প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার: বিক্ষোভে শরিক ছাত্রলীগও

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে বিক্ষোভ করেছে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী।

‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’র ব্যানারে রোববার রাস্তায় নামে হাজার হাজার তরুণ।

তবে অবাক করার মতো ঘটনা হলো এর আগে কোটাবিরোধী আন্দোলনে যারা বাধা দিয়েছিল সেই ছাত্রলীগের অনেক পদধারী নেতাকেও দেখা গেছে এই দাবির পক্ষে রাস্তায় নামতে।

সকাল ১১টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থী এবং সাধারণ চাকরিপ্রার্থী শাহবাগে জড়ো হতে থাকেন। এ সময় তারা কোটা সংস্কারের দাবিতে লেখা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন এবং ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন।

কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
সারাদেশে বিক্ষোভ:
অভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাষানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গুরুদয়াল কলেজ, কিশোরগঞ্জ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া কলেজ, কুমিল্লা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে।

পাঁচ দফা দাবি:
বিক্ষোভকারীরা কোটা সংস্কারের পক্ষে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হচ্ছে, কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে এ নিয়ে আসা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে শূন্য থাকা পদগুলো মেধা থেকে নিয়োগ দেওয়া, কোটার কোন ধরনের বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা না নেওয়া, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সবার জন্য অভিন্ন বয়স সীমা নির্ধারণ এবং নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধার সুযোগ একাধিকবার না দেওয়া।

বিক্ষোভে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বিক্ষোভকারীরা বলেন, বর্তমান কোটা ব্যবস্থায় ১ দশমিক ১০ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫ ভাগ, ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর জন্য ১ ভাগ এবং শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পোষ্যদের (সন্তান ও নাতী-নাতনী) জন্য ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত আছে ৩৬ শতাংশ কোটা। সব মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা। আর বাকী ৪৪ শতাংশ দেওয়া হচ্ছে সারাদেশের লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীদের।

‘‘এই ব্যবস্থা দেশের বর্তমান জনসংখ্যার অনুপাত এবং বাস্তব অবস্থার বিচারে অন্যায্য। তাই আমরা বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে কমিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে শূন্য থাকা পদগুলো মেধা থেকে নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে তারা বলেন, বিভিন্ন সরকারি নিয়োগে কোটায় সংরক্ষিত পদগুলো পুরণ না হওয়া বিশাল একটি অংশ ফাঁকা থাকছে। কোটার বিপরীতে এই বিশাল সংখ্যক পদ ফাঁকা থাকায় দেশের বেকার সমস্যার সমাধান হচ্ছে না এবং জনপ্রশাসনে গতিশীলতা কমে যাচ্ছে। তাই কোটার বিপরীতে শূন্য থাকা পদগুলোতে মেধা থেকে থেকে নিয়োগ দেওয়া হোক।

কোটার কোনো ধরনের বিশেষ পরীক্ষা না নেওয়ার দাবি জানিয়ে লিখিত বক্তব্যে চাকরি প্রত্যাশীরা বলেন, ৫৬ শতাংশ কোটা থাকায় সাধারণ চাকরি প্রত্যাশীরা এমনিতেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। আর ওপর বিভিন্ন সময়ে কোটায় বিশেষ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

কয়েকটি বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষার উদাহরণ দিয়ে তারা বলেন, ৩২তম বিসিএস, ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক নিয়োগ এবং ২০১৮ সালের সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শুধু কোটাধারী প্রার্থীদের নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।

 

অভিন্ন বয়সসীমা:
চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে তারা বলেন, বর্তমানে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের বয়সসীমা ৩০ বছর এবং নির্দিষ্ট কিছু কোটার ক্ষেত্রে সেটা ৩২ বছর। ফলে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছেন।

নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধার সুযোগ একাধিকবার না দেওয়ার সর্বশেষ দাবিতে তারা বলেন, একবার নির্দিষ্ট কোটা সুবিধায় চাকরি নিয়ে পুনরায় অন্য চাকরিতে যেতে চাইলে মেধার ভিত্তিতে যেতে হবে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে চাকরিপ্রার্থীরা বড় ধরনের আন্দোলনে নামে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে। তবে রাজধানীর শাহবাগে অনুষ্ঠিত সেই আন্দোলন ছাত্রলীগের বাধার মুখে ভেস্তে যায়। এবারের আন্দোলনে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। ছাত্রলীগ বাধাতো দেয়ইনি, উল্টো অনেক পদধারী নেতাকেও দেখা যাচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে আন্দোলনে শামিল হতে। রোববারের আন্দোলনে শাহবাগে দেখা যায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অনেক পদধারী নেতাকেও।

তবে এ আন্দোলনের ব্যাপারে ছাত্রলীগ এখন নিজেদের অবস্থান না জানানোয় আন্দোলনে আসা এইসব নেতা নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-সম্পদক পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরে কোটা ব্যবস্থা থাকাটাই অযৌক্তিক। কিন্তু আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোটা ব্যবস্থা বাতিল যেহেতু অসম্ভব তাই এর যৌক্তিক সংস্কার জরুরি। সংবিধান অনুসারে যারা সত্যিকার অর্থেই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী তাদেরকে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডে বিচার করে কোটা সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।

সংস্কারের দাবির পক্ষে সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরাতো চাকরি চাচ্ছে না, তারা কেবল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতে বলছে। তাদের এই দাবি অবশ্যই যৌক্তিক।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
কোটা ব্যবস্থার সংস্কার চেয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ-আন্দোলন করে আসছেন সাধারণ চাকরীপ্রার্থীরা। শুধু তাই-ই নয় এই ব্যবস্থাকে ‘অযৌক্তিক ও সংবিধান পরিপন্থী’ বলে মত দিয়ে লেখালেখি করছেন সাবেক শীর্ষ আমলা এবং বুদ্ধিজীবীরাও। বিষয়টি নিয়ে সরকারিভাবে অনেক কমিটি-কমিশনও হয়েছে। গবেষণা হয়েছে বেসরকারি পর্যায়ে।

সিলেট
সর্বশেষ সরকারি কর্মকমিশন-পিএসসি ২০০৮ সালে ইউএনডিপির আর্থিক সহায়তায় এ বিষয়ে অভিজ্ঞ দু’জন ব্যক্তিকে দিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। সেই সমীক্ষায় তারা গোটা ব্যবস্থাটিকে অন্যায্য এবং জনপ্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর বলে মত প্রকাশ করে। তাদের দেওয়া সুপারিশে কোটায় পদ্ধতিতে বড় ধরনের হ্রাসের কথা বলা হয়।

ভিক্টোরিয়া কলেজ, কুমিল্লা
চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা তুলে দেওয়া উচিত বলে একাধিক সাক্ষাতকার এবং সভা-সেমিনারে মত দিয়েছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান। নিয়মীত লেখালেখি করছেন আরেক সাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারও।

তাদের মতে, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিকতা ছিল। কিন্তু সেটা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য চলতে পারে না। প্রশাসনের অচলায়তন ভাঙতে এবং মেধাবীদের নিয়োগ দিতে এই ব্যবস্থা সংস্কারের বিকল্প নেই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত