প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভাষা এখন আমাদেরকে বিভাজিত করছে

রাজেকুজ্জামান রতন : ভাষা আন্দোলনের প্রধান অন্তর্নিহিত প্রেরণা ছিল গণতান্ত্রিক বোধ। যে দেশের শতকরা ৯৪ ভাগ মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষা কি তার মাতৃভাষা হিসেবে স্থান পাবে না? ভাষা কোন সম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে জনগণকে বিভাজিত করা নয় বরং এটি একটি সংস্কৃতি। যার মাধ্যমে মানুষকে তার জীবন যাপনের সাথে সামাজিকভাবে একটি বন্ধনে আবদ্ধ করে। এই কারণে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময়েও এই প্রশ্নটা এসেছিল, আমাদের সংস্কৃতির বন্ধনটা কি হবে? সেটা কি ভাষার ভিত্তিতে হবে নাকি ধর্মের ভিত্তিতে হবে? যার কারণে তখন মানুষ ভাষাভিত্তিক বন্ধনে অনেক বেশী আবদ্ধ হয়।

একারণে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ও ভাষার দাবীটা এসেছিল। ভাষা ভিত্তিক জাতিয়তাবাদ হবে কি না? তারপর আমরা দেখলাম, ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাজন হলো। আসলে ধর্মের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত কোন দেশ বিভাজন হয় নাই। ধর্মের ভিত্তিতে কোন দেশ টিকেও থাকে না। ফলে আবার দাবী উঠেছিল, ধর্ম নিরপেক্ষ একটি গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার। যেখানে মানুষের অধিকার আদায়ের কথা বলা হয়েছিল।
ভাষার ক্ষেত্রেও একই দাবী উঠে কিন্তু আমাদের দেশে ভাষার জন্য আন্দোলন হয়, শিক্ষার ক্ষেত্রে কেন নয়? ভাষা আমাদের অহংকার। এর জন্য আমাদের আন্দোলন করা প্রয়োজন।

শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের দেশে কোন মাধ্যমে পড়াতে হবে তা ঠিক করা হয় না। সতরাং শিক্ষার মাধ্যমটা অবশ্যই বাংলা ভাষায় হবে। তাহলে কী আমরা অন্য ভাষা শিখবো না ? হ্যাঁ শিখবো, তবে তা বাংলা মাধ্যমে। এই দাবীতে আমরা ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে পৌছলাম। কিন্তু পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র যেমন একটা বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র ছিল, বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখতে তারা ধর্মীয় বিভাজন করেছিল। তারই ধারাবাহিকতা কিন্তু আমাদের দেশের উপরও কিছুটা আছে। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশকে অসম্প্রদায়িক, শোষণ মুক্ত দেশ গড়ার একটি ইচ্ছা থাকলেও আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পর যারা ক্ষমতা আসে, তারা এই দেশকে একটি বৈষম্যমূলক দেশে পরিণত করেছে। এখন আমাদের দেশে তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

হতদরিদ্রদের জন্য মাদরাসা শিক্ষা, মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র জনগণের জন্য বাংলা মাধ্যম, আর উচ্চবিত্ত দের জন্য ইংরেজিীমাধ্যম। ফলে একই দেশে আমরা এখন তিন মনোভাবের লোক তৈরী করছি। যার টাকা আছে তার উচ্চ শিক্ষা আছে। আর উন্নত মানের শিক্ষা মানেই ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা যেমন উচ্চ বিত্ত লোক দের জন্য হয়ে গেছে, ঠিক তেমনি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার একটি আধিপত্য বাংলাদেশে তৈরী হয়েছে। এজন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত সব জায়গায় ইংরেজি মাধ্যমে করা হচ্ছে। বাংলা ভাষাকে গবেষণায় কাজে লাগানোর চাইতে ভাব বিনিময় করার কাজেই লাগানো হচ্ছে।

তাই আমাদের দেশে বাংলা ভাষাও এখন হয়ে দাড়িয়েছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মধ্যে মাপকাঠি হিসেবে। উচ্চবিত্তরা কথা বলবে ইংরেজিতে আর মধ্যবিত্ত হতদরিদ্ররা কথা বলবে বাংলায় । ফলে এবার আমরা আমাদের সংস্কৃতিকেও বিভাজিত করে ফেলেছি। ফলে আমরা মনে করি বাংলাদেশের এই ভাষার মাধ্যমে গণতন্ত্র সহ সকল ক্ষেত্রে একটি কোনঠাসা অবস্থা তৈরী হয়েছে।

পরিচিতি : কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাসদ
মতামত গ্রহণ : শাখাওয়াত উল্লাহ
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত