প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিপিন রাওয়াতের বক্তব্য: বাংলাদেশ কি ভারতের বিরুদ্ধে সিনো-পাক প্রক্সি যুদ্ধের অংশ?

আফসান চৌধুরী : ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান ভারতীয় এনটিভিতে অভিযোগ করেছেন, পাকিস্তান ও চীন ভারতের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধের অংশ হিসেবে আসামে বাংলাদেশী অভিবাসীদের অনুপ্রবেশে ভূমিকা রাখছে। তার এই অভিযোগ একই সাথে মারাত্মক, আবার শেখ হাসিনা সরকারের জন্য বিব্রতকরও বটে। এই অভিযোগের অর্থ হলো বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার এতটাই অসহায় যে, তারা এমনকি নিজেদের সীমানাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

আসাম প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সময় বিপিন রাওয়াত সম্ভবত বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন নেতৃবৃন্দের কথা ভেবে দেখেননি। তবে এই বক্তব্য থেকে এটাও উঠে এসেছে যে, একটা সরকার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল না হলেও শক্তিধর প্রতিবেশীর দিক থেকে কি ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ থেকে উত্তরপূর্ব ভারতে মানুষের অভিবাসন নিয়ে জেনারেল রাওয়াত বলেন, “আমাদের পশ্চিমা প্রতিবেশীর (পাকিস্তান) কারণে পরিকল্পিত অভিবাসন চলছে। তারা প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে সবসময় চেষ্টা করবে এবং নিশ্চিত করবে যাতে এই অঞ্চলটি বেদখল হয়।”

অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের ব্যাপারটি আসামে একটি প্রধান ইস্যু। রাজ্য সরকার এখন জাতীয় নাগরিক রেজিস্টার তৈরি করছে যাতে করে অবৈধভাবে বসবাসরতদের খুঁজে বের করা যায়।

বিপিন রাওয়াতের উদ্বেগ বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গীর বহি:প্রকাশ, বিশেষ করে যখন তারা ভারতের ভেতরেই রাজনৈতিক বিরোধীতার মুখে পড়ছে। রাওয়াত আরও বলেন, “এআইইউডিএফ নামে একটি দল রয়েছে। যদি এদের দিকে লক্ষ্য করেন, দেখবেন তারা খুব দ্রুত বিকশিত হয়েছে, বহু বছরেও বিজেপির যেটা হয়নি। এআইইউডিএফ আসামে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।”

মুসলিম সম্প্রদায়ভিত্তিক দল এআইইউডিএফ গঠিত হয় ২০০৫ সালে। লোকসভায় তাদের তিনজন এবং প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলিতে ১৩ জন এমপি রয়েছে।

সেনাপ্রধান বলেন, সমস্যা সমাধানের জন্য দ্বিমুখী প্রচেষ্টা প্রয়োজন। “সে সময় খুব দূরে নয় যখন আমরা এই অঞ্চলকে জোড়া লাগাতে পারবো এবং এখানকার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবো। উন্নয়নের সাথেই আসবে এখানকার মানুষদের নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গ যারা এই এলাকায় বাস করছে।”

রাওয়াতের বিবৃতি বাংলাদেশের জন্য কি অর্থ বহন করে?

বিপিন রাওয়াত ভারতের উদ্বেগের জায়গা থেকে কথা বলেছেন কিন্তু তার কথার মধ্যে এক ধরনের সারল্য রয়েছে যেন ‘বাংলাদেশের মুসলিম অভিবাসী পাঠানো’ নিয়ে তার কথার কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সে ব্যাপারে তার ধারণা নেই। অথবা এটাও হতে পারে যে, পাকিস্তান ও চীনের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে বাংলাদেশকে একটা সিগন্যাল দিচ্ছেন তিনি। তবে, যাই বুঝিয়ে থাকেন না কেন তিনি, যে ব্যাপারটি নিশ্চিত, সেটা হলো বাংলাদেশ সমস্যার বাইরে নয়, সেটা ইচ্ছাতেই হোক বা তার অক্ষমতার জন্যই হোক।

চীনকে বাংলাদেশে শত্রু মনে করা হয় না, কিন্তু পাকিস্তানকে অবশ্যই করা হয় এবং রাওয়াতের অভিযোগ থেকে মনে হবে, বাংলাদেশ যেন তার শত্রুর সাথে ঘুমাচ্ছে এবং নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা অক্ষম।

রাওয়াতের বিবৃতি থেকে তিনটি বিষয় উঠে এসেছে:

এক. শেখ হাসিনার সরকার হয়তো প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সামরিক-কৌশলগত অবস্থানের বিরোধী কিন্তু বাস্তবে সেটা বাস্তবায়নের মতো সক্ষমতা বা ইচ্ছা আসলে তাদের নেই। সেজন্যে যে কারণেই হোক, বাংলাদেশ সিনো-পাকিস্তান অক্ষের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে।

দুই. আসাম ভারতের জন্য খুবই মারাত্মক একটি সমস্যা যেটা মুসলিম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সে জন্যেই এটা একটা নিরাপত্তা সমস্যাও বটে, যেখানে বাংলাদেশের ভূমিকা রয়েছে।

তিন. পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে চীনের সাথে সম্পর্ক হতে পারে না এবং আঞ্চলিক রাজনীতি এখন ‘এটা না হলে ওটা’র পর্যায়ে চলে গেছে এবং আঞ্চলিক পক্ষপাতহীনতা এখন আর কোন লক্ষ্য হতে পারে না।

কৌতুহলের ব্যাপার হলো, এমন সময় এই বক্তৃতা দেয়া হলো যখন ভারতের মিডিয়া নেতারা বাংলাদেশের আওয়ামী লীগপন্থী মিডিয়াগুলোর সাথে ঢাকায় বৈঠক করছে এবং তারা ভারত সম্পর্কে খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ বিবৃতি ও মনোভাব ব্যক্ত করছে। সিনো-পাক প্রক্সি যুদ্ধে বাংলাদেশকে একেবারে অসহায় হিসেবে তুলে ধরেছেন রাওয়াত, যাতে করে বাংলাদেশকে এতটা দুর্বল মনে হয় যে তার এখনই ভারতের সাহায্য প্রয়োজন।

আসামের অভিবাসন ইস্যু এখনই চলে যাচ্ছে না

আওয়ামী লীগ যে ভারতের কৌশলগত সহযোগী, সে বিষয়টি স্পষ্ট কারণ বাংলাদেশের সবকিছুতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, যার মধ্যে রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি নির্ধারণের বিষয়টিও রয়েছে। ভারত নিশ্চিতভাবে বিএনপিপন্থী নয়, কিন্তু সমস্যা হলো জনগণের অধিকাংশের মনোভাব ভারতপন্থী নয়। তাই, আওয়ামী লীগের জন্য পথটা সংকীর্ণ। আর এ ধরনের বিবৃতি দিয়ে ভারতীয়রা পরিস্থিতি উন্নতির জন্য খুব একটা ভাল কিছু করছে না।

বিবৃতিতে এটাও বোঝা গেছে যে আসামের অভিবাসী ইস্যুটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সমস্যাটা এখনও যথেষ্ট প্রকট এবং এর সাথে সাধারণভাবে নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। ভয় হলো মুসলিম কমিউনিটির একটি দল ভারতের কৌশলগত পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে পারে এবং যেটা নিয়ে বিজেপি উদ্বিগ্ন।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা সব জায়গায় একরকম নয়। এ বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে মুসলিম ও পাকিস্তানের ধর্মীয় পরিচয় এবং মুসলিম অভিবাসন বাড়ানোর পেছনে বাংলাদেশকে সহযোগী হিসেবে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে ইন্দো-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন আঞ্চলিক কৌশলগত জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত যদি মনে করে যে বাংলাদেশ তার নিজের দেখাশোনা করতে সক্ষম নয়, তাহলে কে সক্ষম?

বিপর্যস্ত মিয়ানমার নীতির কারণে ঘুরপাক খাওয়ার পর রাওয়াত এখন স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের ভারত নীতিও খুব একটা ভালো করছে না।- লেখাটি সাউথ এশিয়ান মনিটর থেকে নেয়া।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ