প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

৩৪ বছর আগের শোক বাংলাদেশ ছাড়িয়ে নেপালে!

মোহাম্মদ আলী বোখারী : যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় নেপালের কাঠমান্ডু ত্রিভূবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ২১১ বিধ্বস্তের খবরটি ‘সেভ মি, সেভ মি : স্কোরর্স ডেড ইন প্লেন ক্র্যাশ ইন কাঠমান্ডু’ বা ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ শিরোনামে জেফ্রে জেটেলম্যান তার চাক্ষুস অভিজ্ঞতায় তুলে ধরেছেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রায় চৌত্রিশ বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৮৪ সালের ৫ আগস্ট তদানীন্তন জিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট বা আজকের শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফোকার এফ ২৭-৬০০ বিধ্বস্তের ঘটনাটি স্মৃতির অতল থেকে জেগে উঠেছে। কেননা শোকের মাতম বিবেচনায় এ দুটি যাত্রীবাহী বিমানই একই ধরনের ‘অবতরণগত’ ভুলে যথাক্রমে মাঠে ও জলাভূমিতে আছড়ে পড়েছে, যেখানে মৃত্যুসংখ্যা ৫০ ও ৪৯। শোকপীড়িত করে প্রথমটিতে মৃত্যুপথযাত্রী হন বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট কানিজ ফাতেমা রোকসানা ও দ্বিতীয়টিতে পাইলট আবিদ সুলতানের আগেই কো-পাইলট প্রিথুলা রশিদ।

তবু ‘অ্যাভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্ক’ ডাটাবেজ থেকে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে দুর্ঘটনা কবলিত প্লেনটি ১৯৭১ সালে নেদারল্যান্ডের ডাচ এয়ারক্রাফ্ট নির্মাতা ফোকারের নির্মিত ছিল, যা ১৯৭২ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স সাহায্যস্বরূপ বাংলাদেশকে দেয়। সেটি দুর্ঘটনাকালে মোট ১৫,৫৯৫ এয়ারফ্রেম ঘণ্টা উড্ডয়ন থেকে ‘ভিওআর’ অ্যাপ্রোচে বৃষ্টিমুখর দমকা আবহাওয়ায় ৩২ নম্বর রানওয়ে বদলিয়ে ১৪ নম্বর রানওয়েতে ‘আইএলএস’ অ্যাপ্রোচে ভুল করে ৫৫০ মিটার আগেই জলাভূমিতে আছড়ে পড়ে। এতে ৪ জন ক্রুসহ ৪৫ জন যাত্রী মিলিয়ে মোট ৪৯ জনের সকলেই নিহত হন। সেজন্য ফোকারের ইতিহাসে তা ৭৮৬তম নির্মিত বিমান হিসেবে সময় বিবেচনায় তৃতীয় ভয়াবহ ও সর্বশেষ ষষ্ঠ ভয়াবহ অর্থাৎ ‘কন্ট্রোল্ড ফ্লাইট ইন্টু ট্রেরেন (সিএফআইটি) বা ওয়াটার’ এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো মারাত্মক যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনা। সেটি পতেঙ্গা থেকে ঢাকায় অবতরণোন্মুখ ছিল, হতে পারেনি!

কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমস প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যানুযায়ী লিখেছে যে, কাঠমান্ডুতে ১২ মার্চ ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ২১১ বিধ্বস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তা ‘ওবোলিং ইন দ্য এয়ার’ বা ‘সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ছিল না’ এবং ‘আনব্যালেন্সড ইন অ্যাপ্রোচ’ বা ‘ভারসাম্যহীন ছিল’। একইসঙ্গে বিমানবন্দরের কর্মচারীদের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে, বিমানবন্দরের সীমারেখার বাইরে ১৫০ ফুট দূরে খালি মাঠে বিমানের অগ্রভাগটি সরাসরি আছড়ে পড়ে। এ সময় বিমানের সম্মুখভাগে প্রথম দফায় ভয়ার্ত যাত্রীদের উদ্ধারকালে পেছনভাগে বিশাল অগ্নিবিস্ফোরণ ঘটে। সেই ঘটনাকে বিমানবন্দরে জ্বালানি সরবরাহকারী একটি কোম্পানির গাড়িচালক কৈলাস অধিকারী বলেন, ‘ইট সাউন্ডেড লাইক এ বম্ব ওয়েন্ট অফ’। অর্থাৎ মনে হয়েছে যেন বোমা ফেটেছে।

তার মতে, ১৫ মিনিট লেগেছে আগুন নেভাতে; উদ্ধারকর্মীরা বলেছে, দমকল বাহিনী আগে এলে আরো জীবন বাঁচানো যেত। কর্তৃপক্ষের মতে, দুর্ঘটনার কারণটি সুস্পষ্ট নয়, যদিও সোমবার আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল, যা প্রতিবেদকের বর্ণনায় কয়েক ঘণ্টা আগে অবতরণকালে দেখেছেন, ‘স্কাইজ ওয়্যার চোকড্ উইথ ডাস্ট অ্যান্ড স্মোগ’; অর্থাৎ ধোয়াশা ছিল। সূর্যাস্তকালে বিকেল ৫টায় ১৬টি অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ ও উদ্ধারকৃতদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উদ্ধৃতি দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, তারা রানওয়ে ‘মিস’ করার কারণটি তদন্ত করছেন, কেননা পাইলট ৫,০০০ ঘণ্টা ফ্লাই করা অভিজ্ঞজন এবং কোনো যান্ত্রিক ত্রুটিরও প্রমাণ নেই। এয়ারলাইন্সটির মতে, পাইলট ও কন্ট্রোল টাওয়ারের মাঝে ‘সাম কনফিউশন’ ঘটেছে, যা তদন্ত সাপেক্ষ বিষয়, ‘ব্ল্যাক বক্স উইল আনভেইল এভ্রিথিং’।

আমাদেরও বিশ্বাস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের কানাডার বম্বার্ডিয়ার নির্মিত ড্যাশ ৮ বিমানের কালো বাক্সই সব কিছুই উন্মোচন করবে। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে প্রায় ৩৪ বছরের ব্যবধানে যে অর্ধশত মানুষের আহাজারি আপাতদৃষ্টিতে একই ‘অবতরণগত’ ভুলে সৃষ্ট, তার শোক কতটা গড়াবে, সেটাই এখন প্রশ্ন। কেননা, ত্রিভূবন বিমানবন্দর থেকে ১৫ মিনিটের দূরত্বে কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের লবিতে পরিপাটি পোশাকে মধ্যবয়সী শোকাহত তিলক নুপেন কাঁদছিলেন, যার ট্রেভেল এজেন্সির দুজন কর্মচারী মারা গেছেন; যারা ইউএস-বাংলা বিমানের সর্বাধিক টিকেট বিক্রির সুবাদে সৌজন্য সফরে ঢাকা বেড়াতে গিয়েছিলেন। তেমনি ২০১৪ সাল থেকে বিমানটি অভ্যন্তরীণ ৮টি ও আন্তর্জাতিক ৭টি দেশের গন্তব্যে অনেক যাত্রীরই আস্থা অর্জনে সাফল্য দেখিয়েছে এবং ভবিষ্যতে চীনের গুয়াংজু, কাতারের দোহা, ভুটানের পারু, আরব আমিরাতের দুবাই ও সৌদি আরবের জেদ্দা-দাম্মামে নতুন রুটের উপায়ান্তর খুঁজছে। ফলে সেই আস্থা ধরে রাখাটাই হবে তাদের মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ!

ই-মেইল : [email protected]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত