প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রূপ হারাচ্ছে রূপসী জাফলং

ডেস্ক রিপোর্ট : সিলেটের রূপসী কন্যা জাফলং। জেলার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র এটি। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলধারা, খাসিয়া সম্প্রদায়ের পানপুঞ্জি আর মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা পাথর ছিল এ অঞ্চলের মূল আকর্ষণ। আর এই আকর্ষণের টানে হাজারো পর্যটকের সরব উপস্থিতিতে জমজমাট থাকে জাফলং। কিন্তু সেই রূপসী কন্যার রূপ-লাবণ্য হারিয়ে যাচ্ছে, অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে জাফলং। এখন শ্রীহীন জাফলংয়ে সবুজের সেই সমারোহ নেই, যা দেখা গেছে একযুগ আগেও। ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’। চর্যাগীতিকার ওই পদে বলা হয়েছে, হরিণ নাকি তার নিজের সুস্বাদু মাংসের জন্য সবার শিকারের লক্ষ্যবস্তু হয়। তেমনি মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা পাথরই এখন জাফলংয়ের সর্বনাশের মূল কারণ। নদী থেকে উত্তোলিত পাথর সংগ্রহ করে তা ভাঙ্গার জন্য গড়ে ওঠা ক্রাশার মেশিনের ডাস্টই (পাথর ভাঙ্গার পর বাতাসে ভেসে বেড়ানো নুড়ি) জাফলংকে ন্যাড়া করে দিচ্ছে। বৃক্ষবিহীন হয়ে জাফলং যেন বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের মতে, জাফলংয়ের দৈন্যদশার মূল কারণই ক্রাশার মেশিন। নদীতীরবর্তী ও সড়কের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে ক্রাশার মেশিনগুলো নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তর করা হলে জাফলংয়ের অর্ধেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। আর পরিবেশবিদদের মতে, পাথর উত্তোলন কমে যাওয়ায় এমনিতেই ক্রাশার মেশিন বন্ধ হয়ে পড়ছে। যদি জাফলং থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ করা না যায়, তবে অচিরেই সবুজশূন্য হয়ে পড়বে প্রকৃতিকন্যা জাফলং।

জানা গেছে, ২০০৬ সালের দিকে জাফলংয়ে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের পাশাপাশি বোমা মেশিনের ব্যবহার শুরু হয়। উত্তোলিত পাথর ভাঙতে বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হয় ক্রাশার মেশিন স্থাপন। দিন যত যায়, বাড়তে থাকে বোমা মেশিনের সংখ্যা। আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে স্টোন ক্রাশার মেশিন। জাফলংয়ের বিভিন্ন স্থানে ২০০৬ সালের নীতিমালা উপেক্ষা করে পাথর ব্যবসায়ীরা সড়ক, মহাসড়কের পাশে ক্রাশার মেশিন স্থাপন করে পাথর ভাঙতে শুরু করেন। এক যুগের ব্যবধানে পাঁচ শতাধিক ক্রাশার মেশিন স্থাপিত হয়। আর এসব ক্রাশার মেশিনের মালিক হলেন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরা। প্রশাসনও তাদের কাছে অসহায়। পরিবেশ আইনের কোনো তোয়াক্কাই এরা করেন না বলে অভিযোগ।

আর ভূমি মালিকরা ক্রাশার মেশিন স্থাপনের জন্য ভূমি ভাড়া দিয়ে দেন। এজন্য সংগ্রাম সীমান্ত ফাঁড়ি সড়ক ও গুচ্ছগ্রাম এলাকায় ক্রাশার মেশিনের জোন গড়ে উঠেছে। এসব মেশিনে যেমন শব্দদূষণ হচ্ছে, তেমনি পাথর ভাঙ্গা ডাস্ট বাতাসে মিশে পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। জাফলং থেকে বিদায় নিয়েছে সবুজ। শ্রীহীন হয়ে এখন বার্ধ্যকে ধুঁকছে। তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে বলে দাবি করেছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির সিলেটের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা বলেন, ‘আমরা সবসময় পাথর উত্তোলনের বিপক্ষে। ক্রাশার মেশিন স্থাপনে মানা হচ্ছে না ২০০৬ সালের নীতিমালা। নীতিমালায় বলা হয়েছে, সড়ক, মহাসড়ক, বাসস্থান, মসজিদ, নদী কিংবা খালের ৫০০ মিটারের মধ্যে কোনো ক্রাশার মেশিন স্থাপন করা যাবে না। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্টের আদেশে স্টোন ক্রাশার মেশিন স্থাপনে ২০০৬ সালের নীতিমালা অনুসরণের কথা বলা হয়েছিল। এ ছাড়া একটি ক্রাশার মেশিন জোন স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই।’ সুশাসনের জন্য নাগরিক, সুজন সিলেট চ্যাপ্টারের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘২০০৬ সাল থেকে ব্যবসায়ীরা বোমা মেশিনের মাধ্যমে মাটির প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ফুট গভীর থেকে পাওয়ার পাম্প যন্ত্রের সাহায্যে পাথর উত্তোলন শুরু করে। এতে শ্রমিকরা কর্ম হারিয়েছেন, জাফলং হারিয়েছে তার রূপ। ক্রাশার মেশিনের ডাস্টের কারণে পরাগায়ণ না হওয়ায় বাড়ছে না বৃক্ষরাজি।’ তিনি আরো বলেন, যে সরকার ক্ষমতায় যায়, সেই দলের নেতারাই ক্রাশার মেশিন দিয়ে জাফলংকে ধ্বংস করছেন। তাদের সবাই চেনে। উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে তাদের দহরম-মহরম সম্পর্ক।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার পাল বলেন, ‘আমরা ইসিএ কমিটির মাধ্যমে জাফলংয়ের স্পর্শকাতর এলাকা চিহ্নিতের কাজ করছি। পাথর উত্তোলন বন্ধ ও ক্রাশার মেশিন স্থানান্তর করা গেলে অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভায়ও আমি বিষয়টি তুলেছি। সূত্র : প্রতিদিনের সংবাদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত