প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘সময় এসেছে মেধা কোটা পরিবর্তনের’

সাখাওয়াত উল্লাহ : সিদ্ধান্ত যারা নিবে তারা তো রাজনীতিবিদ। আমাদের পুরো রাজনীতি যদি মেধাশূন্য হয়, যাদের কোনো কাজ নেই তারাই রাজনীতি করবে তাহলে কীভাবে চলবে? আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মেধাবীদের রাজনীতিতে আসার সুযোগ কমে আসছে। চাকরিতে অনগ্রসরদের জন্য যেমন কোটা ব্যবস্থা রয়েছে, তেমনি রাজনীতিতে যাতে মেধাবীরা আসতে পারে সেটারও কোটা ব্যবস্থার কথা চিন্তা করার সময়

 এসেছে। কোটা ব্যবস্থা নিয়ে আলাপকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচায ড. মীজানুর রহমান আমাদের অর্থনীতিকে এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, কোটা পদ্ধতি ব্যবস্থা পৃথিবীর সব দেশেই রয়েছে। তবে যারা এই কোটার বিরোধিতা করে বা বলে সবকিছু মেধার ভিত্তিতে হওয়া উচিত তাদের বক্তব্য সব সময় গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ কোটার বিরুদ্ধে বলে কিন্তু তারপরও বিশ্বব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে আমেরিকান ছাড়া কেউ বসতে পারে না। আইএমএফের শীর্ষ পদেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে কেউ নিয়োগ পায় না। কোটা পদ্ধতি চালু থাকলে প্রশাসন মেধাশূন্য হয়ে যাবে। এ ধারণা ঠিক নয়। শুধু প্রশাসনেরই মেধাবীদের প্রয়োজন আছে অন্যত্র নেই আমি এটা বিশ্বাস করি না।

তিনি আরও বলেন, মেধা কোটায় ৪৫ শতাংশ চাকরি পাওয়ার কথা থাকলেও এ ক্ষেত্রে  প্রতি বছরই বেশি পরিমাণে চাকরি পেয়েছে। ২৭তম থেকে ৩০তম বিসিএসের মেধা কোটায় চাকরি পেয়েছে ৬৭ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ চাকরি এখন মেধার ভিত্তিতেই হচ্ছে। মহিলা কোটা পূরণ করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, উপজাতিদের জন্য যে ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত রয়েছে তার মাত্র দশমিক ৬৪ শতাংশ কোটা পূরণ হয়েছে ২৭তম থেকে ৩০তম বিসিএসে। এই অবস্থার মূল কারণ ছিল, মুক্তিযোদ্ধা ও উপজাতি কোটায় লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন সবার কোটা ঠিক রেখে উপজাতিদের জন্য পাশের নম্বর কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছিল। যাতে তারা কোটা পূরণ করতে পারে।

তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানের ২৯-এর ৩’র (ক) ধারা অনুযায়ী, যারা অনগ্রসর ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সমান হতে পারেনি তাদের জন্য কোটা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা সবাই কথা বলে। ১৯৭২ সালে প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা ব্যবস্থার কথা বলা হলে তখন ৪০ শতাংশ কোটার কথা বলা হয়েছিল। যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল তাদের দেশপ্রেম নিয়ে কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। তারা দেশকে অন্তর দিয়ে ভালবাসে বলেই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল। এসব বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের প্রশাসনে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৪০ শতাংশ কোটার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এখন কাগজে-কলমে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত আছে। মেধাবীদের জন্য ৪৫ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের জন্য ৩০, অন্যান্য ১০ শতাংশ।

কিন্তু ২৭ থেকে ৩০তম বিসিএসের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখাযায়, কোটা প্রয়োগের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটছে। ২৭তম থেকে ৩০তম বিসিএসের এই কোটা পূরণ হয়েছে গড়ে ১২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। ১৯৮২ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, ১৯৮৩ সালে ১৩ শতাংশ, ১৯৮৪ সালে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, ১৯৮৫ সালে ৫ শতাংশ, ১৯৮৬ সালে ১ শতাংশ, ১৯৮৭ সালে ১ শতাংশের সামান্য বেশি, ১৯৮৮ সালে শূন্য শতাংশ, ১৯৮৯ সালে ১ শতাংশের কিছু বেশি এবং ১৯৯০ সালে ১ শতাংশ। অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা থাকলেও সেটা কোটা পূরণ হয়নি কোনো বছরই।

তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে স্কুলে যেতে হলে অনেকটা পথ পেরিয়ে যেতে হয়। তাদের উন্নয়ন সমতল ভূমির মতো নয়। কাজেই তাদের কিছুটা বাড়তি সুযোগ দেওয়া হলে অসুবিধা কেথায়? জেলা কোটা নিয়ে আপত্তি করে অনেকেই বলছেন, এখন রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়নের ফলে জেলাগুলো এখন উন্নয়নের ধারায় শামিল হয়েছে। কাজেই জেলা কোটা থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ক্যাবিনেট কমিটি তাদের রিপোর্টে বলেছিল, ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৮টি উপজেলা খুবই অনুন্নত।

তিনি বলেন, ১৯৮৯ সালে ভারতে যখন মন্ডল কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয় তাতে ৪৯.৫০ শতাংশ কোটা রাখার কথা বলা হয়। আমাদের দেশের সুশীল সমাজই তখন ভারতে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের বর্ণবাদী বলেছেন। কোটাবিােরধী আন্দোলনকারীদের কাছে এসব তথ্য নেই। কোটার কারণেই তাদের চাকরি হচ্ছে না বলে তারা মনে করছে। আমি দেখলাম, ৬৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ চাকরি মেধার ভিত্তিতেই হচ্ছে। কোটাবিরোধী আন্দোলন যখন হলো তখন রাজনীতিও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। আন্দোলন হতে পারে কিন্তু তাকে নিয়ে অপরাজনীতি করা হলো কেন? কোটা বাতিল করা হলে তা সংবিধানের ২৯(৩) ‘ক’ ধারার বরখেলাপ হবে। কোটা ব্যবস্থা সংশোধন করা দরকার কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলই এতে হাত দেবে না। কারণ বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। যেহেতু ইস্যুটি এখন কোর্টের এখতিয়ারে রয়েছে তাই সরকারের উচিত হবে কোর্ট থেকে একটা সমাধান নিয়ে আসা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত