প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বইয়ের পাতায় একাত্তরের বীরত্বগাথা

ডেস্ক রিপোর্ট : বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা। লক্ষ প্রাণ আর দীর্ঘ ত্যাগ তিতিক্ষার পরই বাঙালি অর্জন করেছে স্বাধীনতার স্বাদ। আর এই ত্যাগ আর আবেগ ধারণ করে থাকা ইতিহাস, প্রকাশিত হয় বইয়ের পাতায় পাতায় ছাপার অক্ষরে। কিন্তু নানা বিষয়ের ভিড়ে কতটুকু গুরুত্ব পায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই?
সময় প্রকাশনীর প্রকাশক ফরিদ আহমেদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে ফিকশন রচিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে কবিতা রচিত হচ্ছে। তাম্রলিপির প্রকাশক এ কে এম তারিকুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যাপক আকারে গবেষণা হওয়া উচিত। আমরা আমাদের সীমিত সময়ের মধ্যে সীমিত অর্থ ব্যয় করে যতটুকু করা সম্ভব করেছি।

প্রকাশকরা জানালেন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থের সবচেয়ে বড় ক্রেতা তরুণ ও কিশোররা। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক রচনার প্রতি সব বয়সী পাঠকের আগ্রহ থাকলেও নবীনদের আগ্রহের মাত্রাটা অনেক বেশি। ফলে প্রকাশকরাও এসব বই প্রকাশে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। সেই সূত্র ধরে প্রতিবছরই মেলায় আসছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নতুন নতুন বই। তথ্যসংবলিত বইয়ের পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস কিংবা কবিতার চরণেও উঠে আসছে একাত্তরের বীরত্বগাথা।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ের প্রতি পাঠকদের রয়েছে অন্যরকম আগ্রহ। আমাদের উপন্যাস, গল্পের একটি বিশাল জায়গাজুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। ফলে প্রকাশকরাও এসব বই প্রকাশে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। সেই সূত্র ধরে প্রতিবছরই মেলায় আসছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নতুন নতুন বই। তথ্যসংবলিত বইয়ের পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস কিংবা কবিতার চরণেও উঠে আসছে একাত্তরের বীরত্বগাথা।

মুক্তিযুদ্ধের বই নিয়ে বলতে গিয়ে লেখক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, একটা সময় ছিল দেশে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা যেত না। মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের পরিচয় দিতেন না। এমন সময় ছিল রাজাকাররা দেশের মন্ত্রী হয়েছিলেন। সেই সময় আজ গত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনালালিত সময় ফিরে এসেছে। এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমাদের ভবিষ্যত গড়বার সময়।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখি চলছে অবিরাম। মুক্তিযুদ্ধের অজানা ইতিহাস, যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথন, যুদ্ধের ভয়াবহতা, পাকিস্তানিদের বর্বরতা, যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ ইত্যাদি নানা বিষয় গবেষণা, প্রবন্ধ, ইতিহাস রচনা, উপন্যাস, গল্প, কবিতা হয়ে বার বার ফিরে আসে। আসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। গ্রন্থমেলায় প্রায় প্রতিদিনই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একাধিক বই প্রকাশ হচ্ছে। আর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইগুলোর প্রতি পাঠকের অন্যরকম আগ্রহ রয়েছে। যে কারণে, ছোট-বড় সব প্রকাশনাই প্রতি বছর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই প্রকাশ করছে। বইগুলোর কাটতিও বেশ ভালো। আর বই প্রকাশের এ ধারবাহিকতা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিচ্ছে নতুন প্রজš§কে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখালেখিতে নতুন কিছু আসা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন। তিনি বলেন, আমার কাছে মনে হয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গত ৪৫ বছরে যা লেখা হয়েছে তারই চর্বিত চর্বণ হচ্ছে। গবেষণার মধ্য দিয়ে নতুন কিছু আসছে না।
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক ভালো ভালো উপন্যাস, গল্প লেখা হয়েছে। সৈয়দ শামসুল হক, মাহমুদুল হক, সেলিনা হোসেন, হুমায়ূন আহমেদসহ আমারও মুক্তিযুদ্ধনির্ভর অনেক উপন্যাস রয়েছে উল্লেখ করার মতো। আমার লেখা ‘সাড়ে তিন হাত ভূমি’ ও ‘নয় মাস’ উপন্যাস দুটিই মুক্তিযুদ্ধনির্ভর। খুব খেয়াল করেছি তরুণ লেখকরাও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনেক গল্প উপন্যাস লিখছেন।
মেলা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি স্টলেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ের প্রতি পাঠকের রয়েছে সহজাত আগ্রহ। তাম্রলিপি গতবছর প্রকাশ করেছে ৬৪ খণ্ডের ৬৪ জেলার ‘কিশোর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, এটা খুবই আশার বিষয় যে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের বই মেলায় প্রকাশ পাচ্ছে।
কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনুপের সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বেশ কয়েকটি বই কিনে ঘুরছিলেন মেলা প্রাঙ্গণে। এ বইয়ে তার আগ্রহের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাঙালি জাতির সত্তা। তাই এ বিষয়টি আমরা জানতে চাই পুরোপুরিভাবে। সে জন্যই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এ বইগুলোর প্রতি আগ্রহ।
বাংলা একাডেমির দেয়া তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত নতুন বইয়ের মধ্যে ৫২টি মুক্তিযুদ্ধের বই বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- মাহবুবুল আলম বিপ্লবের ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১’, আহমেদ রিয়াজের ‘মুক্তিযুদ্ধের সাত বীর কিশোর’ (পার্ল পাবলিকেশন্স); সালেক খোকনের ‘যুদ্ধাহতের ভাষ্য’, শেখর কুমার সান্যালের ‘একাত্তরের পথে প্রান্তরে’ ও মনি হায়দারের ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প’ (কথাপ্রকাশ); বের্নোর অরি লভির ‘বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হচ্ছিল’ (আদর্শ); মুনতাসীর মামুন ও চৌধুরী শহীদ কাদেরের ‘গণমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’, ড. আবু সাইয়িদের ‘গণহত্যা ১৯৭১’, হাবিব হাওলাদারের ‘মুক্তিযুদ্ধে ছয় ভাই’, কর্নেল মোহাম্মদ আবদুল সালামের ‘একাত্তরের একজন মুক্তিযোদ্ধা’ (অনন্যা); মেজর নাসিরউদ্দিনের ‘বাংলাদেশ: বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর’, মো. মোজাম্মেল হকের ‘১৯৭১: উত্তাল মার্চের দিনগুলি’, আসাদুজ্জামান আসাদের ‘যুদ্ধজয়ের প্রস্তুতি’ (আগামী প্রকাশনী); হাবিবুর রহমানের ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা’ (পাঞ্জেরী), একেএম শাহনাওয়াজের ‘মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১: হাজার বছরের উত্তরাধিকার’ (অবসর); আবুল মাল আবদুল মুহিতের ‘স্মৃতি অম্লান ১৯৭১’, সাজ্জাদ শরিফ সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের মহানায়কের’ (প্রথমা); মোরশেদ শফিউল হাসানের ‘স্বাধীনতা পটভূমি : ১৯৬০ দশক’ ও সিদ্দিকুর রহমানের অনুবাদে বরার্ট পেইনের ‘সেই দুঃসময়’ (অনুপম); আন্দালীব রাশদীর ‘একাত্তরের দলিল’, সেলিনা হোসেনের মুক্তিযুদ্ধের কিশোর উপন্যাস’, শ্যামলী নাসরীন চৌধুরীর ‘ডা. আলীম চৌধুরী’ (আলোঘর); আরিফ রহমানের ‘মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধ কিছু বিভ্রান্তির জবাব’ ও ‘একাত্তরের ঘাতকদের বিচারে মুসলিম আইডেন্টিটির অপব্যবহার’ (শব্দশৈলী); মোস্তফা কামালের ‘অগ্নিপুরুষ’; আসাদ চৌধুরীর ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ (বাংলা একাডেমি); মোস্তফা জব্বারের ‘একাত্তর ও আমার যুদ্ধ’, (সূচিপত্র) ইত্যাদি।
নতুন বই: বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল মেলার ১৯তম দিনে নতুন ১৪১টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- সুধাংশ শেখর রায়ের ‘সাংবাদিকতা, সাংবাদিক, সংবাদপত্র’ ও রাহাত মিনহাজের ‘প্রতিবেদন লেখার প্রথম পাঠ’ (পলল); শেখ আবদুল হাকিমের ‘১১টি নভেলা’ ও ‘সাতটি নভেলা’ (সালমা বুক ডিপো); মঈনুল হাসান ও মোজাফ্্ফর হোসেনের ‘কল্পে গল্পে ইলিশ’ (মূর্ধণ্য); হামিম কামালের ‘কারকানার বাঁশি’ (অনিন্দ্যপ্রকাশ); ইমদাদুল হক মিলনের ‘রমাকান্ত ও সতেরোটি বাচ্চাকাচ্চা’ (অনন্যা); আখতার হুসেনের ‘বাঘের ছানার নাম সোনালি’ (চন্দ্রদ্বীপ); কাওছার মাহমুদের ‘দুই পকেট হাসি’ (পাঞ্জেরি); আমীরুল ইসলামের ‘মায়ের জন্য ভালোবাসা’ (কথাপ্রকাশ); অসীম সাহার ‘প্রতিশীল সাহিত্যের ধারা’ (চিরদিন)।
মূলমঞ্চের আয়োজন: গতকাল বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, সেলিম জাহান এবং ফাহমিদা খাতুন। সভাপতিত্ব করেন হাসনাত আবদুল হাই। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় সামিউন জাহান দোলার একক অভিনয়ে ধ্রুপদী অ্যাক্টিং স্পেসের নাটক ‘নভেরা’।
আজকের অনুষ্ঠানসূচি: আজ মঙ্গলবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ২০তম দিন। মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস: বহুত্ববাদ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের চার রাষ্ট্রনীতি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আকসাদুল আলম। আলোচনা করবেন সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও মাহবুবুল হক। সভাপতিত্ব করবেন শামসুজ্জামান খান। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সূত্র : মাবন কন্ঠ

সর্বাধিক পঠিত