প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঋণের টাকায় দানবীর ইউনূস বাদল

ডেস্ক রিপোর্ট : মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান ইউনূস বাদলের বেড়ে ওঠা অভাব অনটনের মধ্যে। লেখাপড়া খুব বেশিদূর এগোয়নি। বাসচালকের সহকারী হিসেবে শুরু করেছিলেন কর্মজীবন। বাবা-চাচার চাকরির সুবাদে কাজ পেয়ে যান বিদ্যুৎ অফিসে। খোঁজ পেয়ে যান অর্থের উৎসের। দ্রুত ঘুরতে থাকে তার জীবনের চাকা।
বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব প্রয়াত আবদুল মান্নান ভুঁইয়ার সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতার কথা শোনা যায়। বিদ্যুৎ অফিসে কাজ ছেড়ে ইউনূস বাদল নামেন ব্যবসায়। ২০০৪ সালে টঙ্গীর ভাদাম এলাকায় দুই একর জায়গা নিয়ে শুরু করেন ব্যবসায়িক কার্যক্রম। ২০১০ সালের আগ পর্যন্ত ব্যবসা গড়িয়েছে কচ্ছপ গতিতে। ২০১০ সালে তার হাতে আসে ‘আলাদীনের প্রদীপ’। পরের ছয় বছরে একক ব্যবসায়ী হিসেবে জনতা ব্যাংক থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে গড়েন এনন টেক্স গ্রুপ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এই ঋণ নিয়ে যখন তোলপাড় চলছে তখন এই ব্যবসায়ীকে নিয়ে অনুসন্ধানে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অনিয়ম করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এই বিপুল ঋণ হাতিয়ে নেয়া ইউনূস বাদল এলাকায় পরিচিত দানবীর হিসেবে। একের পর এক স্কুল, মাদরাসা, মসজিদসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। জমি কিনেছেন হাসপাতাল গড়ার। রয়েছে বেশ প্রভাব-প্রতিপত্তিও। যদিও ঋণ জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশের পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে এলাকায়। নিজের ভাইকে চেয়ারম্যান করে গড়া এনন টেক্স গ্রুপের একটি কারখানা গড়তে গিয়ে নিজ এলাকার মানুষের বড় দুর্ভোগ ডেকে এনেছিলেন তিনি। কারখানার জন্য আসা যন্ত্রের গাড়িতে সড়ক বেহাল হয়ে পড়ায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে এলাকাবাসীকে।

নরসিংদীর শিবপুরের সাদারচর ইউনিয়নের কালুয়ারকান্দায় জন্ম ইউনূস বাদলের।
তার বাবা জালাল উদ্দিন ঢাকা বিদ্যুৎ অফিসে চাকরি করতেন। তার চাচাও বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা ছিলেন। তার আরো এক ভাই ও এক বোন আছেন। ভাই এনন টেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ইউসুফ বাবুল ও বোন রাবেয়া বেগম। তবে ইউসুফ বাদল কানাডায় থাকেন।

জনতা ব্যাংকের সাবেক সিবিএ নেতা রফিকুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে ২০১ গম্বুজ মসজিদ নির্মাণে শতকোটি টাকা অনুদান দিয়ে আলোচনায় আসেন বাদল। সম্প্রতি তার নিজ গ্রামে বন্যাবাজার এলাকায় পরিবেশের ছাড়পত্র না নিয়ে একটি কারখানা তৈরি করতে গেলে এলাকাবাসী আপত্তি তোলেন। পরে পরিবেশ অধিদপ্তরকে বশে এনে আবার কারখানার কাজ শুরু করেন ইউনূস। এজন্য বিদেশ থেকে বড় বড় কয়েকটি যন্ত্রপাতি আনেন। এই যন্ত্রপাতি কারখানাস্থলে নিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার রাস্তাঘাটও নষ্ট করে ফেলেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। দেড় মাস ভোগান্তি সহ্য করতে হয়েছে এলাকাবাসীর। ঢাকার উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরে এনন টেক্স গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি সেখানে তার বাড়িও রয়েছে। টঙ্গীর চেরাগআলীতে তার আরেকটি বাড়ি আছে বলে জানা গেছে। এছাড়া শ্রীপুর, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, শিবপুরের সাদারচর, বন্যার বাজারে রয়েছে বিপুল পরিমাণ জমি।

‘দানবীর’ ইউনূসের সহায়তায় সিবিএ নেতার বাড়িতে নির্মাণাধীন মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারবেন। মসজিদের প্রধান দরজায় ব্যবহার করা হবে ৫০ মণ পিতল। আজান প্রচারের জন্য নির্মাণ করা হবে দেশের সবচেয়ে উঁচু মিনার। উচ্চতার দিক দিয়ে মিনারটি ৪৫১ ফুট, যা ৫৭ তলার সমান। প্রায় ১০০ কোটি টাকা নির্মাণ ব্যয় ধরে মসজিদের পাশে থাকবে আলাদা ভবন। ওই ভবনে থাকবে দুস্থ নারীদের জন্য বিনামূল্যের হাসপাতাল, এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, দুস্থ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। জনতা ব্যাংক গণতান্ত্রিক কর্মচারী ইউনিয়নের উপদেষ্টা ও জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ইউনূস বাদলকে ঋণ দেয়ায় জনতা ব্যাংক লাভবান হয়েছে। কারণ ব্যবসায়ী হিসাবে তাকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেয়া হলেও তার সব কিছু আপডেট আছে। সে ভালো কাজ করছে। তার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উদ্বোধন করেছেন প্রভাবশালী দুই মন্ত্রী। এছাড়া তিনি জনতা ব্যাংক গণতান্ত্রিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মো. রফিকুল ইসলামের গ্রামের বাড়িতে একটি বড় মসজিদ নির্মাণ করছেন।

ইউনূস বাদল ২০০৪ সালে টঙ্গীর ভাদাম এলাকায় মাত্র দুই একর জায়গায় গড়ে তোলেন একটি গ্রুপ। তবে ব্যবসার মোড় ঘুরতে শুরু করে ২০১০ সাল থেকে। এ সময় ব্যাংক সেক্টর তার প্রতি যেমন ছিল উদার। তেমনি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন সরকারের একাধিক মন্ত্রীর। বাদ যায়নি জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। সঙ্গে ছিলেন সিবিএর নেতারা। জনতা ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণই তার ভাগ্য খুলে দেয়। এই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কল্যাণে মাত্র ৬ বছরে একজন সাধারণ ব্যবসায়ী হিসেবে একক গ্রুপে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেন ইউনূস বাদল। গড়ে তোলেন এনন টেক্স গ্রুপ। এই গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, লামিসা স্পিনিং, ইয়ার্ন ডায়িং, জুভেনিল সোয়েটার্স, সিমি নেট টেক্স, সুপ্রভ কম্পোজিট, এফকে নিট, সিমরান কম্পোজিট, জারা নিট টেক্স, গ্যাট নিট টেক্স, জেওয়াইবি নিট টেক্স, এম এইচ গোল্ডেন জুট, জ্যাকার্ড নিট টেক্স, স্ট্রাইগার কম্পোজিট, আলভি নিট টেক্স, এম নুর সোয়েটার্স, গ্যালাক্সি সোয়েটার, জারা লেভেল অ্যান্ড প্যাকেজিং, সুপ্রভ মিলাঞ্জ স্পিনিং, শাইনিং নিট টেক্স, জারা ডেনিম, সুপ্রভ রোটর স্পিনিং।

জনতা ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সাল থেকে জনতা ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় প্রথম ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করে এনন টেক্স গ্রুপের জুভেনিল সোয়েটার। ওই শাখার বেশি ঋণ দেয়ার ক্ষমতা না থাকায় ২০০৮ সালে জনতা ভবন করপোরেট শাখায় ঋণটি স্থানান্তর করা হয়। ২০১০ সাল থেকে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণসুবিধা নেয়া শুরু হয়। ২০১০ সালের ২৫শে আগস্ট জনতা ব্যাংকের ১৫৪তম বোর্ড সভায় গ্যালাক্সি সুয়েটারের নামে ৮০ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প ঋণ দিয়ে শুরু। এরপর মাত্র ৫ থেকে ৬ বছরের ব্যবধানে গড়ে তোলা এনন গ্রুপের ২২টি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়, সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল অঙ্কের ঋণ পাস হয় ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের ব্যাংকের ২৪টি বোর্ড সভায়।

নিয়ম অনুযায়ী, একক গ্রাহকের ঋণ-সীমা অতিক্রম করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তি নিতে হয়। তা না নিয়ে বরং নতুন করে আরো ঋণ দিয়েছে ব্যাংক। একক গ্রাহককে ফান্ডেড, নন-ফান্ডেড মিলে একটি ব্যাংক তার মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ঋণ দিতে পারে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন ছিল ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক গ্রাহক ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পেতে পারেন না। কিন্তু দেয়া হয়েছে মোট মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ। আর এনন টেক্স গ্রুপের ২২টি প্রতিষ্ঠান ৩ বছরে ৮১৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ফেরত দেয়ার পর বর্তমানে তার কাছে ব্যাংক পাবে ৫ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এ ঋণের বিপরীতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা এখন খেলাপি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ২০০৯ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর থেকে দুই মেয়াদে ৫ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার সময়ে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ পান ইউনূস। ড. আবুল বারাকাতের ওপর এ নিয়ে সম্প্রতি উষ্মা প্রকাশ করেছেন খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলা হয়, গ্রাহকের ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে ৩ হাজার ৫২৮ কোটি টাকার ফান্ডেড ও এক হাজার ১২০ কোটি টাকার নন-ফান্ডেড ঋণ দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ১১টির অনুকূলে এখনও ‘প্রকল্প পরিপূরক প্রতিবেদন’ ইস্যু করা হয়নি।

সার্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, ওই অর্থ উদ্ধারই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের গোটা ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় এখন ১০০ ভাগ কাজের ২০ ভাগই থাকবে ওই অর্থ উদ্ধারকে ঘিরে। সেভাবেই ব্যাংকের শাখাকে বলে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিপুল অঙ্কের এই টাকা উদ্ধারে একটি কোর কমিটিও গঠন করা হয়েছে। নিয়মিতভাবে যদি পর্যবেক্ষণ করা যায়, তবে একটি গতি আসবে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমি আশাবাদী। এটা আমার চ্যালেঞ্জ। এদিকে যোগাযোগ করলে এনন টেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউনূস বাদল আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, সার্বিক বিষয়ে তার বক্তব্য একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরে তিনি আর কিছু বলতে চাননি।

জনতা ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালে গ্যালাক্সি গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ ছিল ৬৭৬ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের প্রতিবেদনেও বলা হয় এই গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ ১ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। তবে ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, এনন টেক্স গ্রুপের ঋণ ১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ঋণ অনেক বেড়ে যাওয়ায় ওই বছরের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জ্যাকার্ড গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ ৩৭৭ কোটি টাকা, এনন টেক্স গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের ঋণ ১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা ও এমএইচ গোল্ডেন জুট মিলের তিন প্রতিষ্ঠানের ঋণ ৪১৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, হলমার্ক থেকে শুরু করে বেসিক ব্যাংক বা বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত লোকজন জড়িত ছিলেন বলেই কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের কারো সাজা হয়নি। আইন আছে, অথচ তার সঠিক প্রয়োগ নেই বলেই এত বড় বড় ঘটনা ঘটছে। মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত