প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জলমহাল ইজারায় বিপুল রাজস্ব ক্ষতি

ডেস্ক রিপোর্ট : সরকারি জলমহাল ইজারার ৪০০ আবেদন প্রায় চার মাস ধরে পড়ে আছে। অলস পড়ে আছে এর সঙ্গে জমা দেওয়া বিপুল টাকার ব্যাংক ড্রাফট ও পে-অর্ডার। কিন্তু ভূমি মন্ত্রণালয়ের জলমহাল যাচাই-বাছাই কমিটি এ চার মাসে কোনো মিটিং করেনি। ফলে কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি। মন্ত্রণালয়ের কোনো সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকরা ওই জলমহালগুলো কম মূল্যে ইজারা দিচ্ছেন। এতে সরকার ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে বলে জানা গেছে।

ভূমি সচিব মো. আবদুল জলিল শনিবার আলোকিত বাংলাদেশকে এ বিষয়ে বলেন, আবেদনগুলো আমরা নির্ধারিত সময়েই পেয়েছি। তবে নানা ব্যস্ততার জন্য যাচাই-বাছাই কমিটির মিটিং করা সম্ভব হয়নি। দ্রুত বৈঠক ডেকে পরবর্তী কাজ সম্পন্ন করতে এ সংক্রান্ত ফাইল মন্ত্রীকে দিয়েছি। আশা করি, শিগগিরই জলমহাল ইজারার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি-২০০৯ অনুসারে ২০ একরের বেশি আয়তনের সরকারি জলমহাল ইজারা পাওয়ার জন্য প্রতি বছর কার্তিক মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। আবেদনের সঙ্গে পূর্ববর্তী বছরের ইজারামূল্যের অথবা বিগত তিন বছরের ইজারামূল্যের মধ্যে যেটি বেশি হবে তার মূল্যের ওপর ২৫ শতাংশ বর্ধিত মূল্যে দর প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে। ইজারা প্রাপ্তির পর প্রথম বছরের ইজারামূল্যই পরবর্তী দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বছর আদায় করা হবে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ বছরে এ ইজারামূল্যের সঙ্গে আরও ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে সে অনুযায়ী আদায় করা হবে। জলমহাল ইজারা পাওয়ার জন্য আবেদনকারী সমিতি ইজারামূল্যের ২০ শতাংশ অর্থ জামানতস্বরূপ ব্যাংক ড্রাপট বা পে-অর্ডার যুক্ত করতে হবে।

সূত্র জানায়, আবেদনগুলো মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়ার পর অর্থাৎ ৩০ কার্তিকের পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে যাচাই-বাছাই করে প্রস্তাবিত জলমহালের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হবে। জেলা প্রশাসক উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে প্রস্তাবিত জলমহালটির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে মতামত পাঠাবেন। জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বৈধ আবেদনকারীকে জলমহাল ইজারা দেওয়া হবে। কিন্তু আবেদনের পর থেকে চার মাস সময় অতিবাহিত হলেও ভূমি মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই কমিটির বৈঠক হয়নি। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই না হওয়ায় তা পড়ে রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ধরনের আবেদনের সংখ্যা প্রায় ৪০০। যারা আবেদন করেছেন, তারা সবাই জলমহাল ইজারা পাবেন তা কিন্তু নয়। অনেকের আবেদন অসম্পূর্ণ হলে বাতিলও হবে। কিন্তু আবেদনের সঙ্গে সবাই লাখ লাখ টাকার ব্যাংক ড্রাপট বা পে-অর্ডার দিয়েছেন, যা অলস অবস্থায় পড়ে আছে। অন্যদিকে যারা জলমহালগুলো ইজারা পাবেন, তারা ঠিক সময় ইজারামূল্য পরিশোধ করে সরেজমিন বুঝে নিতে তিন মাস দেরি হবে। ফলে তারা সরকারকে তিন মাসের রাজস্ব কম দেবেনÑ এটাই স্বাভাবিক। কারণ ইজারাগ্রহীতাকে ৯ মাসের জন্য জলমহাল ভোগ করতে দিয়ে তার কাছ থেকে ১২ মাসের রাজস্ব আদায় করা যাবে না। চাপ দিয়ে আদায় করতে গেলে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে দেবেন এবং আদালত থেকে রায় পেয়ে যাবেন। অতীতে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে ২০ একরের বেশি আয়তনের সরকারি জলমহালগুলোর ইজারাসংক্রান্ত বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কোনো দিকনির্দেশনা না পেয়ে জেলা প্রশাসকরা দরপত্রের মাধ্যমে বার্ষিক ৫ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করে সেগুলো ইজারা দিচ্ছেন। একাধিক জেলায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান। প্রশ্ন হচ্ছে, মন্ত্রণালয় থেকে জলমহালগুলো ইজারা দিলে সরকার বিগত বছরের ইজারার চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি মূল্যে ইজারা দিতে পারত। মন্ত্রণালয় থেকে ইজারা না দেওয়ায় বা ইজারার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় জেলা প্রশাসকরা কম মূল্যে ইজারা দিচ্ছেন। এতে সরকারের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বিগত প্রায় চার মাসে। বিপুল পরিমাণ সরকারি এ অর্থের দায়িত্ব কে নেবেনÑ সেই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই ধরনের জলমহাল ইজারা না দিতে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, গেল বছরে যারা আবেদন করেছেন, তাদের অনুকূলে অনেকগুলো জলমহাল এখনও ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি আরও জানান, জলমহাল বরাদ্দের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের মতামত বাধ্যতামূলক। ডিসির মতামত ছাড়া ২০ একরের ঊর্ধ্বে কোনো জলমহাল ইজারা দেওয়া যাবে না। তা হলে শুধু যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হবে কেন। ডিসিই তো যাচাই-বাছাই করে ইজারা দিয়ে দিতে পারেন। এতে হয়রানি কমবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইজারা দেওয়া সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে জলমহাল ইজারাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির মৎস্যজীবী প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথ বর্মণ আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, আমি সরকারি কর্তৃক নির্বাচিত মৎস্যজীবী প্রতিনিধি। আমি ব্যক্তিগতভাবে একাধিকবার জলমহালগুলোর ইজারার বিষয়ে মন্ত্রী এবং সচিবের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা কোনো কথাই বলছেন না। জলমহাল ইজারা নীতি-২০০৯ এ বলা আছে, আবেদন দাখিলের ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে ডিসির কাছে প্রতিবেদন চাইতে হবে। আর সর্বোচ্চ চার মাসের মধ্যে জলমহালগুলো মৎস্যজীবীদের বুঝিয়ে দিতে হবে। অথচ আবেদন দাখিলের পর থেকে সাড়ে চার মাসে একটি মিটিংও করতে পারেনি ভূমি মন্ত্রণালয়। তারা কবে মিটিং করবে, কবে ডিসির কাছে প্রতিবেদন চাইবে, তা আমার বুঝে আসে না। আমার মনে হয়, আরও সাত থেকে আট মাস লাগবে সব প্রক্রিয়া শেষ করতে। তবে এতে আমলাদের লাভ-ক্ষতি কিছু না হলেও দেশের শত শত কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। জলমহাল ইজারার জন্য আবেদনকারী অনাথ বর্মণ বলেন, আমি কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার ৪৪ একরের একটি জলমহালের জন্য আবেদন জমা দিয়েছি। সরকার হ্যাঁও বলছে না, আবার নাও বলছে না। বেহুদাই সময় নষ্ট করছে। আমার মনে হয় না, আমরা খুব শিগগির জলমহালগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাব। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত