প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আগাম মাঠ গোছাচ্ছে আ’লীগ

তারেক : নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগমুহূর্ত (অক্টোবর) পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাওয়ার কথা আওয়ামী লীগের। কিন্তু সে পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না দলটি। এপ্রিল-মে’র মধ্যেই একাদশ জাতীয় নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে চায় তারা। এ নিয়ে দ্রুত গতিতে কাজ করছে ক্ষমতাসীনরা। আগাম প্রস্তুতি নিতে তৃণমূল চষে বেড়াচ্ছে দলটির ১৫টি টিম। সভা-সমাবেশ করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জেলা নেতাদের মাঠ গোছাতে দেয়া হয়েছে ডেডলাইন। চলছে নির্বাচনী মহাযজ্ঞ। লক্ষ্য মাঠ গুছিয়ে বিএনপি-জামায়াতের ‘নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র’ প্রতিরোধে প্রস্তুত থাকা।

কৌশলগত কারণে ডেটলাইন (এপ্রিল-মে) গোপন থাকছে- মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বুধবার বলেন, দশম জাতীয় সংসদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই আগাম নির্বাচনী প্রস্তুতি ও বিএনপি-জামায়াতের ‘নির্বাচন বানচাল ষড়যন্ত্র’ প্রতিহতে প্রস্তুত থাকবে আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, জুন থেকে নির্বাচনের আগমুহূর্ত (অক্টোবর) পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার চেয়ে সে সময় উদ্ভূত পরিস্থিতি ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলার কৌশলে এগুচ্ছে দল। গত নির্বাচনে এ একটি ব্যাপারে অপ্রস্তুত থাকায় বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা আওয়ামী লীগসহ সাধারণ মানুষকে হজম করতে হয়েছে। ফলে আগামী নির্বাচনের জন্য আগাম প্রস্তুতি নিয়ে ভোটের পরিবেশ সৃষ্টি ও নির্বাচনকালীন সহিংসতা প্রতিরোধে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখবে দলটি।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রস্তুতিকে আগাম উল্লেখ করে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বৃহস্পতিবার বলেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচন আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এ নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে। যেহেতু নির্বাচন অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে তাই আমরা অনেক আগেই নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার কাজ শুরু করেছি।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি-জামায়াত এবার নির্বাচন বানচালে ষড়যন্ত্র ও নাশকতা করার সুযোগ পাবে না। আওয়ামী লীগ অতীতের যে কেনো সময়ের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। পাড়া-মহল্লায় এমন কোনো বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে আওয়ামী লীগের কর্মী নেই। তারা এখন ঐক্যবদ্ধ। নির্বাচন বানচালের চেষ্টা প্রতিহতে আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি। নাশকতাকারীদের আগেই চিহ্নিত করেছি। নতুন করে যারা সহিংস আন্দোলন করার চেষ্টা করবে এমন সম্ভাব্যদেরও স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় আওয়ামী লীগ ভোট কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি করছে। আগামী নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র পুড়িয়ে দেয়া, ব্যালট পেপার ছিনতাই, মানুষ হত্যার সুযোগ পাবে না বিএনপি-জামায়াত। নাশকতার চেষ্টা করলে তারা পালানোর পথ পাবে না।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আগামী নির্বাচনের আগে তৃণমূল আওয়ামী লীগকে ঢেলে সাজাতে ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে দল মাঠে নেমেছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তৃণমূল সফরে সংগঠনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে দলের বিজয় নিশ্চিত করতেই এ সফর ও প্রচার-প্রচারণা।

জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, একাদশ জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণার আগমুহূর্ত পর্যন্ত (অক্টোবর) আওয়ামী লীগ প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাবে।

আওয়ামী লীগকে একটি নির্বাচনমুখী দল উল্লেখ করে প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান সম্প্রতি বলেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আমরা এখন থেকেই দল গোছাতে শুরু করেছি। ১৫টি টিম গঠন করে তৃণমূল সফর করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এ নির্বাচনে সব নিবন্ধিত দল অংশ নেবে ভেবেই আওয়ামী লীগ কাজ করছে। সবচেয়ে জনপ্রিয়দের নিয়ে প্রার্থী তালিকা করা হচ্ছে। নির্বাচনে জয় নিশ্চিতে বিতর্কিতদের মনোনয়ন না দেয়ার কথা বলেছেন দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমরা তৃণমূল সফরে গিয়ে নানা জরিপ করছি। সরকারের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি আমরা বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাওপোড়াও, ভোট কেন্দ্র পুড়িয়ে দেয়া, মানুষ পুড়িয়ে মারার কথাও তুলে ধরছি। আগামী নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত যাতে এরকম সহিংস কর্মকাণ্ডসহ কোনো ষড়যন্ত্র করতে না পারে সেজন্য আওয়ামী লীগ সজাগ দৃষ্টি রাখছে। নেতাকর্মীদের সতর্ক করা হচ্ছে।

নির্বাচনী প্রস্তুতি সম্পন্নে ২৬ জানুয়ারি থেকে আওয়ামী লীগের ১৫টি টিম সাংগঠনিক সফর করছে। এক ডজন এজেন্ডা নিয়ে দলটির ৭৬টি সাংগঠনিক জেলা সফরে নেমেছে এ টিম।

২৫ দিনে বেশ কিছু জেলা ও বিভাগীয় সদর সফর করেছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন প্রস্তুতি সম্পন্নে ৩ ফেব্রুয়ারি তৃণমূলে চিঠি দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। চিঠিতে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস-নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে জনমত গঠন, কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন, পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ ও সদস্য সংগ্রহ অভিযান বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে পোলিং এজেন্ট ও মাস্টার ট্রেইনার নিয়োগে সিডিউল প্রস্তুত করেছে দলটি। নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজটিও চলছে দ্রুত গতিতে।

সাংগঠনিক সফরের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ জানুয়ারি সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। ওই দিন জেলার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন তিনি। এরপর ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশালে ঐতিহাসিক জনসভা করেন তিনি। সফরের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার রাজশাহীতে নির্বাচনী জনসমাবেশ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এরপর ২ মার্চ যাবেন খুলনায়। এপ্রিল-মে’র মধ্যে বিভাগীয় শহর রংপুর, ময়মনসিংহসহ বিএনপি অধ্যুষিত বেশ কিছু জেলা সফর শেষ করবেন তিনি। সমানতালে চলবে দলটির ১৫টি টিমের সফর ও প্রচার-প্রচারণা।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ১৮ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ঢাকা ও আশপাশের জেলা নেতা এবং এমপিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, বিএনপি নিজেরাই বলছে খালেদা জিয়া জেলে যাওয়াতে তাদের দল আগের চেয়েও শক্তিশালী। তার অনুপস্থিতিতে যে দল এত ঐক্যবদ্ধ, শক্তিশালী- সেই দলের নির্বাচনে যেতে অসুবিধা কি? খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়েও তারা নির্বাচনে যেতে পারে। তিনি বলেন, এ ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী বিএনপিকে নিয়েই আমরা সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে চাই।

এদিকে নির্বাচনী প্রস্তুতি শেষ করতে এক ডজন এজেন্ডা নিয়ে ভোটের মাঠে নেমেছে আওয়ামী লীগ। অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে কী কারণে অন্তর্কোন্দল তৃণমূলে? নির্বাচন এলে কেনই বা অনুগত কর্মীরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে? এমপিদের সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীদের দূরুত্ব বাড়ার কারণ কি? এসব উদঘাটন ও উত্তরণের পথ সৃষ্টি করে মে’র মধ্যেই সমাধানের পথ বের করবেন কেন্দ্রীয় নেতারা। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে থাকা টিমগুলো প্রার্থী বাঁছাইয়ের জরিপও করছে। স্থানীয় নির্বাচনগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতাও এ সময় স্মরণে রাখছেন টিম সদস্যরা।

টিমের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ টিম বিভিন্ন জেলা সফরে গিয়ে দলীয় এমপিদের জনপ্রিয়তা যাচাই করছে। সাধারণ জনমত জরিপ করছে। একই সঙ্গে আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য তিনজন প্রার্থীর তালিকা প্রস্তুতে অন্যান্য দলীয় প্রার্থীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে অনেক এলাকায়। দলীয় এমপিদের সঙ্গে স্থানীয় নেতা ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিরোধের কারণ উদঘাটন করে তা সমাধানও করছে সফররত টিমগুলো।

এছাড়া তৃণমূল সফরে যাওয়া টিম আগামী নির্বাচনের আগে দলের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে অন্তর্কোন্দল নিরসনের চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিন চলে আসা দলের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ তো থাকছেই। একই সঙ্গে সফরে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীর জনপ্রিয়তা যাচাই, জোটের প্রার্থীদের খোঁজখবরও নিচ্ছে টিমগুলো। সরকারের ৯ বছরের অভূতপূর্ব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রচার, বিএনপি-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড মানুষের সামনে তুলে ধরে উঠান বৈঠক, কর্মিসভা, জনসভা, পথসভাও হচ্ছে এ সফরে।

টিমের নেতৃত্বে থাকা একাধিক নেতা জানান, সফরের পর প্রতিটি টিম পৃথকভাবে তাদের প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছে। সে মোতাবেক আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন নির্ধারণ করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত