প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দেশে কর্মরত বিদেশীর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি

তারেক : যদি প্রশ্ন করা হয়, ঢাকা শহরে কাকের সংখ্যা কত? উত্তরটা অনুমানের ভিত্তিতেই দিতে হবে। কারণ কাকের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থারই জানা নেই। একই অবস্থা দেশে কর্মরত বিদেশীদের সংখ্যার ক্ষেত্রেও। কোনো পরিসংখ্যান না থাকায় কর্মরত বিদেশীর সংখ্যা একেক সংস্থা একেকভাবে প্রকাশ করছে। এর আর্থিক ক্ষতিও নিরূপণ করছে ইচ্ছেমতো। তবে সব সংস্থাই একমত যে, ৭০ লাখ প্রবাসীর কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশই নিয়ে যাচ্ছেন বিদেশীরা। দেশে কর্মমুখী শিক্ষার অভাব এবং কর্মীদের দক্ষতার অভাবকেই এজন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন সরকারের দুর্বল নীতিকে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর বৈধ পথে রেমিট্যান্স হিসেবে কেবল ভারতে যায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। আর অবৈধ পথে বা হুন্ডির মাধ্যমে যায় অন্তত তিন গুণ অর্থ। অন্যান্য দেশে প্রতি বছর কত টাকা রেমিট্যান্স হিসেবে যায় তার কোনো হিসাব নেই। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে আয়কর রিটার্ন রয়েছে মাত্র ১১ হাজার বিদেশীর। বিদেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের সাথে জমাকৃত রিটার্ন অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ। এ প্রেক্ষাপটে বিদেশী কর্মীদের করের আওতায় আনতে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
২০১৬ সালে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাজেট বক্তৃতার একটি অংশ বই আকারে প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ‘দক্ষতা উন্নয়ন উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এক বাজেট পুস্তিকায় বলা হয়, ‘বর্তমানে ৭০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছে এবং এরা প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠায়। এর বিপরীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২ লাখ বিদেশী কাজ করে। বেতন-ভাতা বাবদ এরা প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি ডলার নিয়ে যায়।’ দক্ষতার ঘাটতির কারণে প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকদের আয় অন্যান্য দেশের প্রবাসী শ্রমিকদের চেয়ে কম মন্তব্য করে এতে বলা হয়, প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকদের মধ্যে স্বল্প দক্ষ ৫২ শতাংশ, ৩১ শতাংশ দক্ষ, ১৪ শতাংশ আধা-দক্ষ ও মাত্র ২ শতাংশ পেশাজীবী।
অথচ গত রোববার সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তরকালে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য এ কে এম মাঈদুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, বিভিন্ন পেশায় বর্তমানে ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশী নাগরিক বাংলাদেশে কর্মরত রয়েছেন। প্রায় দুই লাখ বিদেশী নাগরিক বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৪০ হাজার কোটি টাকা নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছেন- এমন মন্তব্যধর্মী প্রশ্নের উত্তরে আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বিদেশী নাগরিকরা বিশেষজ্ঞ, কান্ট্রি ম্যানেজার, কনসালট্যান্ট, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার, মার্চেন্ডাইজার, টেকনিশিয়ান, সুপারভাইজার, চিকিৎসক, নার্স, ম্যানেজার, প্রকৌশলী, প্রোডাকশন ম্যানেজার, ডিরেক্টর, কুক, ফ্যাশন ডিজাইনার ও শিক্ষক ক্যাটাগরিতে কাজ করেন।
তালিকা অনুযায়ী, ৪৪টি দেশের মধ্যে সর্বাধিক ভারতের ৩৫ হাজার ৩৮৬ জন এবং সর্বনি¤œ উজবেকিস্তানের ১০৩ জন নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করছেন। ভারতের পরেই রয়েছে চীনের ১৩ হাজার ২৬৮ জন, জাপানের ৪ হাজার ৯৩ জন, দক্ষিণ কোরিয়ার ৩ হাজার ৩৯৫ জন, মালয়েশিয়ার ৩ হাজার ৮০ জন, শ্রীলঙ্কার ৩ হাজার ৭৭ জন, থাইল্যান্ডের ২ হাজার ২৮৪ জন, যুক্তরাজ্যের ১ হাজার ৮০৪ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৪৪৮ জন, জার্মানির ১ হাজার ৪৪৭ জন, সিঙ্গাপুরের ১ হাজার ৩২০ জন, তুরস্কের ১ হাজার ১৩৪ জন। এ ছাড়া এক হাজারের নিচে আছে বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিক। দেশের শিল্প কারখানায় বিদেশী শ্রমিক নির্ভরতা কমিয়ে আনতে মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের সুপারভাইজার ও ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পুস্তিকায় বলা হয়, কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে দক্ষতার ঘাটতির কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্প কারখানায় বিশেষত টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকশিল্পে প্রচুরসংখ্যক বিদেশী ব্যবস্থাপক ও কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে সরকারের সতর্কতা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে বলেন, অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের বিরুদ্ধে ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট মোতাবেক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তা ছাড়া যেসব বিদেশী নাগরিক ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণের পরও বাংলাদেশে অবস্থান করছেন তাদের অবস্থান ও কার্যকলাপের প্রতি স্পেশাল ব্রাঞ্চসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজনীয় নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে বৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশী নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ। আর অবৈধ বিদেশীর সংখ্যা এর কয়েক গুণ বেশি। এদের মধ্যে মাত্র ১০ হাজার ৮৫ জন সরকারি কোষাগারে আয়কর জমা দেন। আশার কথা, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশীদের কর ফাঁকি শূন্যে নামিয়ে আনতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করেছে সরকার। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বসানো হচ্ছে দু’টি আয়কর গোয়েন্দা সেল। এর বাইরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে তিনটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের স্পেশাল ব্র্যাঞ্চ, এফবিসিসিআই, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিও রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক বিদেশী নাগরিক টুরিস্ট ভিসার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও পরে বিভিন্ন কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। আবার বিভিন্ন কোম্পানির ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে আসা বিশেষ করে এনজিও, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রকৌশল, চিকিৎসা, গার্মেন্ট, মার্চেন্ডাইজিং, পরামর্শকসহ অন্য বিদেশীদের বেতনভাতা গোপন রাখা হচ্ছে। মূলত কর ফাঁকি দিতেই এ কৌশল অবলম্বন করছে অনেক দেশীয় নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। এর প্রেক্ষিতে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ দেশে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দেশে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের কর ফাঁকির ঘটনায় ক্ষেভ প্রকাশ করে ইউরোপ প্রবাসী সিদ্দিকুর রহমান বলেন, প্রবাসে আমরা প্রতিনিয়ত বিদেশী আইনকানুনের কশাঘাতে নিষ্পেষিত হয়ে ডলার কামিয়ে নিজ দেশে পাঠিয়ে যাচ্ছি। অথচ আমাদের দেশে অন্য দেশের মানুষ টুরিস্ট ভিসায় এসে কোনো ধরনের ট্যাক্স না দিয়ে আমাদের রক্ত পানি করা উপার্জন আমাদেরই চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বিদেশে আমাদের এক দিনের আকামা বা আইডি বা ভিসা না থাকলে ওদের পুলিশ আমাদের সাথে ইঁদুর বিড়াল খেলায় লিপ্ত হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে বছরের পর বছর অবৈধভাবে থাকার পর ওরা এয়ারপোর্টে নামমাত্র জরিমানা দিয়ে নিজ দেশে ফেরত যাচ্ছে। যেখানে বিদেশে আমাদের শ্রমিকদের শুধু ভিসা না থাকার কারণে জেলের ঘানি টানতে হচ্ছে, একটা টিকিটের টাকা জোগাড় করতে না পেরে জেলে পচে মরছে। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পাচার ঠেকাতে কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি বিদেশীদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে আরো সতর্ক হওয়ার আহবান জানান তিনি। সূত্র : নয়াদিগন্ত

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত