প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সেবাগ্রহীতারা ঘুরছেন অফিস বারান্দায়, নিশ্চুপ প্রশাসন

ডেস্ক রিপোর্ট : আশুলিয়া ভূমি অফিস ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির নানা অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরও চক্রটি সক্রিয়, বহাল তবিয়তে। সাভার উপজেলার আশুলিয়া ভূমি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ পদে বছরের পর বছর ধরে কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী বহাল তবিয়তে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে একই অফিসে দায়িত্ব পালন করায় তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় চক্রটি শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার, পেশকার ও নাজির পদে দায়িত্ব পালনকারীদের বিরুদ্ধে সেবাগ্রহীতাদের দুর্নীতির নানা অভিযোগের পরও তারা নিজ নিজ পদে দীর্ঘদিন ধরে বহাল তবিয়তে।

প্রশাসন দেখেও যেন না দেখার ভান করছে। একই পদে তিন বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করলেও অদৃশ্য সুতোর টানে তারা নিজ নিজ পদে দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে রয়েছেন। সেবাগ্রহীতারা এই সিন্ডিকেটের কাছে একরকম জিম্মি হয়ে পড়েছেন। প্রতিদিন ভূমি অফিসের বারান্দায় লম্বা সময় পার করতে হচ্ছে সেবা নিতে আসা অসংখ্য মানুষকে। একেকটি কাজের জন্য হাজার হাজার টাকা সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে তুলে দেয়ার পরও মাসের পর মাস সেবা নিতে আসাদের কাটাতে হচ্ছে ভূমি অফিসের বারান্দায়।

বিগত ২০১৪ সালে আশুলিয়ায় একটি ভাড়া বাসায় সহকারী ভূমি অফিস প্রতিষ্ঠার পর থেকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড পদে তিনজন কর্মকর্তাকে বদলি হতে হলেও এই অফিসের অন্যরা সবাই বহাল তবিয়তে। ভূমি অফিসের ক্রেডিট চেকিং কাম-সায়ারাত হিসেবে কর্মরত নাজিরের দায়িত্ব পালনকারী মাহমুদা সিদ্দিকার বৃহস্পতিবারের দম্ভোক্তি অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সাংবাদিক দেখেই তিনি বলে ওঠেন, নিউজ করে আমাদেরকে কেউ বদলি করাতে পারবে না! এ কথা শুনে এক ব্যক্তি বলে ওঠেন এদের ‘গডফাদার’ কে? আশুলিয়া ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ নিয়ে কথা হয় ঢাকা জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মো. ফেরদৌস খানের সঙ্গে। তিনি বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে বলেন, আশুলিয়া তহসিল অফিসের বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং এ বিষয় তিনি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান।

এ নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন উল্টো কথা। তারা বলেন, আশুলিয়া তহসিল অফিস নিয়ে গণমাধ্যমে এর আগেও একাদিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। জেলা প্রশাসক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিলেও তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশের পরই তারা যেন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না। এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে শোনা গেলে আরও ভয়ংকর কথা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ব্যক্তি বলেন, নিয়ম না থাকলেও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মিস কেসের আদেশের মূল কপি ছাড়াই এ অফিসে মিলছে পর্চা ও ডিসিআর। তাদের খপ্পরে একবার পড়লে আর রক্ষা নেই। পদে পদে নাজেহাল হতে হয় সেবাগ্রহীতাদের।

বৃহস্পতিবার সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, বাঁশবাড়ী মৌজার তিন শতাংশ জমি জোহাদ আলীর (পিতা : আকবর আলী) কাছ থেকে ক্রয় করেন মো. রুহুল আমীন শিকদার। পরে তিনি সম্পত্তির নাম জারির জন্য মিস কেস (নং ৭৯/১৫) করেন। তিনি নাম জারির আদেশ পেলেও আদেশের মূল কপিসহ ওই সম্পত্তি নামজারি (মোকদ্দমা নং-৩৭৪৮/১৬-১৭ দ্বারা) তহসিলে তামিল হওয়ার কথা। কিন্তু নাজিরের দায়িত্ব পালনকারী মাহমুদা সিদ্দিকা আদেশের মূল কপি ছাড়াই ৬২২৫ নং জোত খুলে ওই মামলার বিবাদী রোজী আফরোজের নামে ডিসিআর, পর্চা সরবরাহ করেন। অভিযোগ রয়েছে- এখানে মোটা অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে। এ ব্যাপারে মো. রুহুল আমীন শিকদার গং মিস কেস আদেশের মূল কপি ব্যতীত নামজারি তামিল না করার জন্য তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসার বিকাশ বিশ্বাসের কাছে লিখিত আবেদন করলেও অদ্যাবধি তার কোনো সুরাহা হয়নি। রহুল আমীন গত ছয় মাস ধরে তার আদেশের মূল কপি নিয়ে ভূমি অফিসের বারান্দায় ঘুরছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে স্থানীয় বুড়ির বাজার থেকে আসা রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি বাইপাইল মৌজার আড়াই শতাংশ জমি খারিজের জন্য ৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। কিন্তু সার্ভেয়ারের রিপোর্ট না দেয়ার কারণে গত দুই মাস ধরে ঘুরছেন। একই সময় দেখা হয় একটি মিস কেসের বাদী মুর্কারাম হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার ক্রয় করা সম্পত্তি অন্য ব্যক্তি খারিজ করে নিয়ে গেছে। তিনি মিস কেস (নং ১২২/২০১৭ ) করলেও গত তিন মাস ধরে মামলাটি আদেশের জন্য পড়ে আছে। কবে নাগাদ আদেশ হবে তা তার জানা নেই।

তিনি বলেন, ভূমি অফিসের বারান্দায় দিনের পর দিন কাটলেও কারও কাছেই কোনো পরিষ্কার ধারণা পাচ্ছি না। একইভাবে বাঁশবাড়ী মৌজার একটি জমি অন্য ব্যক্তি খারিজ করে নিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় হাসমত মিয়া ৬ মাস ধরে ঘুরছেন ভূমি অফিসের বারান্দায়। নামজারি করিয়ে দেয়ার নাম করে সিন্ডিকেটটি তার কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৬৩ হাজার টাকা। বাঁশবাড়ী মৌজার আরেক ফরিয়াদি জাহাদ আলী বৃহস্পতিবার সকালে জানান, তার ক্রয় করা ৬০ শতাংশ জমির সঙ্গে খাসজমি থাকায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি নামজারি করাতে পারছেন না। মোটা অঙ্কের অর্থ দেয়ার পরও ওই জমিটি অন্য লোকের নামে নামজারি করে দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে তিনি সহকারী কমিশনার ভূমি অফিসে অভিযোগ দিলে তাকে বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী ফারুকের লোকজন ওই জমি খারিজ করে নিয়ে গেছে। গত ৬ মাস ধরে তিনি ভূমি অফিসে আসছেন আর যাচ্ছেন। তিনি বলেন, চাহিদামতো মোটা অঙ্কের অর্থ না দেয়ায় তাকে এ ঝামেলার মধ্যে পড়তে হয়েছে।

আশুলিয়া ভূমি অফিসের দুর্নীতি নিয়ে দৈনিক যুগান্তরে কয়েকটি সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর গত দু’দিন ধরে ভূমি অফিসটি দালালমুক্ত দেখা গেলেও আসলে তাদেরকে আশপাশেই ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। সাংবাদিক দেখলেই দালালরা নিরাপদ দূরত্বে সরে যাচ্ছেন। একটি সূত্র বলছেন, অফিসের লোকদের সঙ্গে দালালদের ‘ডিজিটাল যোগাযোগ’ আছেই। যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত