প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পুরনো প্রকাশনীগুলো হারাচ্ছে জৌলুস

‘অল্প পুঁজি, বড় স্বপ্ন’- এ শিরোনামে রোববার মেলায় প্রথম অংশ নেওয়া প্রকাশনা সংস্থাগুলোর খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কেমন চলছে পুরনো প্রকাশনা সংস্থাগুলো- সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, দুই-একটি বাদে বেশিরভাগ পুরনো প্রকাশনা সংস্থাই হারিয়েছে জৌলুস। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পথিক যেমন ক্লান্ত, তেমনি প্রকাশনা সংস্থাগুলোতেও পড়েছে ক্লান্তির ছাপ। মালিকানা বদল, নতুনের উত্থানে পুরনো প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কর্মে মরিচা ধরেছে। তবে এখনও নিজেদের স্বর্ণযুগে প্রকাশিত ধ্রুপদী সাহিত্য সম্ভার নিয়ে এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলাতে রয়েছে চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাটের দশকের প্রকাশনা সংস্থাগুলো। তারা আজকের বিখ্যাত লেখক-কবিদের প্রথম জীবনের সৃষ্টি সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে। সব মিলিয়ে অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা।

প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী তার বন্ধু আইনুল হক খানের সঙ্গে ১৯৪৮-৪৯ সালে গড়ে তোলেন প্রকাশনা সংস্থা নওরোজ কিতাবিস্তান। প্রকাশনীটির নামকরণ করেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধসহ নানা বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই এখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রকাশনী থেকে সত্যজিৎ রায়ের প্রায় সব বই; যেমন ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু এখান থেকেই প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র উপন্যাস ‘লালসালু’ এখান থেকেই প্রকাশিত হয়েছে, যা প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৪৯ সালে।

১৯৫৪ সালে যাত্রা শুরু করে আহমদ পাবলিশিং হাউস। প্রায় সাড়ে ছয় দশকের পুরনো এই প্রকাশনা সংস্থা এখনও রয়েছে মেলায়। প্রকাশ করছে নতুন নতুন বই। তবে পুরনো বইগুলোই এখানে বেশি; বিক্রিও ভালো সেগুলোর। এখান থেকে প্রকাশ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাষা আন্দোলন নিয়ে মুনীর চৌধুরীর অমর নাটক ‘কবর’, আবুল মনসুর আহমদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’। এ ছাড়া বহুল পঠিত রম্যরচনা ‘ফুড কনফারেন্স’ প্রকাশ পায় ১৯৬৯ সালে। বিস্ময়করভাবে ১৯৪২ সালের একটি বইয়ের দেখা মিলল এ প্রকাশনা সংস্থার স্টলে। গোলাম মোস্তফার লেখা ‘বিশ্বনবী’ ওই বছরের অক্টোবরে প্রথম প্রকাশ হয়েছিল।

সেই থেকে সাত দশক পরেও বইটি প্রকাশিত হচ্ছে।

আহমদ পাবলিশিং হাউসের ব্যবস্থাপক রবিউল হোসেন সমকালকে বলেন, পুরনো বইগুলোর প্রতি এখনও পাঠকের আগের মতোই আগ্রহ রয়েছে। ফলে সেই বইগুলো বারবার পুনর্মুদ্রণ করা হচ্ছে।

আহমদ পাবলিশিং হাউসের সঙ্গে একই বছর যাত্রা শুরু করে আরেকটি ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থা মাওলা ব্রাদার্স। পুরনো প্রকাশনা সংস্থাগুলোর মধ্যে মাওলা ব্রাদার্সই এখনও নিয়মিত নানা বিষয়ে বই প্রকাশ করে চলেছে। শিক্ষামূলক পুস্তক প্রকাশনা হিসেবে যাত্রা শুরু করা মাওলা ব্রাদার্স ১৯৬১ সালে আবদুস শাকুরের ‘ক্ষীয়মাণ’ প্রকাশ করে। এর পর সৈয়দ শামসুল হকের ‘রক্তগোলাপ’, ‘অনুপম দিন’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’র মতো পাঠকপ্রিয় বই প্রকাশ করেছে। চলতি বছর এ প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশ পাচ্ছে ৬৯টি নতুন বই।

মাওলা ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী আহমেদ মাহমুদুল হক বলেন, পুরনো অনেক প্রকাশনা সংস্থা জৌলুস হারাচ্ছে- এটা সত্য। কারণ বংশানুক্রমিক চলে আসা এ ব্যবসায় বেশিরভাগ প্রকাশনা সংস্থা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। ফলে তারা হারিয়ে যাচ্ছে।

১৯৬৮ সালে যাত্রা শুরু করে খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি। ১৯৭২ সালে এখান থেকে প্রকাশিত হয় জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’। তবে এখন আর এই প্রকাশনা সংস্থায় বইটি নেই। নতুন করে পরিমার্জন করে বইটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। এখানে রয়েছে কবি নির্মলেন্দু গুণের জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থগুলো। এই প্রকাশনা সংস্থা থেকেই ১৯৭০ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত হয় ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তার আরেক বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’। একই বছরের জুনে এখান থেকে প্রকাশিত হয় আরেক পাঠকপ্রিয় কবি মহাদেব সাহার ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’। এ ছাড়াও এখন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আহমদ ছফার রচনাবলি।

স্টলের দায়িত্বে থাকা তোতা মিয়া জানান, বর্তমানে পাঠ্যপুস্তকনির্ভর বই বেশি প্রকাশ করা হচ্ছে। এর ফলে সৃজনশীল বইয়ের সংখ্যা কম। বর্তমান স্বত্বাধিকারী কেএম ফিরোজ খানের বাবা খান ব্রাদার্স শুরু করেন। এখন তিনিই প্রতিষ্ঠানের সব দেখাশোনা করেন।

শহীদ বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আনোয়ার পাশা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রচনা করেছিলেন ‘রাইফেল, রোটি, আওরাত’। বছর বিশেক আগে যা প্রকাশ করে স্টুডেন্ট ওয়েজ। তবে এরও অনেক আগে ১৯৫১ সালে যাত্রা শুরু করেছিল স্টুডেন্ট ওয়েজ। প্রথম থেকেই অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশ নেওয়া এ প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে দারুণ কিছু বই। রয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের ‘কুহেলিকা’। বেদুঈন সামাদের ‘বেলা শেষে’ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। বিপুল বিক্রি হওয়া বইটি এখনও নিয়মিত প্রকাশ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। রয়েছে দীনেশচন্দ্র সেনের ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’। এখানে আছে কায়কোবাদের ‘মহাশ্মশান’ কাব্যগ্রন্থটিও।

অমর একুশে গ্রন্থমেলার সব স্টলই সাদা ঝকঝকে কাগজ আর রঙিন প্রচ্ছদের বই দিয়ে সাজানো। ভিন্ন শুধু সেবা প্রকাশনী। শক্ত কাগজের প্রচ্ছদ আর নিউজপ্রিন্টে ছাপানো বইগুলো কিনতে প্রতিদিনই ভিড় থাকে সেবাতে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এটিও মেলায় অংশ নেওয়া অন্যতম পুরনো প্রকাশনা সংস্থা। ১৯৬৩ সালের মে মাসে কাজী আনোয়ার হোসেন এর প্রতিষ্ঠা করেন। পেপারব্যাক সাহিত্যের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ সৃষ্টির ব্যাপারে এ প্রকাশনী অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বরাবরের মতো সেবা থেকে প্রকাশিত মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, কুয়াশা, কিশোর হরর, রোমহর্ষক সিরিজ, কিশোর ক্লাসিক, সেবা রোমান্টিক ও ওয়েস্টার্ন সিরিজের বিক্রি ভালো।

পুরনো প্রকাশনা সংস্থাগুলোর মধ্যে সব শেষে নাম নিতে হয় মুক্তধারার। তবে অমর একুশে গ্রন্থমেলার সঙ্গে মুক্তধারা ও এর প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন সাহার ভূমিকা চিরস্মরণীয়। চিত্তরঞ্জন সাহার হাত ধরেই এ মেলার শুরু। ১৯৮৫ সালে ‘মুক্তধারা’ নামে চিত্তরঞ্জন সাহা প্রকাশনা শুরু করেন। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কথা স্মরণ করে একমাত্র সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে মুক্তধারার স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বাংলা একাডেমি অংশে। তবে সেখানে এখনও পুরনো বইয়ের সম্ভার। নতুন প্রকাশিত বইও রয়েছে, তবে তা সংখ্যায় কম। মুক্তধারার দায়িত্বে থাকা সজীব সাহা বলেন, পুঁজিবাদের কারণে সত্যিকারের সাহিত্য হারিয়ে যাচ্ছে। চাকচিক্যের আড়ালে মূল সাহিত্যের আশা করাটাই এখন কঠিন।

গতকাল রোববার মেলায় এসেছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তিনি বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে আইডিয়া প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ৮টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। বইগুলো হলো- আফতাব হোসেনের ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’, আল আমিন রহমানের ‘মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরের নীলফামারী’ এবং ‘বীরমাতাদের বোবা কান্না’, ডা. সাকলায়েন রাসেলের ‘অফটপিক’, রেজাউল করিম মুকুলের ‘দাস ও দেবতাগণ’, তাসমিন আফরোজের ‘জলফড়িংয়ের ডানা’, আব্দুর রাজ্জাকের ‘কোনভাবে অনুরণন’ এবং আব্দুল আউয়ালের ‘শিশিরভেজা রোদ’।

নতুন বই :বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মেলার ১৮তম দিনে নতুন ১৩৩টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে গল্প ২৩, উপন্যাস ১৫, প্রবন্ধ ৮, কবিতা ৫০, গবেষণা ১, ছড়া ৪, জীবনী ৪, মুক্তিযুদ্ধ ১, ভ্রমণ ৩, ইতিহাস ২, চিকিৎসা/স্বাস্থ্য ২, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ৪ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর এসেছে ১৬টি বই।

এর মধ্যে রয়েছে- পারভেজ হোসেনের ‘বাংলাদেশের ছোটগল্প’ (নবযুগ); মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘ইউনুস এমরের কবিতা’ (পাঞ্জেরী); প্রভাষ আমিনের ‘স্বর্গ নেই, আছে উপসর্গ’ (অন্যপ্রকাশ); আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘রকমারি রচনা’ (রাত্রি); জাকির তালুকদারের ‘উপন্যাস চতুষ্টয়’ (পুঁথিনিলয়); কামরুন নাহার শিল্পীর ‘কবিতার নীড়ে আলোর বীজ’ (মনন প্রকাশ); কাজী সাজেদুর রহমানের ‘উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা :উন্নয়নের রূপরেখা’ (দেশ পাবলিকেশন্স); আনিসুজ্জামানের ‘বিদ্যা সাগর ও অন্যেরা’ (অন্যপ্রকাশ); শওকত আলীর ‘বামন’ (ইত্যাদি); তারেক শামসুর রেহমানের ‘আন্তর্জাতিক রাজনীতিকোষ’ (শোভা); মোস্তাফা জব্বারের সুবর্ণ শেকড় (তাম্রলিপি); ময়ুখ চৌধুরীর ‘জারুলতলার কাব্য’ (বাতিঘর); শাহজাহান সরদারের ‘রিপোর্টার থেকে সম্পাদক’ (উৎস); রুদ্র আরিফের অনুবাদে কুরোসওয়ার আত্মজীবনী (ঐতিহ্য) এবং সুমন কুমার দাশের চৌদ্দ ভুবন (জয়তী)।

আজ আসবে ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার ১০০ নির্বাচিত ভাষণ (১৯৮১-২০১৮)’ :আজ মেলায় আসবে ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার ১০০ নির্বাচিত ভাষণ (১৯৮১-২০১৮)’ গ্রন্থটি। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য ও ‘উত্তরণ’ পত্রিকার সম্পাদক নূহ-উল-আলম লেনিনের সম্পাদনায় গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ‘ভাষাচিত্র প্রকাশন’। গ্রন্থটির সহকারী সম্পাদক উত্তরণের নিজস্ব প্রতিবেদক তরুণ গবেষক রায়হান কবির। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দুই খণ্ডে প্রকাশিত গ্রন্থে শেখ হাসিনার ৩৭ বছরের উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ১০০টি ভাষণ সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উৎসর্গ করা হয়েছে।

মূল মঞ্চের আয়োজন :গতকাল বিকেলে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘এ এফ সালাহ্‌উদ্দীন আহ্‌মদ মুজাফ্‌ফর আহমদ চৌধুরী এ কে নাজমুল করিম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মুনতাসীর মামুন, মীজানুর রহমান শেলী এবং সোনিয়া নিশাত আমিন। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোলের পরিচালনায় বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের আবৃত্তি পরিবেশনা।

আজকের অনুষ্ঠানসূচি :আজ সোমবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৯তম দিন। মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেলে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। আলোচনায় অংশ নেবেন কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন এবং ফাহমিদা খাতুন। সভাপতিত্ব করবেন হাসনাত আবদুল হাই। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হবে সামিউন জাহান দোলার একক অভিনয়ে ধ্রুপদী অ্যাক্টিং স্পেসের নাটক ‘নভেরা’।সমকাল।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত