প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আপিলে আইনজীবীদের যুক্তি
খালেদা জিয়া অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন উল্লেখ করে দণ্ড দেওয়া হয়

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাঁর অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন উল্লেখ করে দণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে আপিলে যুক্তি দেখিয়েছেন তার আইনজীবীরা।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২৫ যুক্তিতে আপিল করেছেন তাঁর আইনজীবীরা। এর মধ্যে একটি যুক্তিতে এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিকেলে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল দায়ের করা হয়। রায়ের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে আপিলের যুক্তিতে বলা হয়েছে, বিচারক রায়ের একটি অংশে খালেদা জিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনের দেওয়া জবানবন্দির ভেতরে প্রশ্নবোধক (?) চিহ্ন না দিয়ে দাঁড়ি ব্যবহার করেছেন। এতে খালেদা জিয়া তাঁর অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন উল্লেখ করে দণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ে বিচারক বলেন, ‘আসামী বেগম খালেদা জিয়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারার বিধান মোতাবেক আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য প্রদানের সময় নিজ জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন যে, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।’

কিন্তু খালেদা জিয়া সরকারের উদ্দেশে প্রশ্ন করে বলেছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার কে করেছেন?

এই তথ্য জানিয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, খালেদা জিয়ার নামে এই বক্তব্য বিচারকের আমদানিকরা। তিনি বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে সাক্ষ্য, প্রমাণ ও তথ্য-উপাত্তের মধ্যে মিল নেই।

আদালতে দেওয়া খালেদা জিয়ার মূল জবানবন্দির বরাত দিয়ে আপিলের ৫৬ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে যে, ‘আমার নামে দায়ের করা সকল মামলাই করা হয়েছে অসত্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে।’

জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘জবানবন্দিতে খালেদা জিয়া একটি বাক্যে ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত সরকারের অভিযোগের জবাবে প্রশ্নবোধক চিহ্ন উল্লেখ করে বলেছেন, ‘‘‌আমি কি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছি?’’ অথচ রায়ে বিচারক এই শব্দ বিকৃতি করে প্রশ্নবোধক চিহ্ন উঠিয়ে দিয়েছেন।’

আপিলের একই পৃষ্ঠায় খালেদা জিয়ার বরাত দিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের কিছু কর্মকাণ্ড উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে নির্বিচারে গুলি করে প্রতিবাদী মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। ছাত্র-শিক্ষকদেরও হত্যা করা হচ্ছে। এগুলি কি ক্ষমতার অপব্যবহার নয়? ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি? শেয়ারবাজার লুট করে লক্ষ কোটি টাকা তসরুপ হয়ে গেল। নিঃস্ব হলো নিম্ন আয়ের মানুষ। …….. এই মামলায় আমাকে কেন অভিযুক্ত করা হয়েছে তাও আমার বোধগম্য নয়।

আমার বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জনগণের কাছে এটা পরিষ্কার যে, এর প্রতিটি মামলায় আমার বিরুদ্ধে করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে। সবগুলো মামলাই করা হয়েছে অসত্য, ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে।’

এ ছাড়া যেসব যুক্তিতে খালেদা জিয়ার পক্ষে আপিল করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো- খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা করা হয়েছে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ এর ২ ধারায়। কিন্তু এই আইনে তাঁকে সাজা দেওয়া হয়নি। সাজা দেওয়া হয়েছে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারার বিধান মোতাবেক। এই বিধির সাজা এখানে প্রযোজ্য হবে না।

খালেদা জিয়ার প্যানেল আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির ২২১, ২২২, ২২৩, ২৩৫, ২৩৯ অনুযায়ী মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। যা সম্পূর্ণ বেআইনি। এভাবে মোট ২৫টি যুক্তি দাখিল করে আদালতে আপিল করা হয়েছে।

আপিলের যুক্তিতে বলা হয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা পক্ষপাতমূলকভাবে খালেদা জিয়াকে এ মামলায় সম্পৃক্ত করেছেন। প্রথম যিনি দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি খালেদা জিয়াকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা খালেদা জিয়াকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন।

যুক্তিতে বলা হয়, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করেছি’ বাক্যের পরে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছিল। কিন্তু তা সরাসরি খালেদা জিয়ার বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করে বিচারিক মননের প্রয়োগ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন আদালত।

আপিলে বলা হয়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডে কোনো ধরনের অনিয়ম থাকত তা প্রতিকারের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। তা কোনোভাবেই দুদক আইনের পর্যায়ে পড়ে না। ট্রাস্টের অর্থ লেনদেনে খালেদা জিয়ার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। রাষ্ট্রের কোনো টাকা আত্মসাৎ হয়নি। ওই টাকা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আজ বিকেল ৩টার দিকে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চে আপিল আবেদন উপস্থাপন করা হয়। আদালত আপিলটি গ্রহণ করে শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন।

ওই দিন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন করা হবে বলে এনটিভি অনলাইনকে জানিয়েছেন আইনজীবী কায়সার কামাল ও মুজিবুর রহমান।

৬০ পৃষ্ঠার মূল আপিলে খালেদা জিয়ার আপিল গ্রহণের জন্য এবং তাঁর জরিমানা স্থগিত ও দণ্ড বাতিল চাওয়া হয়েছে।

এদিকে আপিল করার আগে আজ সুপ্রিম কোর্ট বারের হলরুমে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন খালেদা জিয়ার সিনিয়র আইনজীবীরা। এতে অংশ নেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, আবদুর রেজাক খান, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, সানাউল্লাহ মিয়া, আমিনুল ইসলাম ও মাসুদ আহমেদ তালুকদার।

গতকাল সোমবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দীন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে ১০ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ এবং দুই কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সাজা ঘোষণার পর খালেদা জিয়াকে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে। রায়ে আসামি তারেক রহমান, শরফুদ্দীন আহমেদ ও মমিনুর রহমানকে পলাতক দেখানো হয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ‘আসামী ১) বেগম খালেদা জিয়া এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসিকিউশনপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় তাঁকে দন্ড বিধির ৪০৯/১০৯ ধারা বিধান মোতাবেক ০৫ (পাঁচ) বৎসরের সশ্রম কারাদন্ড এবং আসামী ২) তারেক রহমান (পলাতক), ৩) কাজী সালিমুল হক ওরফে কাজী কামাল, ৪) শরফুদ্দীন আহমেদ, ৫) ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী (পলাতক) এবং ৬) মমিনুর রহমান (পলাতক) এর বিরুদ্ধেও আনীত অভিযোগ প্রসিকিউশনপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় দন্ড বিধির ৪০৯/১০৯ ধারার বিধান মোতাবেক ১০ (দশ) বৎসরের সশ্রম কারাদন্ড এবং বর্ণিত সকল আসামীকে ২,১০,৭১,৬৪৩/৮০ (দুই কোটি দশ লক্ষ একাত্তর হাজার ছয় শত তেতাল্লিশ টাকা আশি পয়সা) অর্থ দন্ডে দন্ডিত করা হলো। উক্ত অর্থ দন্ডের টাকা সাজা প্রাপ্ত ব্যক্তিগণ কর্তৃক প্রত্যেককে সম অংকে প্রদান করতে হবে। আরোপিত অর্থ দন্ডের টাকা রাষ্ট্রের অনুকুলে বাজেয়াপ্ত বলে গণ্য হবে। আগামী ৬০ (ষাট) দিনের মধ্যে তাদের প্রত্যেককে উক্ত টাকা রাষ্ট্রের অনুকুলে আদায় দেওয়ার নির্দেশ দেয়া গেল।

জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্টের নামীয় সোনালী ব্যাংক, গুলশান নিউ নর্থ সার্কেল শাখা, ঢাকায় রক্ষিত এসটিডি-৭ নং হিসাবে জমাকৃত সাকুল্য টাকা রাষ্ট্রীয় অনুকুলে বাজেয়াপ্ত করা হলো।’

রায়ে আরো বলা হয়েছে, ‘দণ্ডিত ব্যক্তিগণের হাজতবাস (যদি থাকে) মূল দন্ডাদেশ থেকে বিধি মোতাবেক কর্তিত হবে। আসামী বেগম খালেদা জিয়া, কাজী সলিমুল হক ওরফে কাজী কামাল এবং শরফুদ্দীন আহমেদকে সি/ডাব্লিও মূলে কারাগারে প্রেরণ করা হোক। দন্ডিত কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, তারেক রহমান এবং মমিনুর রহমান পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা ইস্যু করা হোক। পুলিশ কর্তৃক ধৃত বা দন্ডিত ব্যক্তি আত্মসমর্পণের তারিখ থেকে উক্ত দন্ডাদেশ কার্যকর হবে।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

২০১০ সালের ৫ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপপরিচালক হারুন-আর রশিদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।

সর্বাধিক পঠিত