প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ছেলের রক্তাক্ত লাশ ট্রাকে নিয়ে ঢামেকে মা

ডেস্ক রিপোর্ট : ছেলের রক্তমাখা শাড়ি গায়ে কাজলা রানী সাহাছেলে শুভ সাহার (১৭) রক্তাক্ত নিথর দেহ নিয়ে মা কাজলা রানী সাহা প্রায় ২৭ কিলোমিটার পথ ট্রাকে করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আসেন। নিজের আঘাত ভুলে ছেলেকে বাঁচানোর জন্য ছুটে আসেন হাসপাতালে। তবে ছেলেকে বাঁচাতে পারেননি এই মা। হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসকরা জানান, আগেই শুভর মৃত্যু হয়েছে। এরপর থেকে মা কাজলা রানী সাহার কান্না আর থামছে না।

ছেলের রক্তেভেজা শাড়ী পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের মেঝেতে নির্বাক মা বসে আছেন। ঘটনার পর থেকে থামেনি তার চোখের পানি। কারও সান্ত্বনাই একমাত্র ছেলে হারানোর যন্ত্রণা কমাতে পারছে না।

কাজলা রানী সাহাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন অন্যরাসোমবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ত্রিবর্দী এলাকায় লরিকে ধাক্কা দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের সিডিএম ট্রাভেল পরিবহনের একটি বাস। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মারা গেছেন দশ জন। তাদের মধ্যে একই পরিবারের নারী ও শিশুসহ চার জন রয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন। যাদের মধ্যে এখনও তিন জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

কাজলা রানী সাহার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ এলাকায়। এক সপ্তাহ আগে ছেলের সঙ্গে ছোট মেয়ে তাপসী রানী সাহার গাজীপুরের কালীগঞ্জের পূবাইলের বাসা দেখতে আসেন। মেয়ের বাসায় বেড়ানো শেষে চাঁদপুরে নিজেদের বাড়ি যাওয়ার জন্য আজ দুপুর ১২টার দিকে কাঁচপুর ব্রিজ থেকে মা ও ছেলে সিডিএম ট্রাভেল পরিবহনের বাসটিতে ওঠেন। বাসটি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ত্রিবর্দী এলাকায় যাওয়ার পর সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি লরিকে ধাক্কা দেয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এতে বাসটির অধিকাংশ যাত্রী আহত হন। বাসের ভেতরে সিটে বসা ছাড়াও দাঁড়ানো যাত্রী ছিল। মা কাজলা রানী ও শুভ সাহাও দাঁড়িয়ে ছিলেন। দুর্ঘটনার পর শুভ সাহাসহ অনেকেই গুরুতর আহত হন। পথচারীরা দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে রওনা হন। ট্রাক, পিকআপ, সিএনজি অটোরিকশা ও অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে আনা হয়।

আহত এক কিশোরীঘটনার পর শুভ সাহা বাসের ভেতর পড়ে ছিল। গুরুতর আহতদের সঙ্গে তাকেও ট্রাকে তোলা হয়। শুভর বুক, পা ও মাথায় গুরুতর আঘাত ছিল। ঘটনার পর সে আর চোখ খোলেনি। ছেলের সঙ্গে মাও ওই ট্রাকে ওঠেন। হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসক শুভকে মৃত ঘোষণা করেন।

বাসের টিকিটনিহত শুভর ছোট বোনের স্বামী নিমাই সাহা বলেন, ‘শাশুড়ি (কাজলা সাহা) ফোন করে বিষয়টি জানানোর পর আমি চলে আসি। আমার শ্বশুরের নাম গোপাল সাহা। দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে শুভ সবার ছোট। আমার বাসায় বেড়ানো শেষে তারা বাড়িতে যাচ্ছিল।’

কাতার যাওয়া হলো না ইলিয়াসের, তার পরিবারের চারজনের মৃত্যু

কুমিল্লার চান্দিনার কাতার প্রবাসী ইলিয়াস হোসেন (৩৮)। তিন মাসেরও বেশি সময় বাড়িতে ছুটিতে থাকার পর সোমবার কাতার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল তার। তবে ফ্লাইট মিস হওয়ায় তার আর কাতার যাওয়া হয়নি। তাকে এগিয়ে দিতে বাড়ি থেকে তার সঙ্গে এসেছিলেন তার বড় ভাই মফিজ হোসেন (৪৭), বড় বোন মিনু আরা (৩৫), তার বড় ছেলে ইনান (৮), ছোট ভাই জাহাঙ্গীর (২৭) এবং প্রতিবেশী রাজু (১৮)। ফ্লাইট মিস হওয়ার কারণে তারা সবাই বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলেন। সিডিএম ট্রাভেল পরিবহনের বাসটিতে টিকিট কেটে ওঠেন। তারা সবাই বাসটির মাঝামাঝি সিটে বসা ছিলেন। তবে তাদের আর বাড়িও যাওয়া হয়নি। দুর্ঘটনায় নিহত হন ইলিয়াস, তার ছেলে ইনান, বড় বোন মিনু আরা ও বড় ভাই মফিজ। আহত হয়েছেন ছোট ভাই জাহাঙ্গীর ও প্রতিবেশী রাজু। তাদের মধ্যে ইলিয়াস, মফিজ ও মিনু আরার লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মর্গে রয়েছে। ইলিয়াসের ছেলে ইনানের লাশ রয়েছে সোনাগাঁও উপজেলা হাসপাতালে।

আহতদের কয়েকজননিহত ইলিয়াসের চাচাতো ভাই মুরাদ বলেন, ‘তিনমাসের বেশি হবে ইলিয়াস ছুটিতে বাড়িতে এসেছেন। সোমবার তার চলে যাওয়ার কথা ছিল, তবে ফ্লাইট মিস হওয়াতে তারা বাড়িতে ফিরে আসছিল। এসময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। ইলিয়াস এর আগে ৫/৬ বছর সৌদি আরব ছিলেন। বছরখানেক আগে তিনি কাতারে যান। নিহতদের লাশ বাড়িতে নেওয়ার জন্য তাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা এই পরিবারটিকে সহযোগিতা করার জন্য এসেছেন।’

রক্ত গাঢ় হেনার মেহেদির রঙ

হেনা আক্তার পপি। মাত্র দুই মাস আগে এই তরুণীর বিয়ে হয়েছে। হাতের মেহেদির রঙ এখনও মুছে যায়নি। স্বামী মিজানুর রহমান ও দেবর রামিমকে (৫) নিয়ে কেরানীগঞ্জে ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে আসেন এক সপ্তাহ আগে। বেড়ানো শেষে আজ তারা গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের তারাইল উপজেলার কাজলায় যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনায় হেনা ও দেবর রামিমের মৃত্যু হয়েছে। স্বামী মিজানুর গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি।

একই পরিবারের পাঁচজন গুরুতর আহত

ভয়াবহ এই সড়ক দুর্ঘটনায় আরও একটি পরিবারের চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তারা হলেন দাউদকান্দির গৌরিপুরের আব্দুল হাকিম, স্ত্রী সেলিনা (৪০), স্ত্রীর ভাইয়ের মেয়ে জান্নাত (১০) ও আলফিন (১০) ও শাশুড়ি মাজেদা (৭০)। নরসিংদীর পাঁচদোনায় তারা এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পথে এই দুর্ঘটনায় পড়েন তারা।

লরিতে ধাক্কা দেওয়ার আগে রিকশাকে চাপা দেয় বাসটি

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ত্রিবর্দী এলাকায় লরিতে ধাক্কা দেওয়ার আগে বাসটি একটি রিকশাকে চাপা দিয়ে আসে বলে জানিয়েছেন আহতরা। হাসান নামের আহত এক তরুণ বলেন, ‘লরিতে ধাক্কা দেওয়ার আগে একটি রিকশাকে চাপা দিয়ে আসে বাসটি। তখন যাত্রীরা সবাই চালককে ধীরে বাস চালাতে বললেও সে যাত্রীদের কথা শুনেনি। এরপরই এই দুর্ঘটনা ঘটে।’

হাসানের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোচপুর থানার পশ্চিম শিকদাখিন এলাকায়। দুর্ঘটনায় তার ডান পা ভেঙেছে। এছাড়াও ওপরের পাটির তিনটি দাঁত পড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘৪৭ সিটের গাড়ি হলেও মাঝখানে অসংখ্য যাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন। নারী, পুরুষ ও শিশু অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন। যাদের বেশিরভাগ কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ফেনী অঞ্চলের যাত্রী।’

দশ লাশ দুই হাসপাতালের মর্গে

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) মর্গে ছয়টি এবং সোনারগাঁও উপজেলা হাসপাতালে চারটি লাশ রয়েছে। ঢামেকে যাদের লাশ রয়েছে, তারা হলেন, ইলিয়াস হোসেন, মফিজ হোসেন ও মিনু আরা। তারা তিন জন ভাই-বোন। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ভেরারা গ্রামে। কিশোরগঞ্জের তারাইল উপজেলার কাজলা গ্রামের হেনা আক্তার ও তার দেবর রামিমের (৫) লাশও ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মর্গে। নিহত শুভ সাহারও লাশ রয়েছে এই হাসপাতালের মর্গে। অন্যদিকে, সোনারগাঁও উপজেলা হাসপাতালে নারী ও শিশুসহ চারটি লাশ রয়েছে। তাদের মধ্যে নিহত ইলিয়াসের আট বছরের ছেলে ইনানের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি তিনটি লাশের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

আহতদের কে কোথায় ভর্তি

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে বর্তমানে ১৩ জন ভর্তি রয়েছেন। দু’জনকে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়াও মদনপুর আল বারাকা হাসপাতালে আহত কয়েকজন ভর্তি রয়েছেন।

পুলিশের বক্তব্য

সোনারগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোর্শেদ আলম বলেন, ‘এখনও মামলা হয়নি। আমরা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হচ্ছি। কেন এমন দুর্ঘটনা ঘটলো, তা হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি আমরাও তদন্ত করবো।’ বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত