Skip to main content

মা এই শোক সহ্য করতে পারবেন না !

আনিসুল হক : ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়ির পেছনে অনেক বড় কবুতরের বাসা বানানো হয়েছে। অনেক কবুতর থাকে সেখানে। রেনু রোজ ভোরে উঠে রাসেলকে নিয়ে যান কবুতরের বাসার কাছে। কবুতরগুলোকে খাবার দেন।একদিন কবুতরের মাংস রান্না করে দেওয়া হলো রাসেলকে। রাসেল খেল না। কবুতরের মাংসের সুপ বানানো হলো। তাও রাসেল মুখে তুলল না। ১৫ দিন পরপর কারাগারে রেনু দেখা করতে যান হাসুর আব্বার সঙ্গে। রাসেল আধো আধো বুলিতে আব্বা আব্বা বলে মুজিবের কোলে উঠে বসে থাকে। তাকে বলা হলো, এটা হলো আব্বার বাসা। সে প্রায়ই বলত, আব্বার বাসায় যাব। রাসেল সারাক্ষণ আব্বা আব্বা করে। শেষে রেনু এক কাজ করলেন। রাসেলকে শিখিয়ে দিলেন মাকেই আব্বা বলে ডাকতে। তারপর রাসেল রেনুকেই আব্বা বলে ডাকে। তারপর তারা গেছে কারাগারে। রাসেল, রেহানা, জামাল, কামাল, হাসিনা, রেনু। জামালের জ্বর। মুজিব ডাকলেন, জামাল বাবা, এদিকে আসো। জামাল এগিয়ে গেল। তার চোখ দুটো লাল আছে। গাটা বেশ গরম জামালের। ছোট্ট রাসেল মার কোল থেকে নামছেই না। দুই বছর পুরো হয়নি ওর বয়স। মুজিব ডাকলেন, আব্বু আসো। আব্বার কাছে আসো। রাসেল দ্বিধায় পড়ল। কোনটা আব্বা? রেহানাও গিয়ে বসে তার আব্বার কোলে। একদিন ‘দেখা’র সময় সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন। মুজিবকে কিছু বলছেন না। মুজিব জিগ্যেস করলেন, রেনু, কিছু কি বলতে চাচ্ছ, পারতেছ না? রেনু বললেন, বাড়ি খবর এসেছে। আম্মার খুব অসুখ। তোমাকে দেখতে চায়। প্যারোলে মুক্তি নিয়া টুঙ্গিপাড়া যাও। মুজিব বললেন, প্যারোলে মুক্তি নিয়া গেলে আসার সময় মা এই শোক সহ্য করতে পারবেন না। হার্টফেল করে মারা যাবেন। দরকার নাই। একবারে মুক্তি পাইলে যাব। নাসেরকে বলো, খুলনা থেকে টুঙ্গিপাড়া যাইতে। পরিবারকে বিদায় দিয়ে মুজিব ফিরে এলেন তার সেলে। নির্জন সেল। তবে মেট আলিমুদ্দি আছে, বাবুর্চি আছে। তারা জিগ্যেস করল, স্যার আপনার মুখ আন্ধার কেন? আপনারে এত চিন্তিত লাগে কেন? মুজিব বললেন, মার খুব অসুখ। এর আগে মুজিবের মা ছিলেন খুলনায়। খুলনা তিনি ফোন করেছিলেন, বাবা খোকা, আমি বোধ হয় আর বাঁচব না। আমি বাড়ি যাচ্ছি। তুই বাড়ি আয়।’ তারপর তো তাঁকে একটার পর একটা জেলায় আটক করা শুরু হলো। অল্প কয়দিনে আটবার আটক করেছিল। তিনি এসে তার কারাগারের বিছানায় শুয়ে পড়লেন। মেট আর বাবুর্চি বলতে লাগল, স্যার খেয়ে নেন। স্যার। তিনি খাওয়ার কথা ভুলে গেলেন। পড়াশোনাতেও মন বসাতে পারলেন না। অন্ধকার ঘরে একাকী বিছানায় শুয়ে আছেন। তার আব্বা আম্মা তাকে ডাকে খোকা। কত যে আদর করেন তারা তাঁকে। পারলে কোলে করে নিয়ে আদর করেন। আর তিনিও এই বয়সে সব সময় আব্বা আম্মার গলা জড়িয়ে ধরে আদর করে থাকেন। সেই মা বলছে, বাবা খোকা। আর বাঁচব না। চলে আয়। তাদের খোকা জেলখানার বন্দি খাঁচায় শুয়ে বলতে লাগল, মা, সহজে তোমাকে পাবার পথ তো আমার নয়। দেশমাকে মুক্ত করে আমি তোমার কাছে আসব। আসবই। আর যদি আসতে না পারি, তাহলে বুঝবা, মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই আমি এই দেশের ধুলিমাটিতে নিজেকে মিশিয়ে দিলাম। রবীন্দ্রনাথের গানের ওই লাইনটা আমার খুব প্রিয়, মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি। মা, তোমার মুখ যে আজ মলিন। মা, আমার বাংলামায়ের বদন যে আজ মলিন। শেখ মুজিবের দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। জেলখানার বালিশ কম্বল ভিজে যেতে লাগল সেই অশ্রুতে। বাইরে আকাশ মেঘলা হয়ে আসছে। বোধ হয় বৃষ্টি হবে। পাশে মেন্টাল ওয়ার্ডে কেউ একজন করুণ সুরে গান ধরেছে, একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি। ঝরঝর করে বৃষ্টি শুরু হলো। আকাশ নিজেই যেন কাঁদছে। লেখক : কথাসাহিত্যিক/সদ্যপ্রকাশিত উপন্যাস ‘আলো-আঁধারের যাত্রী’ থেকে

অন্যান্য সংবাদ