প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জয়তু একুশ, জয়তু মাতৃভাষা

অজয় দাশগুপ্ত : এদেশে আসে না ফাগুণ আসে একুশে ফেব্রুয়ারি। সৌভাগ্যই বলতে হবে। বাংলা তারিখে আট ফাল্গুন পালন করা হলে সারা দুনিয়ার বাঙালি একসঙ্গে একুশে পালন করতে পারত না। আমরা এমন এক জাতি কিছুতেই ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি না। বলছি একুশের কথা। এই একুশে আজ আসলে কি তার সেই চেতনা আর ঔজ্জ্বল্য নিয়ে আছে আমাদের সমাজে? একদিকে হিন্দি একদিকে মরু দেশের প্রভাব আরেকদিকে ইংরেজি। ছেলেমেয়েদের ভাষা গেছে পাল্টে। বলার কথা, লেখার ভাষা সব এমন লেজে গোবরে ভাবলেও শিউরে উঠি। যারা সাংবাদিক যারা মাইক্রোফোন হাতে টিভির পর্দায় তাদের অনেকের বাক্য অশুদ্ধ। অনেকের বাংলা শুনলে মনে হয় তাদের জন্ম আর কোনখানে, অন্য  কোনো দেশে। শুধু তারা নয়, দেশে-বিদেশে বাঙালির এক বিশাল অংশে আজ বাংলা প্রায় উধাও। কোথায় ইংরেজ ে  কোথাও ভারত বা পাকিস্তান আর কোথাও বা মরু হাওয়া। যার কারণে বাংলা মায়ের চোখে জল আর শুকোয় না।

একদিন আমরা সবাই বাঙালি হবার  আশায় মায়ের। চোখের পানি মুছিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। সেই প্রতিজ্ঞা এতটাই শক্তি ছিল ভাষার জন্য প্রাণ দিতেও কসুর করেনি অগ্রজেরা। আজ সেই ইতিহাস কেবল অতীত। দেশের বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কথায় আসি। এগুলোই তো লেখাপড়ার পীঠস্থান। অথচ আজকাল ফ্যাশন হচ্ছে নাম হবে ইংরেজিতে, নাম হবে মরু দেশের নামে! না হলে বাণিজ্য জমে না। এই প্রবণতা বিশাল  এক প্রজন্মকে ধীরে ধীরে নিজ দেশে পরদেশি করে তুলেছে। উন্নয়নের যে জোয়ার বা যে প্রক্রিয়া তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হওয়ার পরও ভাষাই পড়েছে বড় বিপদে। বাংলা বলা, বাংলা লেখাটা সাবেকী হয়ে আধুনিক হয়ে উঠছে অন্য ভাষা। এবং তাকেই বেগবান করছে সমাজ।

আমরা ভাষা আন্দোলন নিয়ে যত গর্ব করি না কেন এখনো আমাদের দেশে সব বিষয়ে বাংলায় বইপত্র মেলে না। আমাদের দেশে চিকিৎসা বিজ্ঞান কিংবা আইনের মতো বিষয়ে পাঠ্য মূলত বিদেশি ভাষার বই। অথচ কত ছোট ছোট  দেশ এ বিষয়ে স্বাবলম্বী। চাইলে আমরাও পারি। করি না। কেন জানি পোশাক, ভাষা আর আচরণে আজ আমরা ভিন  দেশের দাস হওয়ার জন্য আগ্রহী। অথচ আমাদের গর্বের দেশ গর্বের ইতিহাস অতীত এতটাই বিশাল তাতেই বাঁচা যায় কয়েক জীবন। মন খারাপ হয়ে যায় নাটকের কথ্য ভুল বাংলায়। মন মুষড়ে পড়ে লেখকের বানান ভুলে। কেন এমন আমরা? কেন আমাদের দেশের সব মানুষ শুদ্ধভাবে মাতৃভাষা পড়তে বা বলতে জানে না? অথচ এই আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিই ভাষাকে মা করে মহিয়সী করে রেখেছে, যা খুব কম জাতিতে দেখা যায়।

একুশের মহান দিনে আমরা যেন মনে রাখি, যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে জন কাহার জন্ম নির্নয় ন জানি।

একগ্লাস টলটলে জল, একবুক হাওয়া একজীবনের আলো আমাদের মাতৃভাষাকে যেন সবার ওপরে রাখি আমরা।  যেন মন খুলে গাইতে পারি, আমি তোমায় ভালোবাসি। একুশের দেশে মুক্তিযুদ্ধ ও উদারতাবিরোধী সব কিছু ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাক শুদ্ধ মাতৃধারায়। জয়তু একুশে ফেব্রুয়ারি।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত