প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অনন্য সেবা, সঙ্গে আর্থিক সহায়তাও পান প্রসূতিরা

ডেস্ক রিপোর্ট : যশোরের চৌগাছায় ১৯৮৪ সালে একটি টালিঘরে চালু হয় রুরাল ডিসপেনসারি। কিছুদিন পর ডা. হুমায়ুন মোল্লার নেতৃত্বে যোগ দেন একদল তরুণ চিকিৎসক। এর মধ্যেই একদিন জটিল সমস্যা নিয়ে আসেন এক প্রসূতি। প্রশিক্ষণ না থাকায় চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি চিকিৎসকরা। সেই চিকিৎসকের একজন ডা. ইমদাদুল হক। পরবর্তীতে তিনি নড়াইলের লোহাগড়ায় বদলি হয়ে যান। সেখানেও মুখোমুখি হন একই সমস্যার। রোগী বাঁচাতে না পারার এ যন্ত্রণা থেকে ডা. ইমদাদ ঢাকা থেকে মা ও শিশুস্বাস্থ্য এবং প্রসূতিবিদ্যার ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৯৫ সালে তিনি আবার ফিরে যান চৌগাছায়। ততদিনে রুরাল ডিসপেনসারি উন্নীত হয়েছে আধুনিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এরপর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার আব্দুল মান্নান, ডা. আব্দুর রাজ্জাক ও ডা. সেলিনা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে একটি টিম গঠন করেন ১৯৯৬ সালে। এ চার চিকিৎসকের যৌথ পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টায় বদলে যেতে থাকে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবার ধরন।

চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সার্বক্ষণিক জরুরি সেবার পাশাপাশি এখন বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগেও সেবা দেয়া হচ্ছে। চালু আছে ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা, টিকাদান ও প্রসবকালীন সেবা, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ ও জলাতঙ্ক রোগ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিশিক্ষা, প্যাথলজি ও এক্স-রে কার্যক্রম, ম্যালেরিয়া ও এইডস রোগ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমও। তবে মাতৃস্বাস্থ্য সেবার জন্যই হাসপাতালটি দেশসেরা। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে দৈনিক দেড় শতাধিক গর্ভবতী নারী স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেন।

প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চালু করেছে বিশেষ এক কর্মসূচি— মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম। এর আওতায় গর্ভবতী মায়েরা বিনামূল্যে সেবা পান। পাশাপাশি যাতায়াত ও মাতৃত্বকালীন পরবতী সময়ে শিশুর পুষ্টিকর খাবারের জন্য আড়াই হাজার টাকাও পেয়ে থাকেন দরিদ্র নারীরা। গত পাঁচ বছরে প্রায় ১০ হাজার প্রসূতিকে এ সুবিধা দিয়েছে হাসপাতালটি।

চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন চৌগাছার বর্ণি গ্রামের শাহিনুর ইসলামের স্ত্রী ফাতেমা বেগম। তিনি জানান, তার স্বামী একজন হতদরিদ্র। এ হাসপাতালে গিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং যাতায়াত বাবদ প্রতিবার ১০০ টাকা করে পেয়েছি।

নারী ও শিশুবান্ধব নানা পদক্ষেপের ফলে চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হারও জাতীয় পর্যায়ের তুলনায় অনেক কম। জাতীয় পর্যায়ে শিশুমৃত্যুর হার যেখানে প্রতি হাজারে ৪৬, সেখানে চৌগাছায় এ হার ২০-এর কম। আবার মাতৃমৃত্যুর হার জাতীয় পর্যায়ে প্রতি লাখে ১৭৬ জন হলেও চৌগাছায় ৯০।

হাসপাতালটির কারণে চৌগাছার প্রসূতিদের মধ্যে হাসপাতালে প্রসবের হারও বেশি। উপজেলার ৭২ শতাংশ প্রসবই হয় হাসপাতালে। এ কারণে এখানে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কম বলে জানান চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. সেলিনা বেগম। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সাল থেকে আমরা প্রসবপূর্ব সেবার ওপর অনেক জোর দিয়েছি। সে কারণে আগেই চিহ্নিত করতে পারি কারা ঝুঁকির মধ্যে আছে। সে অনুযায়ী সেবা দেয়া হয় বলে এখানে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার অনেক কম। এখানে প্রতি মাসে ২০০ জন রোগী স্বাভাবিক এবং ৭০ থেকে ৮০ জনের সিজারিয়ান প্রসব হয়।

কমিউনিটি পার্টিসিপেশনকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ডা. সেলিনা বেগম জানান, হাসপাতালের জন্য সরকারের সমর্থন সবসময় পর্যাপ্ত নয়। নিজেদের সক্ষমতা ও কমিউনিটি পার্টিসিপেশনের মাধ্যমে আমরা আমাদের সমস্যার সমাধান করি। উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যুতের সমস্যা অনেক বেশি। সে কারণে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ এখানে আইপিএস দিয়েছেন। সবার সাহায্য নিয়ে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা রোগীদের উন্নত সেবা দেয়ার চেষ্টা করি।

অনন্য সেবার স্বীকৃতিও এরই মধ্যে পেয়েছে হাসপাতালটি। ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সেরা হাসপাতালের যে তালিকা করেছে, তাতে উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। শুধু উপজেলা পর্যায়ে নয়, সার্বিকভাবেই সবচেয়ে বেশি স্কোর এ হাসপাতালের। ৩০০-এর মধ্যে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্কোর ২৪০ দশমিক ৫১।

হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ আওরঙ্গজেব বলেন, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে অধিকাংশ সময়ই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন। এক্ষেত্রে প্রসূতিসেবায় ভর্তি রোগীর হার সবসময় বেশি। ৬০ থেকে ৭০ জন প্রসূতি রোগী ভর্তি থাকেন। এছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী সেবা নেন এ হাসপাতাল থেকে।

চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে মডেল হাসপাতালে উন্নীত করতে ভূমিকা রাখা ডা. ইমদাদুল হক বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে মডেল হাসপাতালে উন্নীত করতে গঠিত টিম শিশু ও মাতৃসেবা কীভাবে উন্নত করা যায়, তার একটি উপায় বের করে। চারটি বিভাগে গর্ভবতী মা, শিশু, মহিলা ও পুরুষের স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়। মাতৃমৃত্যু কমাতে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা গড়ে তোলা হয়। এছাড়া গ্রামীণ পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী নার্স নিয়োগ দেয়া হয়। চৌগাছায় অবস্থানরত চিকিৎসকদের অর্থায়নে ওই নার্সদের বেতন দেয়া হতো। আমরা সে সময় চৌগাছা এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য, ইমাম ও সমাজপতিদের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রচার চালাতে সক্ষম হয়েছিলাম। মানুষ যখন জানতে পেরেছে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা তাদের অধিকার, তখন থেকে উপজেলার কোনো মা আর বাড়িতে সন্তান প্রসব করেননি। ফলে মাতৃমৃত্যু কমেছে।

বর্তমানে প্রয়োজনীয় জনবল এবং যন্ত্রপাতির অভাবে দেশসেরা এ হাসপাতালের কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল কাঠামো অনুযায়ী নয়জন বিশেষজ্ঞ এবং ২১ জন সাধারণ চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আছেন মাত্র ১২ জন চিকিৎসক। প্রায় ছয় মাস ধরে হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে।

যশোরের সিভিল সার্জন ডাক্তার দিলীপ কুমার জানান, চৌগাছা হাসপাতালটি অনেক আগে থেকেই মায়েদের ও পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুদের আন্তরিকতার সঙ্গে চিকিৎসা দিয়ে আসছে। এ উপজেলার মানুষের সঙ্গে হাসপাতালটির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যে কারণে তারা সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিতে যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতায় উপজেলা পর্যায়ে চৌগাছা হাসপাতাল দেশসেরা হয়েছে। বর্তমানে যে লোকবল সংকট রয়েছে, সে ব্যাপারে আমরা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। তথ্যসূত্র : বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত