প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ব্যাংকের এমডিদের বেতনের লাগাম চায় সরকার

ডেস্ক রিপোর্ট : ব্যাংকগুলোর এমডিদের বেতনভাতার লাগাম টানতে চায় সরকার। বর্তমানে বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকের এমডিদের আকাশচুম্বী বেতনভাতার কারণে সরকারি-বেসরকারি সব খাতেই ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে জোরালো দাবি উঠেছে। ব্যাংকগুলোর বর্তমান আর্থিক দুরবস্থা ঠেকাতে শীর্ষ নির্বাহী থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে খরচ কমানোর কথাও উঠেছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসাবে এটিও ভাবা হচ্ছে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের এক সভায় ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সভায় আওয়ামী লীগের নেতারা ব্যাংকের এমডিদের মাত্রাতিরিক্ত বেতনভাতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বাজেটবিষয়ক আলোচনায়ও ব্যাংকের এমডিদের উচ্চ বেতনভাতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তাদের ওইসব বক্তেব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, এই বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ারভুক্ত। বিষয়টি নিয়ে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় গভর্নরসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ওই বিষয়ে আলোচনা করার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকের এমডিদের বেতনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ওপরের দুয়েকটি পদে ব্যাপক হারে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন। বিলাসী সুবিধা ভোগ করছেন শীর্ষ পদস্থরা। এতে ব্যাংকের খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, সুদহার কমানোর জন্য ৩টি পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিচালনা ব্যয় কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেতনভাতা বাবদ অধিক খরচ, শাখা স্থাপন সাজসজ্জা ও অধিক পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে। মালিকদের অধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য বন্ধ করতে হবে। অন্যের টাকায় এত বেশি মুনাফা কেন করতে হবে? জনগণের টাকায় ব্যাংক চলে। জনগণের দিকে নজর দিতে হবে। মুনাফা লক্ষ্য কমে গেলে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) কমানো যাবে। স্প্রেড কমানো গেলেই সুদ যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে আসবে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে বিশেষ করে এমডি বা শীর্ষ নির্বাহীদের বেতনভাতার পরিমাণ অনেক বেশি। বিশেষ করে সরকারি বা বেসরকারি যে কোনো খাতের চেয়ে ব্যাংকের এমডিদের বেতন বেশি। এর বাইরেও রয়েছে প্রফিট বোনাস। কোনো কোনো ব্যাংক ৮-১০টি করে প্রফিট বোনাস দিচ্ছে। এ বোনাস বাবদই কোনো কোনো কর্মকর্তা ৬-৭ লাখ টাকা বা আরও বেশি পাচ্ছেন। এ ছাড়া গাড়ি কেনা, বাড়ি কেনাসহ নানা খাতে ২ থেকে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছেন। কোনো কোনো ব্যাংকের এমডির বেতন ১৮ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় ইসলামী ব্যাংকছাড়া সব ব্যাংকের এমডিদের বেতনই ৮ লাখ টাকার ওপরে। এর বাইরে রয়েছে অন্য সুযোগ সুবিধা।
ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ২০১৬ সালে বেতনভাতা ছিল ২ কোটি ৪ লাখ ১৩ হাজার ১৯৪ টাকা। দ্য সিটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর বেতনভাতা বাবদ বছরে ব্যাংক থেকে পেয়েছেন ১ কোটি ৭৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি প্রতি মাসে গড়ে ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন। প্রধান নির্বাহীর বেতনভাতা বাবদ তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের। এর প্রধান নির্বাহী আনিস এ খান ২০১৬ সালে পেয়েছেন ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এ হিসাবে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক প্রতি মাসে তাকে পরিশোধ করেছে গড়ে ১৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা।
ব্যাংক এশিয়ার প্রধান নির্বাহী বছরে বেতনভাতা হিসেবে পেয়েছেন ১ কোটি ৫৬ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিমাসে গড়ে ১৩ লাখ ৭ হাজার টাকা আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন। এক্সিম ব্যাংক প্রধান নির্বাহীর বেতনভাতা বাবদ ব্যয় করেছে ১ কোটি ৫১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। প্রতি মাসে গড়ে ১২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ব্যাংকিং খাতে এমডিদের বেতনই সবচেয়ে বেশি। ডিএমডি বা অতিরিক্ত এমডি, সহকারী এমডির বেতনভাতা তুলনামূলকভাবে এমডিদের চেয়ে অনেক কম। ডিএমডি পর্যায়ে বেতনভাতা ২ থেকে ৩ লাখ টাকা। এর বাইরে আছে অন্য আর্থিক সুবিধা।
আর সরকারি ব্যাংকের এমডি ছাড়া অন্য সবাই সরকারি স্কেলে বেতনভাতা পান। শুধু এমডিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। যে কারণে তাদের বেতন ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা। কিন্তু ডিএমডি, জিএমরা সরকারি স্কেলে বেতন পান। তাদের বেতন সর্বোচ্চ ৭০ হাজার টাকা। সিনিয়র সচিবরা পান ৮২ হাজার, সচিব পর্যায়ে বেতন ৭৮ হাজার টাকা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর মাসিক বেতন সব মিলিয়ে দুই লাখ টাকা।
সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতনভাতার সঙ্গে অন্য সরকারি কর্মচারীদের বেতনভাতার একটি তুলনামূলক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল। এতে দেখা যায়, ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে বেতনভাতা ও অন্য সুবিধা পান তার আর্থিক মূল্য সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি।
উল্লেখ্য, এর আগে গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এমডিদের বেতনভাতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে এমডিদের সঙ্গে কয়েকটি বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক আলোচনাও করে। কিন্তু এমডিদের তীব্র আপত্তির মুখে সেটি আর বেশি দূর এগোয়নি।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে মন্দার মধ্যেও ব্যাংকারদের বেতনভাতা ও বোনাস নেওয়া কমেনি। উল্টো বেড়েছে। এদিকে সম্প্রতি ব্যাংকিং খাতে আমানতের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ঋণের সুদের হারও বেড়েছে। যে কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যাংকের আয়ের প্রধান খাত হচ্ছে সুদ। এই খাতে আয় কমে গেছে। ফলে গ্রাহকদের ওপর সার্ভিস চার্জ আরোপ করে এবং আমানতের সুদ কমিয়ে তারা আয়ে সমন্বয় করছে। এখন আমানতের সুদের হার বাড়ানোর কারণে ঋণের সুদ বাড়িয়েছে। যা ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বেসরকারি ব্যাংকের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, বেসরকারি ব্যাংকের প্রসারে এমডিদের ভূমিকা অনেক বেশি। তারা যে কর্মকা- পরিচালনা করেন সেই হিসেবে বেতন বেশি পান না। বিদেশেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর এমডিদের বেতন অনেক বেশি। এ ছাড়া সরকারি ব্যাংকের এমডিরা চাকরি শেষে যে পরিমাণ পেনশন পান বেসরকারি ব্যাংকের এমডিরা তা পান না। বেতনের বিষয়ে মালিক হিসেবে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। সুত্র : আমাদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত