প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অভিজিৎ রায়ের ‍হত্যাকাণ্ড- আমার দায়িত্ববোধ

জীবন আহমেদ : দেখতে দেখতে তিনটি বছর চলে গেলো। এই তিন বছরে অনেক নির্ঘুম আতঙ্কের রাত কেটেছে আমার। যতো দিন বাঁচবো হয়তো সেই আতঙ্ক আমাকে তাড়া করে বেড়াবে। একটা ভয় আমাকে গ্রাস করতে চায় রাতের আঁধারে। কিসের ভয় আমি জানি না। এ কি মৃত্যুর ভয়। মৃত্যু নিয়ে কখনোই ভয় ছিল না। তাহলে…!

এখনো তিন বছর আগের সেই ঘটনাটা মাঝে মধ্যেই ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠে। হঠাৎ মাঝ রাতে যখন ভয়ে ঘুম ভেঙে যায় তখন ভাবি কি দেখছি চোখের সামনে! আমি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারি না। এখনো মনে হয় একটা জীবিত মানুষের মাথার গরম মগজ আমার হাতের তালুতে বেরিয়ে আসছে। তখন আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না। এ রকম নির্মম দৃশ্য এর আগে আমি কখনো দেখিনি। ওই ঘটনার পর অনেক যুদ্ধ করেছি একা। কেউ সাথে ছিল না তখন। সবাই দূরে চলে গিয়েছিল, সেই সময়ই আমি বুঝে গেছি এই শহরে বিপদে পড়লে কেউ পাশে থাকে না। সেই স্মৃতি কখনো ভুলবো না, তা ভোলার না ।

সময়টা ছিলো ২৬ শে ফেব্রুয়ারি ২০১৫ রাত ৮টা ৩০ মিনিট। তখন আমি ফটো এজেন্সি ‘বাংলার চোখ’-এ কাজ করি। প্রতিষ্ঠানের হয়ে সেদিন বইমেলা কভার করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আসি। কাজ শেষে টিএসসি সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটের ভেতরে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ এক নারীর আর্ত চিৎকার আমার সমস্ত মনযোগ আকর্ষণ করে। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দেখতে পাই একটি মোটরসাইকেল রাস্তার উপর পড়ে আছে। তার উপর এক নারী পড়ে আছে, তার শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। ওই ঘটনা দেখার সাথে সাথেই আমি বাইরে বেরিয়ে আসি। উদ্যানের মূল ফটক থেকে বের হয়ে একটু এগিয়ে দেখি চারপাশে লোকজন জড়ো হয়ে আছে। ভীড় ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেই দেখতে পাই লাল পাঞ্জাবী পরিহিত আরেকজন পুরুষ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন ফুটপাতের উপরে। তার মাথার দিক থেকে রক্ত গড়িয়ে রাস্তায় এসে পড়েছে। তখন আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। আশপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম তারা নিশ্চুপ হয়ে সব দেখছেন। কিন্তু কেউ সাহায্যের জন্য সাহস দেখিয়ে এগিয়ে আসছেন না।

মেলার দায়িত্বরত কয়েকজন পুলিশ সদস্যও সেখানে ছিলেন, কিন্তু তারাও ছিলেন নীরব দর্শকের ভূমিকায়। আমি সাহস করে রাস্তায় পড়ে থাকা ওই নারীর দিকে এগিয়ে যাই। তাকে কাঁধে হাত দিয়ে কয়েকবার ধাক্কা দেই, উঠার জন্য। কিন্তু তিনি অচেতন অবস্থায় পড়েছিলেন। কয়েকবার ধাক্কা দেয়ার পর তিনি সাড়া দেন। তবে তিনি ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন, ভাবছিলেন আমিই আক্রমণকারী।

ওই নারীর কপালে আঘাত লাগায় সেখান থেকে রক্ত বের হয়ে দুই চোখের কোনায় পড়ছিল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে আমি একটু পেছনের দিকে সরে আসি। সেই ভয়ঙ্কার চাহনি আজও আমি ভুলতে পারিনি। এক পর্যায়ে ওই নারী উঠে আমাকে জিজ্ঞেস করে এখানে কি হয়েছে? তখন আমি তাকে আঙ্গুল দিয়ে ফুটপাতে পড়ে থাকা লোকটিকে দেখিয়ে দেই। তখন ওই নারী ‘অভি’ বলে চিৎকার দিয়ে ওই লোকটাকে জড়িয়ে ধরে। বলতে থাকে- ‘অভি উঠো, তোমার কিছু হবেনা। এই অভি উঠো।’

এক পর্যায়ে সে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে সাহায্যের জন্য আশপাশে জড়ো হয়ে থাকা মানুষদের ডাকতে থাকে। ওই নারী যখন সবার কাছে সাহায্য চাইছিলেন তখন মানুষগুলো পিছনে সরে যাচ্ছিল। ওই মুহূর্তে আমি ক্যামেরা বের করে রক্তাক্ত ওই দম্পতির ছবি তুলি। কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে না আসায় আমিই ভীড় ঠেলে বাইরে বের হয়ে যাই সিএনজি ডাকার জন্য। সিএনজি নিয়ে আসার পর দুই একজনের সহযোগীতায় তাদের সিএনজিতে তুলে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের দিকে রওনা হই। তাদের যখন হাসপাতালে নিয়ে যাই তখন সিএনজির ভেতরে বন্যা তার স্বামীর শরীর জড়িয়ে বসেছিল। আর অভিজিতের মাথাটা ধরে বসেছিলাম আমি। হঠাৎ অনুভব করি চাপাতির আঘাতে কেটে যাওয়া মাথা থেকে মগজ বেরিয়ে আমার হাতের তালুতে এসে পড়ছে। তখন হাত দিয়ে তাঁর মাথা থেকে বেরিয়ে আসা মগজ ভেতরে দিকে ঠেলে দেই।

অভিজিতের মাথা থেকে রক্ত বের হয়ে ততক্ষণে আমার সারা শরীর ভিজে গিয়েছে। আমি আগে জানতাম না মানুষের রক্ত এত উষ্ণ থাকে, আমি এখনো সেই উত্তাপ অনুভব করি। ঘটনাস্থল থেকে সিএনজি হাসপাতালের দিকে যাবার সময় বন্যা ভয় পেয়ে ভাবছিলো আমি তাদের আটক করে নিয়ে যাচ্ছি। সে আমাকে বলছিলো তাদেরকে ছেড়ে দিতে, বিনিময়ে যত টাকা লাগে দিবে। আমি ক্যামেরাটা উঁচু করে ধরে বার বার বলতে থাকি আমি ফটো সাংবাদিক আমি আক্রমনকারী না। কিন্তু সে আমাকে বিশ্বাস করছিলো না। যাওয়ার পথে পুলিশ চেক পোস্টের কাছে রাস্তা জ্যাম হয়ে গেলে গাড়ি থেমে যায়। পুলিশ দেখা মাত্র বন্যা চিৎকার করে সাহায্য চাইছিলো এবং বলছিলো আমি তাদেরকে আটক করেছি। আমি ভয় পেয়ে গেলাম যে আমাকে এবার পুলিশের লাঞ্চনার শিকার হতে হবে।

হঠাৎ দেখলাম আমাদের পিছন পিছন একটা মোটরসাইকেলে পুলিশ আসছিলেন, যিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং শুরু থেকে সব দেখেছেন। তাঁর ইশারায় চেক পোস্ট খুলে দেয়া হলো এবং তাদেরকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে গেলাম। ঢাকা মেডিকেলে আসার পর জরুরী বিভাগে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলো। তখন আমার ফটো সাংবাদিক বন্ধুরা আমাকে কল করে বলে আমার এই ঘটনায় জড়ানো উচিত হয়নি! আমার কাজ ছবি তোলা, আামি কেন ঝামেলায় জড়াতে গেলাম!

তাদের কথা শুনে আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলেও তাদের জবাব দিয়েছিলাম যে আমার প্রথম দায়িত্ব ছিল ছবি তোলা, সেটা আমি করেছি। তারপর আমি যে সাংবাদিক সেটা ভুলে গিয়ে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে গিয়েছিলাম।

হাসপাতালে রক্ত মাখা টি-শার্ট পরিস্কার করে সেদিন মতিঝিলে ‘বাংলার চোখ’ অফিসে ফিরে আসে। অফিসে এসেই টিভি নিউজে দেখতে পাই তারা দুজন, মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় ও তাঁর স্ত্রী বন্যা আহমেদ, যাদের আমি আগে চিনতাম না। অফিসের বস আমাকে দূরে কোথাও কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দিতে বলেন। কিন্তু আমি তাতে রাজি না হয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে আসি। ততক্ষণে আমার তোলা ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে। সেখানে শত শত কমেন্ট আসছে, কেন আমি তাদেরকে সাহায্য না করে ছবি তুলছিলাম।

টিভির টকশোতেও আমাকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হলো। এর মধ্যে পুলিশ আমাকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করলো। অফিসের চাপে আমি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হলাম। তারা বললো আমার কোন দায়ভার তারা নিতে রাজী না। বন্যা সুস্থ হওয়ার পর অভিজিত হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করলেন যে ঘটনার সাথে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই, আমি সেদিন তাদের উদ্ধার করেছিলাম।এরপর থেকে প্রশাসনের কেউ আমার সাথে আর ওই বিষয়ে যোগাযোগ করেননি।

সমাজে আমার প্রথম পরিচয়, আমি একজন সংবাদকর্মী। আমরাও( সকল সংবাদকর্মী) মানুষ। আমাদের মধ্যেও আছে মনুষত্ববোধ, মানুষের প্রতি অবাধ ভালবাসা। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমরা অনেকে অনেক ঘটনার সম্মুঙ্ক্ষিন হই। কোন কোন সময় জীবন বাজী রেখে কাজ করতে হয় আমাদের। মানবিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে অনেক সময় অনেক কিছু করতে ইচ্ছে হলেও করতে পারিনা। কারণ আমাদেরও কিছু নীতি নৈতিকতা আছে। তারপরও মানুষ আমাদের ভুল বোঝে। সেদিন আমি মানবতার জায়গা থেকেই রক্তাক্ত ওই দম্পতিকে সাহায্য করেছিলাম। আমি চাইলেই পারতাম ঘটনার ছবি তুলে সেখান থেকে চলে আসতে। কিন্তু আমার বিবেক তাতে সায় দেয়নি। সে কে আমি জানার প্রয়োজন বোধ করিনি। একজন মানুষ হিসেবে আমার মনে হয়েছে তাদের সাহায্য করা প্রয়োজন তাই করেছি। সেটা করার পরও আমাকে অনেকের অনেক প্রশ্নের সম্মুক্ষিণ হতে হয়েছে।

অনেকে বলেছে পাবলিসিটির জন্যই আমি সেদিন তাদের সাহায্য করেছিলাম। কিন্তু আমি তাদের পরিচয়ই জানতাম না। হাসপাতালে দিয়ে আসার পর টিভি স্ক্রল দেখে আমি তাদের পরিচয় জানতে পারি। ঢাকার রাজপথে অভিজিতের মতো অনেকেই মরে পড়ে থাকেন। কেউ ফিরেও তাকায় না। সেখান থেকেই বোঝা যায় আসলে আমাদের মনুষত্ব বোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে!

লেখক
ফটো সাংবাদিক,

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত