প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খালেদা জিয়ার সঙ্গেও দেখা করেছিলেন দুই ষড়যন্ত্রকারী!

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যা চেষ্টার পরিকল্পনায় জড়িত দুই ষড়যন্ত্রকারী মিল্টন ভূঁইয়া ও মোহাম্মদ উল্লাহ মামুন বিএনপি চেয়ারপার্সনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাদের দেখা করার ব্যবস্থা করে দেন মামলার অন্যতম আসামি শফিক রেহমান। ২০১২ সালে মিল্টন ভূঁইয়া ও ২০১৩ সালে মোহাম্মদ উল্লাহ গুলশান কার্যালয়ে দেখা করেন। ওই সময় এ দু’জনকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে খালেদা জিয়ার কাছে উপস্থাপন করা হয়। বলা হয়, তারা দলের জন্য কাজ করছেন। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসাইমেন্ট নিয়ে আছেন। দল ক্ষমতায় এলে তাদের ভালো পদ দেয়ার বিষয়ে খালেদা জিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এই দুই ব্যক্তি জয়কে হত্যার উদ্দেশে অপহরণের পরিকল্পনায় জড়িত ষড়যন্ত্রকারী চক্রের অন্যতম। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে।

মামলার সাক্ষীদের জবানবন্দি, জব্দকৃত তথ্যাদি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সজীব ওয়াজেদ জয়ের ব্যক্তিগত তথ্য এফবিআইএর সদস্য রবার্ট লাস্টিকের কাছ থেকে ঘুষের বিনিময়ে আসামি রিজভী আহমেদ সিজার গ্রহণ করায় তাকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত শাস্তি প্রদান করেছে। তবে ভিকটিমের তথ্য সংগ্রহের পর অপহরণ করে হতাচেষ্টা ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত বিষয়ে মূল পরিকল্পনার সঙ্গে বাংলাদেশি আরো কয়েক ব্যক্তি জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের মামলায় কোনো চার্জ গঠন করা হয়নি।

এ বিষয়ে মামলার অন্যতম সাক্ষী এফবিআই এজেন্ট কারউইন জন এবং ওআইজির (অফিস অব ইন্সপেক্টর জেনারেল) কর্মকর্তার তথ্য হচ্ছে- তাদের তদন্তের বিষয় ছিল এফবিআইয়ের কর্মকর্তাদের আভ্যন্তরীণ দুর্নীতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা। তাই তাদের তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে নিজস্ব বিষয়টিই প্রাধান্য দিয়েছিলেন তারা। আর সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণপূর্বক হত্যাচেষ্টা সংক্রান্ত ঘটনাটি তাদের অধিক্ষেত্রের বাইরে হওয়ায় সেটি বিচারিক কার্যক্রমের আওতায় আসেনি বলে ওআইজির কর্মকর্তারা মতামত প্রকাশ করেন।

এদিকে মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সালের যে কোনো সময় বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের সহসভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনসহ বিএনপি ও দলটির নেতৃত্বাধীন জোটভুক্ত অন্যান্য দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা (আসামি) রাজধানীর পল্টনের জাসাস কার্যালয়ে, আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় একত্রিত হয়ে যোগসাজশে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে আমেরিকায় অপহরণ করে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন। ওই ঘটনায় ২০১৫ সালের ৪ আগস্ট ডিবির পরিদর্শক ফজলুর রহমান পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এ মামলায় ২০ ফেব্রুয়ারি পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

অভিযুক্তরা হলেন- মোহাম্মদ উল্লাহ মামুন ওরফে আহমদ উল্লাহ মামুন, রিজভী আহমেদ সিজার, মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভূঁইয়া ওরফে এমআর ভূঁইয়া ওরফে মিল্টন ভূঁইয়া, শফিক রেহমান ও মাহমুদুর রহমান। ২০১১ সাল থেকে জয়কে হত্যার পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দণ্ডিত বিএনপি নেতার ছেলে রিজভী আহমেদ সিজার ও মাহমুদুর রহমানের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পুত্রের ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান হয়েছিল। ওই সময় গ্রেফতার সিজার তার বন্ধু মিল্টন ভূঁইয়ার মাধ্যমে কিছু তথ্য ঢাকায় মাহমুদুরকে পাঠিয়েছিলেন। আর ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে শফিক রেহমান এ চক্রের সঙ্গে বৈঠক করেন।

চার্জশিটের তথ্য অনুযায়ী, আসামি মামুন, সিজার ও মিল্টন ভূঁইয়া বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের জাসাসের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্নস্থানে জয়কে হত্যার উদ্দেশে একাধিক বৈঠক করেন শফিক রেহমান ও মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে। শফিক রেহমানের নির্দেশে আসামি মিল্টন ভূঁইয়া ভিকটিম জয়কে হত্যার উদ্দেশে ভিকটিমের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের জন্য আসামি সিজারকে পরামর্শ ও অর্থ প্রদান করে সহায়তা করেছেন। আসামি সিজার শফিক রেহমানের নির্দেশে মামুন ও মাহমুদুর রহমানের সহায়তা ও পরামর্শে এফবিআই এজেন্টকে টাকা দেন এবং অপহরণ পূর্বক হত্যার জন্য নিয়োগ করেন। অভিযুক্ত সিজার বিভিন্ন সময় শফিক রেহমান, মাহমুদুর রহমান এবং মিল্টনকে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান করেন। গোয়েন্দা পুলিশ এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অভিযানকালে শফিক রেহমানের কাছ থেকে উদ্ধারও করেছে।

গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, এ মামলায় ভিকটিম সজীব ওয়াজেদ জয়, মামলার বাদী ডিবির পরিদর্শক ফজলুর রহমানসহ ১৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। সাক্ষীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অন্যরা হলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ফেরদৌস আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎকালীন মিনিস্টার কনস্যুলার সামসুল আলম চৌধুরী, এফবিআইয়ের সদস্য মিস্টার কারউইন জন, জন সি হারলি, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন ও উপকমিশনার (ডিসি-দক্ষিণ) মো. শহিদুল্লাহ।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির ডিসি মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ‘চক্রান্তকারীরা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জয়কে (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা) হত্যার জন্য সব ফাঁদ তৈরি করেছিল। তাকে হত্যা করলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অপূরণীয় ক্ষতি এবং ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হতো। এতে বিশেষগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ হাসিল হতো’। তিনি বলেন, অভিযুক্তরা জয়কে হত্যার জন্য অপহরণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ ছাড়া ঘুষের বিনিময়ে এফবিআইয়ের কাছে সংরক্ষিত ব্যক্তিগত তথ্য হিসেবে আবাসনস্থল, গাড়ি, ফোন নম্বর এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে।

এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এ মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে মোহাম্মদ উল্লাহ মামুন ও মিল্টন ভূঁইয়া গুলশানে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। তাদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন শফিক রেহমান। তিনিই এ দু’জনকে খালেদা জিয়ার কাছে নিয়ে যান। দলের জন্য ভালো কাজ করছে বলে তাদের ভালো পদ দিতে সুপারিশ করেন শফিক রেহমান। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে শফিক রেহমান এসব তথ্য দেন, যা মামলার তদন্তের স্বার্থে আগে প্রকাশ করা হয়নি।

আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতামতে উল্লেখ করেছেন যে, সার্বিক তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যাদিসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন, বাদী ও সাক্ষীদের তথ্য, গ্রেফতার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য, জব্দকৃত আলামত ও যুক্তরাষ্ট্রের মামলা পর্যালোচনা, আসামি শফিক রেহমান ও মিল্টন ভূঁইয়ার পাসপোর্টে ভ্রমণ বিবরণী ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় আসামিরা জয়কে অপহরণ পূর্বক হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্র করেছে বলে প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

তদন্তে নিয়োজিতরা বলছেন, জয়কে হত্যাচেষ্টায় যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল সেটি চক্রান্তকারীদের দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনার অংশ। এজন্য যে, আগামীতে তিনি এদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারেন। তাই তাকে সরিয়ে দিতেই আসামিরা একে অপরের সঙ্গে পরামর্শ করে তাকে হত্যাচেষ্টায় ষড়যন্ত্র করেন। এ সংক্রান্ত উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্ত সংশিষ্ট সূত্র জানায়, মার্কিন প্রবাসী মিল্টনের সঙ্গে শফিক রেহমানের একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। রেহমান তাকে কয়েক দফা ঢাকাতেও ডেকে নেন এবং জয়কে হত্যার পরিকল্পনা সফল হলে আগামীতে মার্কিন এই প্রবাসীকে ভালো পদ দেয়ার কথা বলেন। এ হত্যা পরিকল্পনার আগে সজীব ওয়াজেদ জয়ের গতিবিধি, তার অবস্থানের ছক, কোথায় কখন কিভাবে হত্যা করা হবে, এ হত্যায় কে থাকবে- এসব বিষয় নিয়ে যে ছক হয়েছিল সেই ছক শফিক রেহমানের কাছ থেকে উদ্ধারও করেছেন গোয়েন্দারা। মানবকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত