প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজনৈতিক নেতাদের কব্জায় পরিবহন

ডেস্ক রিপোর্ট : রাজনৈতিক নেতাদের কব্জায় জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের পরিবহন সেক্টর। পরিবহন খাতে ক্রমবর্ধমান নৈরাজ্যের নেপথ্যে রাজনৈতিক মালিকানার এই অশুভ প্রভাব। সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং সরকারদলীয় নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মালিকানায় থাকা পরিবহনগুলোর কারণে নগর পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরছে না। মানা হচ্ছে না সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়মনীতি। যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। জানা গেছে, রুট নির্ধারণ, সিটি সার্ভিসে ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানিরও অন্যতম কারণ পরিবহন মালিকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। সরকারি দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ রাজনৈতিক দলের কিছু নেতার সম্মিলিত তৎপরতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে গণপরিবহন ব্যবস্থা। এ তৎপরতায় রয়েছেন সরকারের একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপি এমনকি অন্য দলের নেতারাও। অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারের মন্ত্রী, এমপি, প্রভাবশালী নেতা ও সরকারি দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মালিকানাধীন বাস কোম্পানিগুলোই এখন রাজধানীতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে। জেলা-উপজেলার সড়ক পরিবহনেও তাদের তাণ্ডব। রাজনৈতিক নেতাদের তৎপরতায় মিলছে যানবাহনের সহজ রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও রুট পারমিট। বিভিন্ন রুটে আধিপত্য বিস্তারের কাজ তারাই করছেন।

সূত্র জানায়, নিয়ন্ত্রকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কোনো সরকারই পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্য এখন পর্যন্ত দূর করতে পারেনি। ফলে জনদুর্ভোগ-চাঁদাবাজি-ভাড়া সন্ত্রাস অব্যাহত রয়েছে। সরকারের দায়িত্বে থাকায় মন্ত্রী-এমপিদের অনেকে পরিবহন ব্যবসায় এখন প্রত্যক্ষভাবে নিজের নাম রাখছেন না। পরিবারের সদস্যদের নামে পরিবহন ব্যবসায় জড়িয়েছেন নেতারা। সরকারের একাধিক মন্ত্রী-এমপির গাড়ি চলে রাজধানীর রাজপথে। একজন প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির নেতার গাড়ি চলে ঢাকার বাইরে। অপর একজন মন্ত্রীর ভাইয়ের গাড়ি চলে শামীম এন্টারপ্রাইজ নামে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে। পিরোজপুরের এক এমপির ভাইয়ের বাস চলাচল করে ওই জেলার বিভিন্ন রুটে। সাধারণ পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিবহন সেক্টরে সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশই বাড়ছে। বরিশালের এক আলোচিত নেতার ভাইয়ের পরিবহন ব্যবসা গাবতলীতে। পরিবহন সেক্টরের আলোচিত এক নেতা এবং মন্ত্রীর ভাই ও শ্যালকের মালিকানায় রয়েছে একাধিক পরিবহনের ব্যবসা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক এমপি মির্জা আব্বাসের মালিকানা ছিল ‘ঢাকা পরিবহনে’। সেই পরিবহনের ব্যবসা এখন ভালো নয়। বিএনপির অপর স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক এমপি জি এম সিরাজ ‘এসআর পরিবহনের’ মালিক। ‘হানিফ পরিবহনের’ মালিক সাভারের বিএনপি নেতা কফিল উদ্দিন ও তার ভাই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অন্যতম আসামি মোহাম্মদ হানিফ। বিএনপির আরেক সাবেক এমপি এস এ খালেকের মালিকানাধীন পরিবহন খালেক এন্টারপ্রাইজ।

এদিকে মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টিও পরিবহন ব্যবসায় পিছিয়ে নেই। জাতীয় পার্টির রংপুরের নেতা প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা সঞ্চিতা পরিবহনের মালিক। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির (মালিকদের সংগঠন) সভাপতিও তিনি। জাতীয় পার্টির অপর নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ এস এ পরিবহনের মালিক। ঢাকা-ফেনী পথে চলাচলকারী স্টারলাইন পরিবহনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি তিনি নৌ পরিবহনেও ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন।

সূত্র জানায়, বর্তমানে পরিবহন সেক্টরে রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব বাড়লেও এ প্রক্রিয়া চলে আসছে অনেক দিন থেকে। বিএনপি সরকারের আমলে তৎকালীন মন্ত্রী ও বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস পরিবহন খাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক ছিলেন। তার মালিকানাধীন বাস ছিল ঢাকা পরিবহন ও ঢাকা-কিশোরগঞ্জ গন্তব্যের শৌখিন পরিবহন। এ সময় মির্জা আব্বাসের লোকজন অপর একজন পরিবহন মালিক খোন্দকার এনায়েত উল্লাহর বাস ময়মনসিংহে দীর্ঘদিন আটকে রেখেছিলেন। খোন্দকার এনায়েত উল্লাহ বর্তমান সরকারের আমলে পরিবহন সেক্টরের অন্যতম নিয়ন্ত্রক ও বাস মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক। ইতিমধ্যে তিনি সরকারি দলের একটি ইউনিটের নেতৃত্বও পেয়েছেন। পরিবহন খাতের ভাড়া নির্ধারণ থেকে শুরু করে এ খাতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আইন প্রণয়ন ও সংশোধনসহ সরকারি সব বৈঠকে তার উপস্থিতি দেখা যায়। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে তার ‘এনা পরিবহন’ নামের বাস চলে।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রীর মালিকানাধীন একটি পরিবহন আজিমপুর-আবদুল্লাহপুর রুটে চলাচল করত। এ রুটে অন্য কোনো বাসের রুট পারমিট দেওয়া হতো না। সেই বাস সার্ভিস গত বছরের মধ্যভাগে বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত অনেকে ঢাকায় গণপরিবহন ব্যবসায় যুক্ত থাকলেও তারা অনেকটা কোণঠাসা। এদিকে মিরপুর-সদরঘাট রুটে চলাচলকারী বিহঙ্গ পরিবহন সরকারি দলের একজন এমপি ও একটি সহযোগী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের মালিকানায় রয়েছে। এ রুটে আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিল ইউনাইটেড কোম্পানির বাস। রুট কমিটির রীতি অনুযায়ী একই যাত্রা ও গন্তব্যে একাধিক কোম্পানিকে অনুমোদন না দেওয়ার কথা থাকলেও বিহঙ্গ পরিবহনের ক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হয়নি। শুধু রাজধানীতেই নয়, প্রতিটি জেলা-উপজেলায়ও মালিক-শ্রমিক সমিতির অধিকাংশ নেতা আওয়ামী লীগ-বিএনপি, জাতীয় পার্টি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক দলের নেতারাই পরিবহন সেক্টরে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সূত্র জানায়, রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া রুট পারমিটও পাওয়া যায় না। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া যেসব নতুন বাস রুটের অনুমতি পেয়েছে, সেগুলোকে বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করতে হয়েছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট মালিকদের পেছনে। এ খাতের প্রভাবশালীরা নিজে বা আত্মীয়স্বজনের নামে দু-একটা বাস কিনে প্রথমে একটি কোম্পানি খোলেন। এরপর বিভিন্ন ব্যক্তির বাস ওই কোম্পানির অধীনে চালাতে নিয়ে আসেন। বিনিময়ে কোম্পানির উদ্যোক্তারা প্রতিটি বাস থেকে চাঁদা আদায় করেন। এটাকে তারা নাম দিয়েছেন জিপি (গেট পাস)। কোম্পানির খরচের নামে এই জিপি আদায় করা হয়। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা এ খাতের নিয়ন্ত্রণ করেন।

এ পরিস্থিতিতে প্রকৃত পরিবহন ব্যবসায়ীদের অনেকেই তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ ক্ষমতাসীন নেতাদের হাতে ব্যবসা তুলে দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন। রাজনৈতিক নেতাদের তৎপরতায় পরিবহন ব্যবসার লাভ-ক্ষতি নির্ভরশীল হওয়ায় অনেকেই এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। সাধারণ পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন সেক্টরের রাজনৈতিক নেতাদের কারণে সরকারই এ খাতটি সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাদের দাবির কারণে বিভিন্ন রুট থেকে সরকারি বিআরটিসির বাসও তুলে নিতে হচ্ছে। সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত বিপক্ষে গেলেই এ খাতকে জিম্মি করছেন তারা। এমনকি পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিচ্ছেন। এ অবস্থায় পরিবহন খাতে নেওয়া সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের গণপরিবহনগুলো আইনকানুন কিছুই তোয়াক্কা করে না। আর এখানে মালিকদের এমন একটা শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে যারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়ে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, পরিবহন মালিকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে এ সেক্টরে অনিয়ম বাড়ছে। রাজনৈতিক নেতারা পরিবহন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ায় এ খাতে নিয়মনীতি কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত