প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা

সজিব খান:  ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ পৃথিবীর বড় সবকাজেই পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সমান অবদান রয়েছে। আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

ভাষা আন্দোলনের শুরুটা মূলত পঞ্চাশ দশকের শুরু হলেও ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সেটা কঠিনভাবে রূপ নেয়। এরপর ক্রমেই এই আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ভাষার এ আন্দোলন সংগ্রামে নারীদের কী অবদান ছিল আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তা আপনাদের জন্য তুলে ধরা হল-

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা দাবির প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক জনসভায়। দ্বিতীয়বারের মতো শক্তিশালীভাবে বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২-র ফেব্রুয়ারিতে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক সমাবেশের আয়োজন করে। তদানীন্তন সরকার ভাষা আন্দোলনকে নস্যাত্ করতে এবং সমাবেশ বন্ধ করতে ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে হরতাল, সভা ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্তে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং পুলিশের লাঠিতে অনেকে আহত হয়। এদের মধ্যে রওশন আরা বাচ্চু, সুফিয়া আহমদ, হালিমা খাতুন, সারা তৈফুর, শামসুন্নাহার, ড. শরীফা খাতুন প্রমুখ অন্যতম। পুরুষদের পাশাপাশি এই নারীরা ৫২-তে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করেছিলেন।

৫২-এর ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার জন্যই যে সংগ্রাম হয়েছিল তা নয়। বিভাগোত্তর কালে প্রতিক্রিয়াশীল শাসন ব্যবস্থার ফলে বাঙালির জাতীয়তা, সংস্কৃতি ও জীবন ধারার ওপরে যে আঘাত এসেছিল তারই বিরুদ্ধে ৫২-এর আন্দোলন জনগণের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শুরুতে যাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল তারা হলেন আনোয়ারা খাতুন ও লিলি খান।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে করাচিতে তত্কালীন পাকিস্তানের গণপরিষদের বৈঠকে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ করার দাবি জানানো হয়। তখন পাকিস্তানের গণপরিষদে এই দাবির বিপক্ষে মতামত প্রকাশ করা হলে ঢাকার ছাত্র সমাজের মনে দারুণ ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তারা ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকার ফজলুল হক হল মিলনায়তনে এক বৈঠকের আয়োজন করেন।

সেই বৈঠকে এরা দু’জনেই উপস্থিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন নাদেরা বেগম। তিনি বামপন্থি রাজনীতি করতেন। ছাত্রজীবন থেকেই তার মধ্যে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের নেতৃত্বদানের জন্য তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি অন্যান্য রাজবন্দীর সঙ্গে কঠোর নির্যাতন ও অত্যাচারের শিকার হন।

কিন্তু তত্কালীন স্বৈরশাসকরা তার মনোবলে চিড় ধরাতে পারেনি। স্বৈরশাসন বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য সে সময় তিনি কিংবদন্তী চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন। সেই কঠোর ও অক্লান্ত সংগ্রামী নারীর কথা এখন হয়ত অনেকেই ভুলে গেছেন। ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের সঠিক তথ্য নেই। শুধু বিক্ষিপ্তভাবে কিছু তথ্য জানা যায়। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন কবি বেগম সুফিয়া কামাল। অনেক কর্মীর সঙ্গে তার ছিল নিবিড় যোগাযোগ। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে ভাষাকন্যা নাদেরা বেগম পুলিশের ঘেরাও থেকে আত্মগোপন করেছিলেন। সে সময় সুফিয়া কামালের বাসায় ছিলেন বোনের মেয়ের পরিচয়ে। নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দিয়েছিলেন জাহানারা।

মুনীর চৌধুরীর বোন নাদেরা বেগমকে হাটখোলার তারাবাগের বাসায় লুকিয়ে রেখেছিলেন সুফিয়া কামাল। কিছুদিন পর ঘটনাটা জানাজানি হয়ে গেলে পরে পুলিশ তাকে বন্দী করে। কারাগারে অন্য রাজবন্দীদের সঙ্গে তিনি কঠোর নির্যাতন ও অত্যাচারের শিকার হন। তার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সে সময় তিনি কিংবদন্তীতে পরিণত হন। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ছিলেন মমতাজ বেগম। তিনি সে সময় যুবলীগ নেতা শামসুজ্জোহা, সফি হোসেন খান এবং ড. মুজিবুর রহমানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। একপর্যায়ে তিনি কারাবরণ করেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, কারাগার থেকে বন্ড সই করে মুক্তিলাভে অস্বীকৃতি জানানোয় মমতাজ বেগমের স্বামী তাকে তালাক দেন। এজন্য তার সাজানো সংসার ভেঙে যায়। এছাড়া তার ছাত্রী ইলা বকশী ও বেনু ধরও কারাবন্দী হন। খুলনার স্কুলছাত্রী হামিদা খাতুন নারীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রচেষ্টায় লাঞ্ছিত হন। ভাষা আন্দোলনে যেসব নারীর প্রধান ভূমিকা ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম সিলেটের যোবেদা খাতুন চৌধুরী।

তার সহযোগিতায় ছিলেন শাহেরা বানু, সৈয়দা লুত্ফুন্নেসা, সৈয়দা নজিবুন্নেসা খাতুন, প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খাতুন প্রমুখ। সিলেটের ছাত্রী সালেহাকে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলনের জন্য তিন বছর বহিষ্কার করা হয়। বলাবাহুল্য, তার জীবনে আর পড়াশোনা হয়নি।

অনুলিখন: মোহাম্মদ ওমর ফারুক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত