প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দক্ষিণের শিল্পে বিপুল সম্ভাবনা
ভোলায় নতুন গ্যাস

ডেস্ক রিপোর্ট : দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলা। উত্তর ও পূর্ব পাশে মেঘনা নদী। পশ্চিমে আরেক নদী তেতুলিয়া। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এক সময়ের মগ ও পর্তুগিজ দস্যুদের ঘাঁটি এই দ্বীপ স্বাধীন বাংলাদেশের মত্স্য সম্পদের অন্যতম জোগানদাতা। আর এখন তিন হাজার ৪০৩ বর্গ কিলোমিটারের জেলাটিকে ঘিরে দেশের গোটা দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক শিল্পায়নের নতুন আশা সৃষ্টি হয়েছে। দ্বীপটিতে আবিষ্কৃত হয়েছে নতুন গ্যাসক্ষেত্র। আগের গ্যাসক্ষেত্রের প্রমাণিত মজুদের পরিমাণও প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। দক্ষিণ অঞ্চলে আরো গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান জ্বালানি গ্যাসের প্রাপ্তিতে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি দ্রুত বিকশিত হওয়ার পথ খুলেছে।

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রমাণিত মজুদ কমে আসছে। আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গ্যাস সংকটে বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানির অভাবে শিল্প উত্পাদনের গতিও ধীর। বিকল্প হিসেবে ব্যয়বহুল এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি শুরু হচ্ছে আগামী এপ্রিল মাসে। বেসরকারি পর্যায়ে এলপিজি আম-দানির পরিমাণ বাড়ছে কয়েক গুণ। এমন অবস্থায় গত বছরের অক্টোবরে ভোলার শাহবাজপুর গ্যাস-ক্ষেত্রে প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাসের নতুন মজুদ পাওয়া যায়। আগে এ ক্ষেত্রের প্রমাণিত মজুদ ছিল প্রায় ৭০০ বিসিএফ গ্যাস। চলতি বছরের গত জানুয়ারিতে ভোলা নর্থ নামে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে বাপেক্স। শাহবাজপুর ক্ষেত্র থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই নতুন ক্ষেত্রের মজুদের পরিমাণ প্রায় ৭০০ বিসিএফ গ্যাস। সব মিলিয়ে শাহবাজপুর এবং ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্রে দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুটের (টিসিএফ) বেশি উত্তোলনযোগ্য গ্যাস রয়েছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে উত্তোলনযোগ্য মোট গ্যাসের পরিমাণ ছিল প্রায় ১২ টিসিএফ। আর সম্প্রতি ভোলায় বিদ্যমান শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রের মজুদবৃদ্ধি এবং ভোলা নর্থ ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হওয়ায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রায় ১ দশমিক ৪ টিসিএফ গ্যাস নতুন করে যুক্ত হবে। দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে বড় সুখবর।
পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে ভোলায় শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও এর বাণিজ্যিক ব্যবহার ছিল না দীর্ঘদিন। একদিকে দক্ষিণের এ গ্যাসক্ষেত্র সরকারিভাবে অব্যবহূত থাকলেও স্থানীয়রা দোকান পরিচালনা কিংবা আবাসিক কাজে এ গ্যাস নিজেদের ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করতেন। এতে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের অপচয় হয়। ভোলায় বর্তমানে দুটি বিদ্যুেকন্দ্র চালু রয়েছে। এর মধ্যে একটি পিডিবির ২০০ মেগাওয়াটের এবং অপরটি বেসরকারি ৩৩ মেগাওয়াটের রেন্টাল কেন্দ্র। সব মিলিয়ে ভোলায় দৈনিক ৫০-৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহূত হচ্ছে। শাহবাজপুরের আগের মজুদের তুলনায়ও এটি সামান্য। এ অবস্থায় অপারেশন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এক সময় ভোলার গ্যাস উত্পাদন বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা করেছিল বাপেক্স।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। নতুন মজুদ ও গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পর শিল্পায়নে গতি আনার বড় প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। জেলা সদরের ভেদুরিয়ায় স্থাপন হতে যাওয়া ভোলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশে ২২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার নতুন বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে পিডিবি। আগামী তিন বছরের মধ্যে কেন্দ্রটিতে বিদ্যুত্ উত্পাদন শুরু করা যাবে বলে আশা করছেন পিডিবির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ভোলা ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র) মীর রুহুল কুদ্দুস। বোরহানউদ্দিন উপজেলায় দ্বৈতজ্বালানির নতুন বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে ভারতীয় শিল্পপরিবার শাপুর্জি পালনজি গ্রুপ। ২২০ মেগাওয়াট (গ্যাস) ও ২১২ মেগাওয়াট (ডিজেল) ক্ষমতার এ ডুয়েল-ফুয়েল কম্বাইন্ড সাইকেল কেন্দ্রের বিদ্যুত্ কিনতে বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড এবং শাপুর্জি পালনজি গ্রুপের মধ্যে ইতিমধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের উচ্চচাপ ক্ষমতাসম্পন্ন ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করেছে জিটিসিএল এবং সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। এর মাধ্যমে ভোলার গ্যাসের শিল্প-ব্যবহার শুরু হবে।
জ্বালানি বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা অন্তত ৩৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। অর্থাত্ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দক্ষিণাঞ্চলে তথা বরিশাল এবং খুলনা অঞ্চলে গ্যাসের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সরকার সররাহ করতে পারছে না। এ অবস্থায় ভোলার গ্যাস খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বেশি ব্যবহারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের এক অতিরিক্ত সচিব বলেন, ভোলা চারপাশেই পানিবেষ্টিত। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বিধায় শাহবাজপুর ও ভোলা নর্থের গ্যাস সারা দেশে ব্যবহূত হতে পারবে না। ঢাকা, সিলেট কিংবা চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ গ্যাস পৌঁছানো অনেক ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। কেননা এ জন্য মেঘনার মত বড় এবং স্রোতস্বিনী নদীর নিচ দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে। যা খুবই ব্যয়বহুল। এই অবস্থায় বরং ভোলার গ্যাস ভোলাতেই বিদ্যুত্ উত্পাদন করে বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলে বিতরণ করা এবং ওইদিকেই গ্যাস সঞ্চালন-বিতরণ পাইপলাইন নির্মাণে ব্যবহূত করা যৌক্তিক হবে। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলে বহু কাঙ্খিত শিল্পায়নও গতি পাবে।
এ প্রসঙ্গে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ভোলার গ্যাস দেশের জ্বালানি ও অর্থনীতি খাতের জন্য বড় সুসংবাদ। এ গ্যাসের ফলপ্রসু বাণিজ্যিক ব্যবহারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। দক্ষিণের শিল্পায়নে নতুন গ্যাসের ব্যবহার গতি আনবে।
আরো গ্যাসের হাতছানি
এদিকে দেশের ২৭তম গ্যাসক্ষেত্র ভোলা নর্থ আবিষ্কারের পর দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি সম্পদ সম্পর্কেও নতুন আশা তৈরি করেছে। ভূ-তত্ত্ববিদরা বলছেন, বেঙ্গল বেসিনভুক্ত ভোলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গ্যাস পাওয়ায় দেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম এবং উত্তরাঞ্চলেও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে। শাহবাজপুর ও ভোলা নর্থ ছাড়া দেশের বাকি গ্যাসক্ষেত্রগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে সুরমা বেসিনভুক্ত সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এই বেসিনের ভূ-কাঠামোকে বলা হয় ‘অ্যান্টিক্লাইন স্ট্রাকচার’। বেঙ্গল বেসিনের ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভূ-কাঠামোর নাম ‘স্টেটিগ্রাফিক স্ট্রাকচার’। এ ধরনের কাঠামোয় তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। কিন্তু কম সম্ভাবনার ভোলাই এখন বড় সম্ভাবনা হয়ে উঠেছে।
ভোলা ছাড়া বেঙ্গল বেসিন ও স্টেটিগ্রাফিক স্ট্রাকচারে এখন পর্যন্ত গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে শুধু পাবনার মোবারকপুরে। ভোলায় বড় ধরনের মজুত আবিষ্কৃত হওয়ায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও গ্যাস-খনিজ পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ভূ-তত্ত্ববিদ এম এ বাকি বলেন, ভোলায় বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার বেঙ্গল বেসিনে আরও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে আরও জরিপ-অনুসন্ধান চালানো দরকার। ভোলার গ্যাসের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে শিল্পায়ন গতি পাবে। পাশাপাশি এলএনজি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মিশ্রণে দেশীয় গ্যাসের অংশ বাড়লে দামও সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।
বাপেক্স সূত্র জানায়, ১৯৮৬ সালে ভোলায় ২৬৬ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক ভূ-কম্পন জরিপের মাধ্যমে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রটির সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু ভোলায় আরও গ্যাস আছে বলে সংশ্লিষ্ট ভূ-তত্ত্ববিদেরা ধারণা করতেন। আমেরিকান কোম্পানি ইউনোকল ২০০৩-০৪ সালে চালানো এক জরিপের ভিত্তিতে ভোলায় অন্তত তিন টিসিএফ গ্যাস থাকার সম্ভাবনার কথা বলেছিল। তারা অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আগ্রহ দেখালেও পরে তা আর ফলপ্রসূ হয়নি। এরপর ২০১৬ সালে পুরো দ্বীপের ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ত্রিমাত্রিক ভূ-কম্পন জরিপ চালায়। সেই জরিপেও আরো গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। সূত্র : ইত্তেফাক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত