প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দেশের ৪০ শতাংশের বেশি শিশু অপুষ্টিজনিত রোগে ভুগছে

আল-আমীন আনাম: বাংলাদেশের শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ ‘অপুষ্টি’। শিশুস্বাস্থ্যে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হলেও সে তুলনায় অপুষ্টির হার কমানো সম্ভব হচ্ছে না। দেশের ৫ বছর বয়সী শিশুদের মোট সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এর মধ্যে শতকরা ১৪ ভাগ শিশু রয়েছে মারাত্মক অপুষ্টিসীমায়। অপরদিকে ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশের প্রতি ১৯ শিশুর একজনকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ শিশুই মৃত্যুবরণ করে অপুষ্টিজনিত কারণে। বর্তমানে দেশের ৪০ শতাংশের বেশি শিশু অপুষ্টিজনিত রোগে ভুগছে।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে যে পরিমাণ ক্যালসিয়াম-প্রোটিনের প্রয়োজন হয়, শহরের দরিদ্র পরিবার, বিশেষ করে বস্তির শিশুরা তা পায় না। খাবার বলতে তাদের কাছে শুধু শর্করা। স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় এ পুষ্টির অভাবে খর্বকায় হয়েই বেড়ে উঠছে এসব শিশু।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খুরশীদ জাহান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিশুকে প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার না দিলে সে বেঁটে হয়। রোগ সংক্রমণ, অস্বাস্থ্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও বয়স অনুযায়ী উচ্চতা না বাড়ার জন্য দায়ী। খাবার সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে সস্তা খাবার থেকেও প্রয়োজনীয় ক্যালরি ও প্রোটিন পাওয়া সম্ভব।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার বস্তিতে গিয়ে দেখা গেছে, তিন/চারটি শিশু মাটিতে বসে খেলছে। তাদের সবার বয়স কম-বেশি তিন বছর। সবারই জিরজিরে শরীর, শরীরের তুলনায় পেট বড়। এই শিশুদের একজন রাবেয়া। তার বয়স সাড়ে তিন। এই শিশুটির মায়ের শারীরিক অবস্থাও ভালো নয়।

রাবেয়ার মা পারভিন আক্তার বলেন, আমাদের প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় বেশির ভাগ সময় থাকে সবজি ও শুঁটকি। মাছ থাকে খুব কম। থাকলেও পাঙাশ বা তেলাপিয়া মাছ। মাংস, দুধ বা ফলমূল খাওয়া তেমন হয় না। পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানালে পারভিন আক্তার বলেন, ‘চাউল-ডাইল কেনতে পারি না। পোলাপানরে পুষ্টি খাওয়াবো কি ভাবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ডা. মো: আতিয়ার রহমান বলেন, অপুষ্টির পেছনে খাদ্য অবশ্যই একটি বড় কারণ। তবে বাংলাদেশের বস্তিতে অপুষ্টির অন্যতম কারণ সংক্রামক রোগ। আর এ জন্য বস্তির নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশই দায়ী। এ ছাড়া, খাদ্যের অভাবের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের ফলেও শিশুরা অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়।

শিশু খর্বাকৃতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনটি প্রতিবন্ধকতা উল্লে­খ করে পুষ্টিবিদ তামান্না চৌধুরী বলেন, প্রথমত, খর্বাকৃতির মানুষ সম্পর্কে সকলের ধারণা সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা অথবা বাবা-মা খাটো তাই সন্তানও খাটো হয়। মানুষের এই ভুল ধারণা ভেঙে দেয়াটাও একটা চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ হাত ধোয়ার উপকারিতা সম্পর্কে জানলেও এর প্রয়োগটা খুবই কম। তৃতীয়ত, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুষ্টির প্রয়োজনীয়তার কথা জানলেও সেই জনগোষ্ঠীর জন্য পুষ্টি নিশ্চিত করাও একটা চ্যালেঞ্জ।

২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘অ্যান অ্যাসেসমেন্ট অন কাভারেজ অব বেসিক সোশ্যাল সার্ভিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং খাদ্যনিরাপত্তায় বেশ অগ্রগতি হয়েছে। তবে দেশের সার্বিক পুষ্টিচিত্র সন্তোষজনক নয়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু, কিশোরী ও নারী এখনো অপুষ্টিতে ভুগছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ, বিবিএস, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ইউনিসেফের যৌথভাবে করা এই জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, শিশুদের অপুষ্টির পেছনের মূল কারণ অপর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়ানো এবং সম্পূরক খাবার, খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্যের অভাব ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস।

পরিস্থিতির উন্নয়নে স্থানীয় সরকার হিসেবে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা কী জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হাসান বলেন, সিটি করপোরেশন বস্তির স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কাজ করছে। পুষ্টিপরিস্থিতি উন্নয়নের বিষয়টিও আসছে তাতে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত