প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

২০ বছরে ১০ উপাচার্যের পদত্যাগ

ডেস্ক রিপোর্ট : ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট। পূর্ব পাকিস্তান সরকার কর্তৃক জারি করা ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা লাভ করে বর্তমান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পান পাকিস্তান কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য প্রখ্যাত রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. মফিজউদ্দিন আহমেদ। সেই শুরু। গত ৪৮ বছরে স্বনামধন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য হিসেবে বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করেছেন মোট ১৮ জন। এর মধ্যে পাঁচজন ছিলেন স্বল্পমেয়াদের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য। ১৯৯৩-২০১৪— এই ২০ বছরে দায়িত্ব পালন করেছেন ১২ জন উপাচার্য। এর মধ্যে শুধু দুজন ছাড়া কেউই তাদের পূর্ণ মেয়াদের দায়িত্ব শেষ করতে পারেননি। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামকে নিয়েও শুরু হয়েছে আন্দোলন আর শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন। ফলে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন আর উপাচার্য পতন যেন ধারাবাহিক সংস্কৃতিই হয়ে উঠেছে জাবির জন্য।

১৯৯৩-২০১৪ সময়ের মধ্যে জাবির পাঁচজন উপাচার্য বিভিন্ন আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এরা হলেন অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমদ (১৯৮৮-৯৩), অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদ (১৯৯৮-৯৯), অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমদ (২০০১-০৪), অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির (২০০৯-১২) এবং সর্বশেষ অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন (২০১২-১৪)। বার বার উপাচার্য পতনের আন্দোলন, পদত্যাগ আর প্রশাসনিক রদবদলের কারণে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমের পরিবেশ নষ্টের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। পিছিয়ে পড়েছে গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। সর্বশেষ, দেশের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম দক্ষতার সঙ্গে ২০১৪-১৮ পর্যন্ত নিজের প্রথম মেয়াদের দায়িত্বকাল শেষ করার পর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পুনরায় চার বছরের জন্য উপাচার্য নির্বাচিত হন। তাকেও অপসারণের মাধ্যমে নতুন উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের একাংশ। ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের দলটিতে এদ্দিন কোনো বিভাজন দেখা না গেলেও উপাচার্য নিয়োগের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলটি দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একটি সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির এবং অন্যটি বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামপন্থি।

এ দুই পক্ষ থেকেই দাবি করা হচ্ছে— অন্য পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩-এর ১১(১) ধারাটির অপব্যাখ্যার মাধ্যমে উপাচার্যের পদ লাভ করে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে চাইছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩-এর আলোচিত এই ১১(১) ধারায় যা বলা হয়েছে তা হলো— The Vice-Chancellor shall be appointed by the Chancellor for a period of four years from a panel of three persons to be nominated by the senate on such terms and conditions as may be determined by the Chancellor and shall be eligible for re-appointment for a further period of four years.শরীফ এনামুল কবিরপন্থি শিক্ষকরা উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে প্রশাসনিক ভবন অবরোধ, মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘট ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন। উপাচার্য ফারজানা ইসলামের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে যোগ না দেওয়ার জন্য মোবাইলে খুদেবার্তা দিয়ে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে শরীফ এনামুল কবিরপন্থি শিক্ষকদের। নির্দেশ অমান্য করায় এরই মধ্যে সংগঠন থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে ছয় শিক্ষককে।

বিশেষ করে দুই উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবুল হোসেন (শিক্ষা) ও আমির হোসেন (প্রশাসন) এবার একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে উপাচার্য ফারজানা ইসলামের সঙ্গে শহীদ মিনারে ফুল না দিয়ে শরীফ এনামুল কবিরের সঙ্গে ফুল দেওয়ায় চলছে নানা সমালোচনা। এসবের মধ্য দিয়ে মূলত উপাচার্য ফারজানা ইসলামকে অসহযোগিতার মাধ্যমে প্রশাসনিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষকরা। এদিকে ফারজানা ইসলামপন্থি শিক্ষকরাও এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে উপাচার্যের প্রতি তাদের শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদ বলেন, ‘কিছু শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় আইনের অপব্যাখ্যা করে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের দাবিতে অনৈতিকভাবে আন্দোলন করছেন। কেননা রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন মেনেই অধ্যাপক ফারজানা ইসলামকে পুনরায় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।’

২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাবি শিক্ষক সমিতির নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে শিক্ষক সমিতির ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ নির্বাচনেও শরীফ এনামুল কবিরপন্থি ও ফারজানা ইসলামপন্থি— এ দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রচারণা চালাতে দেখা যাচ্ছে শিক্ষকদের। শরীফ এনামুল কবিরপন্থি শিক্ষকরা যদি নির্বাচনে জয়ী হন তাহলে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারেন ফারজানা ইসলাম। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে অবশ্য জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে দুটি গ্রুপই।

পূর্ববর্তী যেসব উপাচার্য বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন তাদের সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—

কাজী সালেহ আহমেদ : এক দলীয় নেতার বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে ১৯৯৩ সালের ২৯ জুলাই সিন্ডিকেট নির্বাচন চলাকালে শিক্ষক ক্লাবে হামলা চালায় ছাত্রদল। এর জেরে পদত্যাগ করেন কাজী সালেহ আহমেদ। জানা যায়, শিক্ষকদের ওপর এই হামলার উসকানিদাতা ছিলেন প্রতিপক্ষ শিক্ষকরাই। এই প্রেক্ষাপটেই বন্ধ করে দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের সংগঠন জাকসুর কার্যক্রম। গত ২৬ বছরে নানাভাবে আন্দোলন করলেও এখনো পর্যন্ত আর চালু করা যায়নি সেই জাকসু।

আলাউদ্দিন আহমেদ : ১৯৯৮ সালে তৎকালীন জাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জসিমুদ্দিন মানিকের ধর্ষণের ঘটনা মিডিয়ায় এলে দেশজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। এদিকে জাবিতে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফি বৃদ্ধিবিরোধী আন্দোলন। এসব আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আলাউদ্দিন আহমেদকে উপাচার্যের পদ থেকে সরিয়ে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।

জসিম উদ্দিন আহমদ : ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল বায়েসকে সরিয়ে দেয়। উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমদকে। এ ধরনের অগণতান্ত্রিক নিয়োগে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন বিএনপিপন্থি শিক্ষকরাও। পরে বিভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে অনুষ্ঠিত হয় উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন। নির্বাচনে হেরে অবশেষে পদ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।

শরীফ এনামুল কবির : নিজস্ব প্রভাববলয় তৈরির জন্য গণহারে শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ ও ছাত্ররাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ ওঠে অধ্যাপক শরীফ এনামুল করিবের বিরুদ্ধে। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে অন্য ছাত্রলীগ কর্মী জোবায়ের নিহত হন। এসব অভিযোগের দায় মাথায় নিয়ে দায়িত্ব শেষ হওয়ার নয় মাস বাকি থাকতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বদলীয় শিক্ষকদের আন্দোলনে পদত্যাগে বাধ্য হন তিনি।

মো. আনোয়ার হোসেন : ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী আবদুল মালেক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে মারা যান। হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সময়মতো অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসায় ও মেডিকেলে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। হামলা ও ভাঙচুরের এই ঘটনায় উপাচার্য আনোয়ার হোসেন দায়ী করেন জামায়াত-শিবিরকে। এমনকি আওয়ামীপন্থি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরও তিনি জামায়াত-শিবির বলে আখ্যা দেন। এসব ঘটনায় উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষক সমিতি। নয় মাসব্যাপী আন্দোলনে শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উপ-উপাচার্য, রেজিস্ট্রার এবং দুই দফায় উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ ছাড়া উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, ক্লাস বর্জন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ভবন অবরোধ, সিনেট-সিন্ডিকেট ও অন্যান্য প্রশাসনিক সভা প্রতিরোধসহ নানা কর্মসূচিতে ভেঙে পড়ে শিক্ষা কার্যক্রম। এরই জেরে ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত