প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফাইনাল আমাদের আরো কিছু গ্লানির মুখোমুখি করেছে

প্রভাষ আমিন : ক্রিকেটিয় প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বাইরে এই ফাইনাল আমাদের আরো কিছু গ্লানির মুখোমুখি করেছে। বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশেরই কিছু উগ্র সাম্প্রদায়িক ব্যক্তির দেখা মিলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ভারতের জয়ে বাংলাদেশের কয়েকজন ব্যক্তির উল্লাস আমাদের লজ্জিত করেছে। আবার বাংলাদেশের কয়েকজন উগ্র সাম্প্রদায়িক মানুষ সৌম্য সরকারের হাতে শেষ ওভারের বল তুলে দেয়া এবং ভারতের জয়কে ক্রিকেটিয় বিবেচনার বাইরে সমালোচনা করছেন।
তারা সৌম্য সরকারের ধর্মীয় পরিচয় তুলে তার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। সাম্প্রদায়িক এই মানুষগুলো ঘৃণারও অযোগ্য। সৌম্য আমার খুব প্রিয় ব্যাটসম্যান।

২০১৫ বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশ যে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলছিল, তার অগ্রসেনানীদের একজন এই সৌম্য। কিন্তু অনেকদিন ধরেই নিজেকে খুঁজে ফিরছেন সৌম্য। নিদাহাস ট্রফিটা কেটেছে দুঃস্বপ্নের মতো। তার শেষ সুযোগ ছিল ফাইনালের শেষ ওভার, আরো নির্দিষ্ট করে বললে শেষ বল।

সৌম্য নিয়মিত বোলার নন। তবু সীমাহীন চাপের মুখে শেষ ওভারটা সামলেছেন ভালোভাবেই। শেষ বলটা তিনি কেন স্লোয়ার দিলেন না, কেন ইয়র্কার দিলেন না; এমন অনেক বিশেষজ্ঞ ঘুরে বেড়াচ্ছেন ফেসবুকে। আরে ভাই আপনি টেলিভিশন সেটের সামনে বসে কী রকম চাপ অনুভব করেন, সেটার সঙ্গে একটু মিলিয়ে দেখুন মাঠের অন্তহীন চাপকে।
মানছি তারা পেশাদার খেলোয়াড়। তবুও তারা তো মানুষই, রোবট তো নয়। ম্যাচ হেরে যাওয়ার পর সৌম্যের কান্নায় ভেঙ্গে পড়া ছুয়ে গেছে আমার হৃদয়। সৌম্যকে যারা ধর্ম দিয়ে বিবেচনা করে, তারা আমার করুণারও অযোগ্য।

২০০৭ সালে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া ভারতকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় করে দিয়েছিল বাংলাদেশ। তারপর বাংলাদেশের সামনে পড়লেই ভয়ে হাঁটু কাঁপা শুরু হয় ভারতীয়দের। ভয় তাড়াতে তারা নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে, হেয় করে বাংলাদেশকে। ২০১৫ বিশ্বকাপের সময় তাদের বানানো ‘মওকা, মওকা’ বিজ্ঞাপন সে আগুনে ঘি ঢেলেছে।
শুধু সামাজিক মাধ্যম নয়, গণমাধ্যমও ওঠে পড়ে লাগে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। কিন্তু ভারতে বসে ভারতীয়দের এই লাফঝাঁপ এক কথা। আর বাংলাদেশের ভারতীয় হাইকমিশনে বসে তাদের এক কর্মকর্তার দিনের পর দিন বাংলাদেশ বিদ্বেষ ছড়ানো ভিন্ন কথা। রঞ্জন মন্ডল নামের এই কর্মকর্তা ডিপ্লোম্যাটিক দায়িত্ব পালনের চেয়ারে বসে সব ধরনের সভ্যতা ভব্যতার সীমা অতিক্রম করে দিনের পর দিন বাংলাদেশকে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ-ভারতের খেলা থাকলেই তিনি ফেসবুকে একের পর এক স্ট্যাটাস দেন, যার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান। পরদিন সকালেই আবার সেই স্ট্যাটাস ডিলিট করে দেন। ভারতের নিশ্চয়ই রঞ্জন মন্ডলের মতো আরো অনেক বাংলাদেশবিদ্বেষী মানুষ আছে। কিন্তু সাধারণত নির্দিষ্ট দেশের প্রতি সহানুভূতি আছে, এমন ব্যক্তিকেই সেই দেশে পোস্টিং দেয়া হয়। তাহলে নয়াদিল্লী কোন বিবেচনায় রঞ্জন মন্ডলের মতো একজন কট্টর বাংলাদেশবিদ্বেষী মানুষকে বাংলাদেশে পাঠালো আমার মাথায় ঢোকে না।

ভারতে যেমন অনেক বাংলাদেশবিদ্বেষী মানুষ আছে, বাংলাদেশেও তেমনি অনেক ভারতবিদ্বেষী মানুষ আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের বিদ্বেষ, আর হাইকমিশনে বসে ডিপ্লোম্যাসির আড়ালে ঘৃণা ছড়ানো আরেক কথা। আর রঞ্জন মন্ডলের বিদ্বেষটা মানসিক অসুস্থতার পর্যায়ের। ২০১৬ সালে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে বাংলাদেশের প্রায় সবাই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সমর্থন করায় রঞ্জন মন্ডল ফেসবুকে স্ট্যটাস দিয়েছিলেন, ‘বাংলাদেশের অনেকের মুশোখ উন্মোচিত হলো আজ। ভিসা নিতে এসে তারা গদগদ থাকেন। আর এখন সবাই ভারতবিরোধিতা করছেন।’ তার সেই স্ট্যাটাস দেখে অবিশ্বাসে আমি তাকে বলেছিলাম, কূটনীতির আসনে বসে এ ধরনের কথা না বলতে। তিনি ক্ষেপে গেলেন। আমাকে যাচ্ছে তাই গালিগালাজ করলেন। আরো বললেন, বাংলাদেশের মানুষ কেন ভারতে যায়। তারা বাংলাদেশের মানুষকে করুণা করে ভিসা দেন।

ভিসার জন্য বাংলাদেশিরা তার পায়ে ধরে পড়ে থাকে। ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি ক্রমাগত বাংলাদেশী সমর্থকদের পাগল, ছাগল, মূর্খ, অশিক্ষিত বলে গালি দিচ্ছিলেন। যথারীতি পরদিন সকালে তিনি তার সেই বিদ্বেষমূলক স্ট্যাটাস ডিলিট করে দেন এবং আমাকেও ব্লক করে দেন। তাই তার সেই ঘৃণা ছড়ানোর কোনো প্রমাণ ছিল না।
আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ্যে এমন বিদ্বেষ ছড়ালেও বাংলাদেশের সাংবাদিকদের কারো কারো আনুকূল্য পেয়ে যাচ্ছেন। সহজে ভিসা পাওয়া, হাইকমিশনের পার্টিতে নিমন্ত্রণ বা ভারত সফরের সুযোগের লোভে আমাদের সাংবাদিকদের কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ এই ব্যক্তিটিকে তোয়াজ করেন। কিন্তু সময় এসেছে, তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানানোর।

রঞ্জন মন্ডল আবার তার কুৎসিৎ চেহারা দেখালেন নিদাহাস ট্রফির ফাইনালের রাতে। একের পর এক বিদ্বেষমূলক স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তার এক স্ট্যাটাসের মন্তব্যের ঘরে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কোনালের সাথে আলাপচারিতায় তিনি বাংলাদেশকে সম্পর্কে এমন শব্দ উচ্চারণ করেছেন, যা ছাপার অযোগ্য। রঞ্জন মন্ডল আবারও তার সভ্যতা-ভব্যতা, কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সমস্ত সীমা অনেক আগেই লঙ্ঘন করেছেন। আবারও তার প্রমাণ রাখলেন মাত্র। আমার শঙ্কা রঞ্জন মন্ডলের উপস্থিতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও প্রভাব ফেলবে।

একজন ভারতীয় ভারতকে সমর্থন করবেন, একজন বাংলাদেশী বাংলাদেশকে সমর্থন করবেন; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিজ দেশকে সমর্থন করা আর আরেক দেশ সম্পর্কে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো আরেক কথা। বাংলাদেশকে কেউ ‘কাংলাদেশ’ লিখলে যেমন আমার গভীর বেদনা হয়; ইন্ডিয়াকে ‘রেন্ডিয়া’ লিখলে নিশ্চয়ই ভারতীয়দেরও খারাপ লাগে। আমি নিজে কখনো ‘রেন্ডিয়া’ লিখি না, এমনকি ‘ফাকিস্তান’ও লিখি না। আমি আমার দেশকে ভালোবাসবো। এবং সঙ্গে সম্মান জানাবো অন্য দেশের মানুষের আবেগকেও। আমি তর্ক করবো যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে; গালি দিয়ে নয়। যারা সৌম্যকে ধর্মীয় বিবেচনায় গালি দেয়; তাদের জন্য ঘৃণা। যারা কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিদ্বেষ ছড়ায়, তাদের জন্য করুণা।
মনে রাখতে হবে খেলা খেলাই। খেলাধুলা মানুষের জীবনকে আনন্দময় করার জন্য; ঘৃণা ছড়ানোর জন্য নয়।

পরিচিতি: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ/ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত