কি প্রভাব পড়বে! আপনার কি মনে হয় এই ইতিহাস শুনে সে উদ্বেলিত হবে? তাঁর বিপুল সম্ভবনাময় ভবিষ্যত থাকলেও সে কি ভাববে না তাঁর সম্ভাবনা খুব সীমিত? একই সাথে আমাদের সম্ভাবনাও কি ক্ষতিগ্রস্থ হবেনা’!

আমানপোরের টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ল্যান্ড্রু জানান, খুব শীঘ্রই তাঁর শহরটি প্রতিষ্ঠার ৩০০ বছরপূর্তি উদযাপন করতে যাচ্ছে। তিনি এই উপলক্ষে শহরকে নতুনভাবে গড়তে চান। সেই সাথে মুছে ফেলতে চান ইতিহাসের কালিমা। সেজন্যই জেনারেল লি সহ চার কনফেডারেট নেতার ভাষ্কর্য সরানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘২০০৫ সালে হ্যারিকেন ক্যাটরিনা নিউ অরলিন্স সহ পুরো লুইজিয়ানাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। আমাদের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী আশেপাশের রাজ্যগুলোতে আশ্রয় নেয়। ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমরা শহরটিকে নতুন করে গড়তে চাই! আমরা চাই শহরের পুরাতন সদস্যরা যখন বাড়ি ফিরবেন তাঁরা এক নতুন নিউ অরলিন্সকে দেখবেন। এক কলুসমুক্ত নিউ অরলিন্সকে দেখবেন। লুইস আর্মস্ট্রং এর মতো শিল্পী বর্ণবাদের থাবায় এই শহর ছেড়ে চলে গেছেন। আমরা সেই বিভৎস দিন ভ‚লে যেতে চাই’।

বর্ণবাদের থাবা থেকে নিউ অরলিন্সকে মুক্তি দেয়াটা সহজ ছিলোনা। এই ভাষ্কর্য সরাতে তাকে নানান বিপদে পড়তে হয়েছে। মেয়র হিসেবে ভাষ্কর্য সরানোর আদেশে স্বাক্ষরের পরেও ভাষ্কর্য সরাতে পারেননি মিচ ল্যান্ড্রু। ইতিহাসকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা অনেক মার্কিনি এই আদেশের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তবে আদালত নিরঙ্কুশ রায় দিয়েছেন বর্ণবাদের বিপক্ষে। তবুও খুব সহজে কনফেডারেটদের ভাষ্কর্য সরাতে পারেননি ল্যান্ড্রু। লুজিয়ানায় শতশত ক্রেন থাকলেও ভাষ্কর্য সরাতে সামান্য একটা ক্রেন তাকে কেউ দিচ্ছিল না। অবশেষে একজন ক্রেন দিতে রাজী হয়। সেই ক্রেন মালিকের গাড়িতে আগুনে বোমা ছুড়ে তাকে হত্যার চেষ্টাও করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত প্রজন্মকে ভুল ইতিহাস শেখাতে চাননা ল্যান্ড্রু। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ছোট বেলায় মায়ের মুখের গল্প শুনে আমি প্রথম কনফেডারেটদের সত্য ইতিহাস জানতে পারি। আমি জানতে পারি স্কুলে আমাকে যে ইতিহাস শেখানো হয়েছে তা ভুল। আমি জানতে পারি কনফেডারেটরা আমাদের দাসত্বের নাগপাশ থেকে মুক্ত দেখতে চায়নি! আমি জানতে পারি কনফেডারেট নীতি যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অসংখ্য মানুষ চরমতম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কেবল তারা কালো বলে পুরুষদের হত্যা করা হয়েছে, নারী ও শিশুদের ধর্ষণ করা হয়েছে। জার্মানি হলোকাষ্টের প্রয়শ্চিত্ত করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবাদ মুক্ত হয়েছে। আর আমাদের যুক্তরাষ্ট্র ঘৃণ্য ব্যক্তিদের বীর বানিয়েছে’!

নিজের লেখা বই ‘ইন দ্য শ্যাডো অফ স্ট্যাচু: অ্যা হোয়াইট সাউদার্নার কনফ্রন্টস হিস্টোরি’ কে এই প্রায়শ্চিত্তের অনুসঙ্গ বলেছের ল্যান্ড্রু। বর্ণবাদ বিরোধী যুদ্ধের এই সাহসী যোদ্ধার বইটি প্রকাশ পেয়েছে এই বছরের ২০ মার্চ। সিএনএন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত