প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোটা সুবিধা না সমস্যা

ডেস্ক রিপোর্ট : সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সংস্কারের ৫ দফা দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে চাকরিচ্ছু সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। অবস্থান কর্মসূচিতে তারা বিভিন্ন পোস্টার-ফেস্টুনে ‘ইহা কোটা নয়, বৈষম্য’, ‘কোটা দিয়ে কামলা নয়, মেধা দিয়ে আমলা চাই,’ ‘১০% বেশি কোটা নয়’, স্বাধীনতার মূলমন্ত্র কোটা প্রথার সংস্কার কর,’ বিভিন্ন লেখা প্রদর্শন করেন।

রোববার বেলা ১১টা থেকে পাবলিক লাইব্রেরির সম্মুখে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। শাহবাগ থানা-পুলিশ ওই স্থান থেকে কয়েকবার সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারির মানববন্ধন থেকে সারা দেশে ২৫ ফেব্রুয়ারি মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা শাহবাগে অবস্থান গ্রহণ করেন।

অবস্থানের শুরুতে চাকরিচ্ছু এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল নিয়ে শাহবাগে আসেন। একই সময়ে শাহবাগে অবস্থিত পাবলিক লাইব্রেরি থেকে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দেন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চলে।

আন্দোলনকারীদের ৫ দাবি
আন্দোলনকারীরা ৫ দফা দাবি করেছেন। এগুলো হচ্ছে- কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে ৫৬% থেকে ১০%-এ নিয়ে আসা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে শূন্য থাকা পদগুলোয় মেধায় নিয়োগ দিতে হবে, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা নয়, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সবার জন্য অভিন্ন বয়স সীমা চাই, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার নয়।

অবস্থান কর্মসূচি শেষে ৪ সদস্যের প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে স্মারকলিপি দেবেন বলে জানান। আগামী ৩ মার্চের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ৪ মার্চ কালো ব্যাচ ধারণ এবং অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।
জানা গেছে, কোটার প্রার্থী না পাওয়ায় ২৮তম বিসিএসে ৮১৩ জনের পদ শূন্য ছিল। ২৯তম-তে ৭৯২ জন, ৩০তম-তে ৭৮৪ জন, ৩১তম-তে ৭৭৩ জন, ৩৫তম-তে ৩৩৮ জনের পদ শূন্য ছিল। এ শূন্য পদ না রেখে সেখানে মেধাক্রম থেকে প্রার্থী নিয়োগের দাবি জানান তিনি।

কোটা নিয়ে গবেষণা ও সুপারিশ
বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার ওপর ২০০৮ সালে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান এবং সাবেক সচিব এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ একটি গবেষণা করেন। ৬১ পৃষ্ঠার ওই গবেষণা প্রতিবেদনে কোটা কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়। যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

কোটার মারপ্যাঁচ
বর্তমানে দেশে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরি বিশেষ করে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা প্রচলিত। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী কোটায় ১০, জেলা কোটা ১০, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পাঁচ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে এক শতাংশ কোটা। বাদ-বাকি ৪৪ শতাংশ আসনের জন্য ফাইট দিচ্ছে সংখ্যাগুরু বিপুলসংখ্যক মেধাবী। সংখ্যাগুরু সাধারণ চাকরিপ্রার্থী এবং সংখ্যালঘু কোটাধারীদের মধ্যে এত বড় বৈষম্য সম্ভবত পৃথিবীর আর কোনো দেশে নেই।

উন্নয়নশীল দেশগুলোয় কোটা পদ্ধতি বরাদ্দ দেওয়া হয় সাধারণত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। আমাদের দেশেও কোটা পদ্ধতি চালু করার বিষয়ে যখন আলোচনা হয়েছিল তখন এ বিষয়টিই সামনে রাখা হয়েছিল। কিন্তু কোটা পদ্ধতি চালু করার সময় সেটির প্রতিফলন ঘটেনি।

পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজার ১৫ জন। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬১২ জন প্রতিবন্ধী। শতকরা হিসাবে দেশের মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ১০ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, যাদের জন্য কোটা বরাদ্দ রয়েছে ৫ শতাংশ। আর মোট জনগোষ্ঠীর ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর জন্য কোটা বরাদ্দ ১ শতাংশ।

অবাক বিষয় হচ্ছে- মুক্তিযোদ্ধা পোষ্যদের হার মোট জনগোষ্ঠীর দশমিক ১৩ শতাংশ, অথচ তাদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও মুক্তিযোদ্ধা পোষ্য মিলিয়ে মোট জনগোষ্ঠীর ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ মানুষের জন্য কোটা বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ শতাংশ। ৯৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী ৬৪ ভাগ আসনের জন্য লড়াই করছে। অর্থাৎ সরকার চাকরির ৩৬ শতাংশ সংরক্ষিত মাত্র আড়াই ভাগ জনগোষ্ঠীর জন্য, আর ৯৭ ভাগেরও বেশি মানুষের জন্য সংরক্ষিত মাত্র ৬৪ ভাগ চাকরি। এ ৬৪ ভাগের মধ্যেও একটি অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে জেলা কোটা, নারী কোটাধারীদের জন্য। কোটা পদ্ধতির এ বৈষম্যের ফলে মেধাবীরা কোটাধারীদের কাছে মার খাচ্ছে পদে পদে।

জানা গেছে, দুই হাজার ২৪টি শূন্যপদ পূরণের জন্য ৩৮তম বিসিএসের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। এতে সাধারণ ক্যাডারে ৫২০ জন, প্রফেশনাল/টেকনিক্যাল ক্যাডারে ৫৪৯ জন, শিক্ষা ক্যাডারে ৯৫৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা, জেলা কোটা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা, নারী কোটা ও প্রতিবন্ধী কোটায় মোট ৫৬ শতাংশ হারে সাধারণ ক্যাডারে ২৯১ জন, প্রফেশনাল/টেকনিক্যাল ক্যাডারে ৩০৭ জন, শিক্ষা ক্যাডারে ৫৩৪ জন নিয়োগ পাবে কোটাধারীরা। সাধারণ ক্যাডারে কোটার বাইরে থাকা সংখ্যাগুরু আবেদনকারীদের মধ্য থেকে নিয়োগ পাবেন মাত্র ২২৯ জন। কোটার বাইরে থেকে কেউ ২৩০তম হলেও তিনি নিয়োগ পাবেন না। অথচ কোটাধারী একজন প্রার্থী মেধাতালিকায় ৫০০০তম হয়েও কোটার কল্যাণে নিয়োগ পেয়ে যেতে পারেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, পৃথিবীর বহু দেশেই কোটা ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে কোটাধারীদের আগেই একটা নম্বর দেওয়া হয়। এরপর অন্য সাধারণ প্রার্থীদের সঙ্গে কোটাধারীরা পরীক্ষায় প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। আর ভারততে তো কোটাকে একটা যৌক্তিক রূপ দেওয়া হয়েছে। সেখানে কোটা আছে, তবে তা উপার্জনের ভিত্তিতে। উচ্চ আয়ের মানুষরা কোটার সুযোগ ভোগ করতে পারেন না। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কেউ যদি উচ্চ আয়ের পরিবারের হয়ে থাকেন, তবুও তিনি কোটার সুবিধা পাবেন না।

পিএসসির গত কয়েক বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও ফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২৮তম বিসিএসের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে। দুই বছর পর ২০১০ সালে এর ফল প্রকাশ হয়। সাধারণ ক্যাডারে মোট ৬৫৮ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি। এর মধ্যে ৩১০ জনকে মেধায় আর ৩৪৮ জনকে কোটায় নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ২৯তম বিসিএসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১১ সালে এর ফল প্রকাশ হয়। এতে সাধারণ ক্যাডারে ৪১৫ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে ২০১ জনকে মেধায় আর ২১৪ জনকে কোটায় নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

৩০তম বিসিএস প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১০ সালে। ২০১১ সালের ২ নভেম্বর এর ফল প্রকাশ হয়। এতে মোট ৭৬৫ জনকে নিয়োগের সুপারিশ ছিল। এর মধ্যে ৩৫৮ জনকে মেধায় আর ৪০৭ জনকে কোটা থেকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।
৩১তম বিসিএস প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১১ সালে। ২০১২ সালের ৮ জুলাই এর ফল প্রকাশ হয়। সাধারণ ক্যাডারে ৭৬১ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি। এর মধ্যে ৩৫৫ জনকে মেধায় আর ৪০৬ জনকে কোটায় নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

শূন্য থাকছে পদ
পিএসসির বার্ষিক প্রতিবেদন ও ফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিভিন্ন বিসিএসে কোটাধারীদের না পাওয়ায় শূন্য রাখা হচ্ছে পদ। অথচ শত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়েও ক্যাডার হতে পারছেন না মেধাবীরা। ২৮তম বিসিএসে কোটার বিপরীতে প্রার্থী না পাওয়ায় ৮১৩টি পদ শূন্য রাখে পিএসসি। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ৬২৮টি, মহিলা কোটায় ৪৫ ও উপজাতি কোটায় ১৪০টি পদ শূন্য ছিল।

২৯তম বিসিএসে পদ শূন্য ছিল ৭৯২টি। এর মধ্যে ৫৩৮টি মুক্তিযোদ্ধা, ৮১টি মহিলা ও ১১১টি উপজাতি কোটা। ৩০তম বিসিএসে ৬১৩টি মুক্তিযোদ্ধা, ৩২টি মহিলা ও ১৩৯টি উপজাতিসহ কোটার ৭৮৪টি পদ শূন্য ছিল। ৩১তম বিসিএসে ৫৫০টি মুক্তিযোদ্ধা, ৫৪টি মহিলা ও ১২৯টি উপজাতিসহ কোটার ৭৭৩টি পদ শূন্য ছিল।

কোটার শূন্য পদগুলো পূরণ করতে ৩২তম বিশেষ বিসিএস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি। এতে শুধু মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা ও আদিবাসী কোটাধারীদের আবেদনের সুযোগ রাখা হয়। ওই বিসিএসেও যোগ্য প্রার্থীর অভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটার ৮১৭টি, মহিলা ১০টি ও উপজাতির ২৯৮টিসহ মোট এক হাজার ১২৫টি পদ শূন্য রাখতে হয়।
শেষ পর্যন্ত ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে এ পদগুলো পূরণের সিদ্ধান্ত হয়। অথচ ৩২তম বিসিএসে ভিন্ন কোটায় উত্তীর্ণ হওয়ার কারণে ৯১২ জনই চাকরির সুযোগ পাননি।

সংবিধানে যা বলা আছে
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯ (১) ধারায় বলা আছে- ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ ২ ধারায় বলা আছে- ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’ পরিবর্তন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত