প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হলিউড তারকার ‘বিপর্যস্ত দিনলিপি’তে রোহিঙ্গা জীবন

ডেস্ক রিপোর্ট : বিপন্ন রোহিঙ্গা জীবন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল হলিউড অভিনয়শিল্পী ও অ্যাক্টিভিস্ট অ্যাশলে জুডকে। সম্প্রতি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করতে এসে ট্রমায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন তিনি। জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এর শুভেচ্ছা দূত হিসেবে জুদ ৫ দিন থেকেছেন বাংলাদেশে। সচক্ষে দেখেছেন শরণার্থী জীবনের ভয়াবহ আর্তনাদ। রোহিঙ্গাদের মুখে শুনেছেন রাখাইনের দুর্বিষহ যাপনের দিনগুলোর কথা। তাদের পুড়িয়ে দেওয়া ঘরবাড়ি, সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও নারীদের ওপর ধর্ষণসহ বিভিন্ন যৌন নিপীড়ন কিংবা শিশু সন্তানের জবাই হওয়ার গল্পগুলো তিনি টুকে রেখেছেন দিনলিপিতে। বাংলাদেশ সফরের সময়ে একইসঙ্গে তিনি তৎপর ছিলেন নিজের টুইটার আর ইন্সটাগ্রাম একাউন্টে। ফিরে গেছেন হাস্যোজ্বল এক ছোট্ট রোহিঙ্গা শিশুর ইতিবাচক স্মৃতিকে সঙ্গী করে। কেমন ছিল স্বনামধন্য হলিউড তারকার সফরের দিনগুলো?
১০ ফেব্রুয়ারি, শনিবার

এদিন সঙ্গীদের নিয়ে কক্সবাজার পৌঁছান অ্যাশলে জুড। কর্তৃপক্ষের পরামর্শ ছিল, সন্ধ্যা ছয়টার পর হোটেল প্রাঙ্গণ ত্যাগ না করার। ব্যক্তিগতভাবে জুডকেও বলা হয়েছিল, কোথাও গেলে তিনি যেন পুলিশ প্রহরায় যান। ইউএনএফপিএ কর্মী ফাতেমাকে নিযুক্ত করা হয়েছিল তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে। ওই রাতে আর শরণার্থী শিবিরে যাননি জুড।

নারীর প্রতি সহিংসতা এবং তাদের অধিকারের প্রশ্নে জুদ বরাবরই সোচ্চার। গত বছরের অক্টোবরে ম্যুভি মোঘল হার্ভে ওয়েনস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। সেই প্রেরণায় উৎসাহিত হয়ে আরও ৫০ হলিউড কর্মী নিজেরে নিপীড়িত হওয়ার অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে এনেছিলেন। রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনেও জুদের মনোযোগ ছিল নারী আর শিশুদের প্রতি। ১০ ফেব্রুয়ারির দিনলিপিতে তিনি লিখেছেন, পরদিন ক্যাম্প পরিদর্শনের প্রস্তুতি হিসেবে এদিন রাতভর তিনি রোহিঙ্গাদের অতীত-বর্তমান সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেছেন বইপুস্তক থেকে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জীবন, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবির আর অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতি রোহিঙ্গা নারীদের বাস্তবতা নিয়ে প্রাথমিক ধারণা নিচ্ছিলেন তিনি।

১১ ফেব্রুয়ারি, রবিবার

এদিন প্রথমদিনের মতো রোহিঙ্গা শিবিরে যান অ্যাশলে জুড। কুতুপালং শিবিরের বর্ধিত অংশে ইউএনএফপিএ’র সহায়তায় পরিচালিত একটি উইমেন’স ফ্রেন্ডলি স্পেস পরিদর্শন করেন। সেখানেই কয়েক ঘণ্টা কাটে রোহিঙ্গা নারীদের সঙ্গে। জুড এদিনের দিনলিপিতে লিখেছেন, ‘পথে আমি ফাতেমার সঙ্গে নারীদের নিয়ে আলোচনা করলাম।’
ফাতেমার কাছ থেকে অ্যাশলে জানতে পারেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারতে হয়। আর শিশুসহ যারা বেশিক্ষণ মলমূত্র ত্যাগ না করে থাকতে পারেন না, তাদের জন্য বরাদ্দ উন্মুক্ত স্থান। শিবিরে ১৯ নারীবান্ধব স্থান রয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এগুলো খোলা থাকে। এখানে নারীরা স্বস্তিতে থাকে। তাদেরকে মানসিক সাহস যোগানো হয়।

অ্যাশলে জুড লিখেছেন, ‘এক ছেলে শিশুকে দেখতে পেলাম প্লাস্টিকের তৈরি সিংহ, জিরাফ আর বাঘ নিয়ে খেলছে এবং হাসছে। তার পাশেই আরেকটি ছোট মেয়ে দাঁড়ানো ছিল।’ অ্যাশলে জুড লিখেছেন, ‘ছেলেটির চেয়ে মেয়েটি ছোট। আত্মীয়তার বন্ধন নেই তাদের। তবে দুজনের পথ এক জায়গায় এসে মিলেছে। আশ্রয় শিবিরই ঠিকানা হয়েছে তাদের।’ জুড তার দিনলিপিতে লিখেছেন, ওই ছোট্ট মেয়েটিই ১৪ দিন ধরে বৃষ্টি, কাদামাটির পথ, খাল পার হয়ে বাংলাদেশের শিবিরে সে পৌঁছাতে পেরেছে।

শরণার্থী শিবিরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসে বসে নারীদের বিপন্নতার কথা শুনেছেন তিনি। কেউ জুডকে বাবার হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার কথা শুনিয়েছেন। স্বামী হারানো কোনও এক নারী তাকে শুনিয়েছেন সদ্যজাত সন্তানকে সম্বল করে বাংলাদেশে প্রবেশের কথা। পালিয়ে আসার সময় এক ও তিন বছর বয়সী অন্য দুই সন্তানকে বহন করার জন্য টাকাও গুণতে হয়েছে তাকে।
জুড তার দিনলিপিতে দুই সহোদরার কথা লিখেছেন। তারা জুদকে জানিয়েছেন, কী করে পুরুষদের হাত ও পা পেছনে নিয়ে পিঠের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয় এবং হত্যা করা হয়। কী করে তরুণীদের ধরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়। রোহিঙ্গা নারীরা জুদকে জানিয়েছেন, বয়স্ক নারীদেরও বেঁধে রাখা হতো বিভিন্ন কক্ষে।  সেরকমই একটি কক্ষের দরজা ভেঙে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন দুই রোহিঙ্গা বোন। লুকিয়ে থাকেন জঙ্গলে । সেখান থেকেই দেখতে পান, আগুনে জ্বলছে তাদের গ্রাম। জঙ্গল থেকে সরাসরি তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।’ অ্যাশলে জুড লিখেছেন, ‘খুব বেশি চাওয়া-পাওয়া নেই রোহিঙ্গাদের। এই জগতই তাদের শিখিয়েছে, তাদের চাওয়া যেন শূন্যের কাছাকাছি হয়। একটি সেলাইয়ের মেশিন আর গান শোনার জন্য মতো যন্ত্র পেলেই তারা খুশি।’
১২ ফেব্রুয়ারি, সোমবার

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ৩৪ হাজার গর্ভবতী রয়েছেন রোহিঙ্গা শিবিরে। এদের কেউ কেউ আবার শিবিরেই সন্তান জন্ম দিয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জুডের কথা হয় তেমন কয়েকজন নারীর সঙ্গে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে জুদ লিখেছেন, ‘২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই ধাত্রীরা ব্যস্ত। প্রায় ৪০ হাজার নারী গর্ভকালীন সেবা পেয়েছেন।  জন্ম হয়েছে ১৫শ শিশুর। এর মধ্যে ৭৮ শতাংশই স্বাস্থ্য সুবিধার বাইরে। সংকটকালে আমরা প্রায়শই গর্ভবতী নারীদের কথা ভুলে যাই। তাদের মৌলিক প্রয়োজনের কথা না ভেবে আমরা ভাবতে থাকি স্থবির জীবন নিয়ে।’

মাতৃত্বকালীন সেবা কেন্দ্রগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইন। প্রচণ্ড গরমেও দীর্ঘসময় ধরে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় নারীদের। সেই ১২ তারিখে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর হাল ছেড়েছেন আজিদা। নৌকায় করে বাংলাদেশে পালিযে এসেছে আজিদা। কিন্তু নদীপথে নৌকাটি ডুবে গিয়েছিল। সঙ্গে ডুবে গেছে ৪ সন্তান। একজন ১০ বছর বয়সী, ২ জন সাত বছর বয়সী জমজ আর আরেকজন তিন বছরের। অ্যাশলে জুড লিখেছেন, ‘আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে সে (আজিদা) জানালো, গর্ভের সন্তানটিও নড়ছে না মাস খানেক হলো। আমি ইচ্ছে করে ভাবতে চেষ্টা করলাম সে এ কথা বলেনি। কারণ চার সন্তানকে হারানো মায়ের জন্য এ খবরটি এতোটাই খারাপ যে তা সত্যি হতে পারে না।’

১৩ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার

এদিন কলমছড়াতে ইউএনএফপিএ’র একটি উইমেন ফ্রেন্ডলি স্পেস পরিদর্শন করেন জুড। এদিন এক বয়স্ক নারী অ্যাশলে জুডকে তার দুঃসহ স্মৃতির বর্ণনা দেন। জানান, গলার মধ্যে আঙুল নাড়াচাড়া করা হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো গলা কেটে ফেলা হচ্ছে। চোখ বন্ধ করে, মাথা কাত করে রেখে মৃত্যুর ভান করে বেঁচে যান তিনি।

রোহিঙ্গাদের গল্প শোনার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অ্যাশলে জুড জানান, ‘একটা সময় বিছানায় শুইতে গিয়ে আমার পুরো শরীর কাঁপতে থাকে। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে কখনও কখনও পা নাড়াই। জানি, কোনও একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্ক আমাকে গ্রাস করছে। একটা সময় আমি ঘুমিয়ে পড়ি। টানা ১২ ঘণ্টা ঘুমাই।’

১৪ ফেব্রুয়ারি, বুধবার

‘ভ্যালেন্টাইন ডে’র এই দিনে শিবিরের অভিজ্ঞতাসম্বলিত টুইটার পোস্টে জুড লিখেছেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী বাড়ির এক কোণায় আমরা ১৬ জন আছি। ভালোবাসা দিবসে সিক্ত হয়েছি বহুজনের ভালোবাসায়। সবাই জড়িয়ে ধরেছে আমাকে, ভরিয়ে দিয়েছে চুমুতে। ভাগ্যবান আমি।’

এদিন ছিল অ্যাশলে জুডের বিদায়ের দিন। দিনলিপিতে তিনি লিখেছেন, ‘আমার শিবির পরিদর্শনের দিন ফুরোলো। সকাল আসতে আসতেই আমি বিপন্ন আর অবসন্ন বোধ করতে থাকি। এখনই শিবির ছাড়া ভালো। জানিতো, এখানে চিরকাল থাকতে পারব না। সেটা আমার কাজও নয়। আর এখানকার জন্য আমি তেমন জরুরি কেউও না।’

রুড লিখেছেন, ‘আমার অস্তিত্বজুড়ে চলে যাওয়ার অনুভব। প্রতি মুহূর্তে আমি যেন এক কিলোমিটার দূরত্বে সরে যাচ্ছি আমার হাজার হাজার রোহিঙ্গা ভাই-বোনের কাছে থেকে। আমার কান্না পাচ্ছে।’ ফেরার সময় এক কন্যাশিশুকে স্মৃতিপটে গেঁথে নিয়ে গেছেন রুড। শিবিরের একটি তাঁবুর ফাঁক দিয়ে তাকে দেখছিল শিশুটি। রুড লিখেছেন, ‘তার সঙ্গে চোখাচোখি হলো। আমি তাকিয়ে হাসলাম।  পাল্টা সেও আমার দিকে তাকালো এক উদ্ভাসিত চোখ ঝলসানো হাসি নিয়ে। জানি, মুহূর্তটি রয়ে যাবে আমার বাকি জীবনের স্মতিপটে।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত