প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১২ হাজার ১৩১ কোটি টাকাডেস্ক রিপোর্ট : বিদায়ী বছরের ডিসেম্বরে বড় অংকের ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করায় দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার এক অংকের ঘরে নেমে এসেছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। যদিও গত বছর দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে খেলাপি ঋণ যুক্ত হয়েছে ১২ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা।

এর বাইরে মন্দমানের খেলাপি হয়ে যাওয়ায় অবলোপন করা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ। অবলোপনকৃত এ ঋণ যোগ করলে ২০১৭ সাল শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।

তিন মাস অন্তর দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ ও খেলাপি ঋণ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরের খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন গতকাল চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও গত মাসের ১৫ তারিখের মধ্যেই খেলাপি ঋণের প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফারমার্স ব্যাংকের তথ্য প্রাপ্তিতে বিলম্বের কারণে প্রতিবেদন তৈরিতে এক মাস বেশি সময় লেগেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সাল শেষে দেশের ৫৭টি তফসিলি ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে ৭ লাখ ৯৮ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকার ঋণ। খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণের ৮৫ শতাংশই মন্দমানের খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক থেকে টাকা নিলে ফেরত দিতে হয় না— এমন একটি ধারণা ব্যাংকিং খাতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। বিশেষ সুবিধায় ২০১৫ সালে পুনর্গঠন করা ঋণের বড় একটি অংশই এখন খেলাপি। এসবের ফলে লাগামহীনভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, সুশাসনের ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাংকগুলোয় অনিয়ম-দুর্নীতি বেড়ে যাচ্ছে। এতে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করলে এমনটি হওয়ার কথা নয়। ব্যাংকের ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। পরিস্থিতি উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্ত হতে হবে।

তিনি বলেন, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর অডিট রিপোর্টে ভালো অবস্থান দেখানোর জন্য সাধারণত ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ের ওপর বেশি জোর দিয়ে থাকে। পাশাপাশি এ সময় বড় অংকের ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এছাড়া বেশকিছু ঋণ অবলোপনও হয়ে থাকতে পারে। এসব কারণেই খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে এসেছে। ব্যাংকগুলোর এ তত্পরতার ফলাফল সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে হলে ব্যাংকিং সংস্কৃতিতে করপোরেট সুশাসন কার্যকর করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৭ সাল শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫৭ শতাংশই রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত আটটি ব্যাংকের। এ ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ২৫ শতাংশ খেলাপি। ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। এক বছর আগে এ ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৩১ হাজার ২৫ কোটি টাকা বা ২৫ শতাংশ।

এ সময়ে সরকারি মালিকানার বিশেষায়িত দুই ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ১৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ৫ হাজার ৪২৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের ২৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে এ ব্যাংক দুটির খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা বা ২৬ শতাংশ।

২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের ৪০টি ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২৩ হাজার ৫৭ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে গত বছরজুড়েই আলোচনায় ছিল নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংক। এজন্য বছর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের দিকে দৃষ্টি ছিল সবার। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ফারমার্স ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৭২৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার ঋণ, যা ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের এটাই সর্বোচ্চ হার। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ১৭১ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

অন্যদিকে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে বিদেশী ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ৩০ হাজার ৬২২ কোটি ৮৫ লাখ টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ১৫৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৭ শতাংশ। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত এ ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সূত্র :বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত