প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘স্বনির্ভর বাংলাদেশে’ কালো ছায়া

ডেস্ক রিপোর্ট : অসহায় ও দরিদ্র মানুষকে স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে প্রায় ৩২ বছর ধরে কাজ করছে ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’। দেশের এ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার এখন আরেক বৃহৎ এনজিও প্রশিকার মতো ডুবতে বসেছে। এর ওপর কালো থাবা পড়েছে একটি প্রভাবশালী মহলের। প্রায় হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে এ প্রতিষ্ঠানের। রাজধানীর লালমাটিয়ার শতকোটি টাকা মূল্যের দুটি অফিস দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে দখলকারী চক্র।

প্রতিষ্ঠানটি এখন গভীর সংকটাবস্থা পার করছে। ইউএসআইডির অর্থায়নে সূর্যের হাসি ক্লিনিক ছাড়া অন্য সব প্রকল্প থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন দাতারা। ঋণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ায় মাঠে পড়ে আছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। গ্রুপিং, দখল আর পাল্টা দখলের ভিড়ে সংস্থার শতকোটি টাকাও বেহাত হওয়ার পথে। সাত মাস ধরে কর্মীদের বেতন-ভাতা বকেয়া পড়েছে। আট মাস ধরে নেই অফিস ভাড়া। প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। কর্তৃত্ব নিয়ে দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি কমিটি, কয়েক মাস পরপর সংগঠনের প্রধান কার্যালয় দখলে নেওয়া আর মামলা-মোকদ্দমায় সংস্থাটির সব অর্জন ভেস্তে যেতে বসেছে।

সাবেক সচিব এবং সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান এসএম আল-হোসায়নী ১৯৭৫ সালে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠন করেন। এর অঙ্গ সংগঠন হিসেবে ১৯৮১ সালে গঠন করা হয় ‘স্বনির্ভর ওয়ার্কার্স ট্রাস্ট’। প্রতিষ্ঠাকালে কফিল উদ্দিন মাহমুদকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের একটি ট্রাস্টি কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে এসএম আল-হোসায়নী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কৃষিবিদ মমতাজ উদ্দিন খান, সাবেক সচিব এমএ সাত্তার, সাবেক আইজিপি আলমগীর এমএ কবির প্রমুখ। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে কার্যক্রম শুরু করে স্বনির্ভর বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের ৪৪ জেলায় এর কার্যক্রম আছে।

২০১২ সালে স্বনির্ভর বাংলাদেশের সভাপতি এসএম আল-হোসায়নী সংস্থার পরিচালক (করপোরেট রিলেশন) আক্তার হোসেন খানের পরামর্শে স্বনির্ভর বাংলাদেশের গভর্নিং বোর্ডের সদস্য (ট্রেজারার) হিসেবে নজরুল ইসলাম খানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর পর থেকে সংস্থার পরিচালনায় কার্যনির্বাহী কমিটির মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি শুরু হয়। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এসএম আল-হোসায়নীকে সরিয়ে দেওয়ারও প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন। এক পর্যায়ে এসএম আল-হোসায়নীকে সংস্থায় আত্মীয়করণের অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়। সংস্থার পুরনো ও প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মকর্তাদের প্রধান কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়।

অবৈধ নতুন কমিটির বরখাস্ত বিষয়ে আদালতে বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করে স্থিতাবস্থা পান এসএম আল-হোসায়নী। আদালতের এ স্থগিতাদেশ নিয়ে প্রধান কার্যালয় নিজের আয়ত্তে নেন তিনি। এর পর তিনি ২০১৪ সালের ১২ জুন নতুন কমিটির সঙ্গে থাকা ১৩ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে চাকরিচ্যুত করেন। জানা যায়, ওই দিন রাতেই চাকরিচ্যুতদের নেতৃত্বে একদল কর্মী ও ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা এসএম আল-হোসায়নী ও তার নেতৃত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মীদের প্রধান কার্যালয় থেকে বের করে দেয়।

ওই সময় গঠিত কমিটির সভাপতি হন তাহেরুনেছা আবদুল্লাহ। পরে তিনি এবং কয়েকজন সদস্য নিজেদের উদ্যোগে সংস্থার অডিট করে ভয়ঙ্কর সব অনিয়মের চিত্র পান। এ অবস্থায় তারা স্বেচ্ছায় কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন- তাহেরুনেছা আবদুল্লাহ, এ কে এম আশরাফুল ইসলাম, ড. ইফতেখার আলম। সভাপতি পদ থেকে তাহেরুনেছা আবদুল্লাহ পদত্যাগ করায় নজরুল ইসলাম খানকে নতুন সভাপতি করা হয়।

এদিকে এ নতুন কমিটি ভেঙে দেওয়ার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন এসএম আল-হোসায়নী। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ১৩ মার্চ নতুন কমিটির সব সদস্যকে বরখাস্ত করে সমাজসেবা অধিদপ্তর। ওই দিনই সমাজসেবা থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তত্ত্বাবধায়ক কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় সারোয়ার আলম রাজীবকে।

বরখাস্ত কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি, সহসভাপতি এবং কোষাধ্যক্ষ আগেই পদত্যাগ করায় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ড. মামুন অর রশীদ স্বনির্ভর বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল তত্ত্বাবধায়ক কমিটির আহ্বায়কের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। বর্তমানে স্বনির্ভর বাংলাদেশের কর্মকর্তা ও কর্মীরা অফিসে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছেন। তবে আগের বরখাস্ত কার্যনির্বাহী কমিটি কর্তৃক অব্যাহতিপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা পরিচয়পত্র, প্যাড ও সিল ব্যবহার করে সংস্থার কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনসহ যোগাযোগ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক কমিটির আহ্বায়ক সারোয়ার আলম রাজীব সমকালকে বলেন, সংস্থাটির বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকায় তত্ত্বাবধায়ক কমিটি ও সংস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আর্থিক জটিলতায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। আঞ্চলিক ও ইউনিট কার্যালয়গুলোও সংকটে পড়েছে।

সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে জালিয়াতি

স্বনির্ভর বাংলাদেশের কর্মীরা শুরু থেকে কাজে যোগদানের সময় নিজেদের কল্যাণের জন্য ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি থেকে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে গড়ে তোলেন স্বনির্ভর ওয়ার্কার্স ট্রাস্ট। কর্মীদের চাঁদায় ট্রাস্টটি গড়ে ওঠে। এ ট্রাস্টের নামে রাজধানীর লালমাটিয়ায় সি ব্লকে ১০ ও ডি ব্লকে ৬ কাঠা জমির ওপর রয়েছে বহুতল দুটি ভবন, যার বর্তমান বাজারমূল্য দেড়শ’ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে সুদসহ আছে প্রায় শতকোটি টাকার ৪৩টি এফডিআর; সারাদেশে সূর্যের হাসি ক্লিনিকের জন্য ৩০টি নিজস্ব ভবন; টাঙ্গাইলের মধুপুরে ৩০ একর জমি; তিনটি ব্যাংকে কর্মীদের গ্রুপ ফান্ডেও রয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা।

জালিয়াতির মাধ্যমে ওয়ার্কার্স ট্রাস্টের শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিতে স্বাক্ষর জালিয়াতি করে পদত্যাগী দেখানো হয় ট্রাস্টের সভাপতিসহ অন্য সদস্যদের। এমনকি মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে তাদের স্বাক্ষরও জাল করা হয়। সমাজসেবা কর্তৃক স্বনির্ভর বাংলাদেশের বরখাস্ত কার্যনির্বাহী কমিটির একজন এবং সংস্থা থেকে চাকরিচ্যুত আক্তার হোসেন খান (পরিচালক-করপোরেট রিলেশন) চক্র সম্পত্তিটি হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নজিরবিহীন জালিয়াতির আশ্রয় নেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আক্তার হোসেন খান নিজেকে স্বনির্ভর ওয়ার্কার্স ট্রাস্টের সভাপতি এবং নজরুল ইসলাম খানকে স্বনির্ভর বাংলাদেশের সভাপতি দেখিয়ে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এবং ফার্মস থেকে অবৈধভাবে দুটি নিবন্ধন করিয়ে নেন, আপত্তির মুখে যা এখন বাতিলের অপেক্ষায়। জানা যায়, ১৯৮১ সালে গঠিত কমিটির বিখ্যাত ব্যক্তিদের (যারা অনেক আগেই পরলোকগমন করেছেন, তাদের জীবিত দেখিয়ে) স্বাক্ষর জাল করে স্বনির্ভর ওয়ার্কার্স ট্রাস্টের নতুন কমিটি গঠন করে অনুমোদন নেওয়া হয়। এই দুই কমিটির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন এসএম আল-হোসায়নী।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে এসএম আল-হোসায়নী সমকালকে বলেন, ওয়ার্কার্স ট্রাস্টের সাবেক সভাপতি ও সাবেক আইজিপি আলমগীর এমএ কবিরকে ২০০০ সালে পদত্যাগ দেখিয়ে ২০১৪ সালে এফিডেভিট করা হয়। অথচ আলমগীর এমএ কবির নব্বইয়ের দশকে মারা যান। এমনকি আলমগীর এমএ কবিরের ছবির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে সাবেক রাষ্ট্রদূত মরহুম রেজাউল করিমের ছবি। তিনি জানান, সর্বশেষ সভাপতির দায়িত্ব থেকে তাকেও একই তারিখে পদত্যাগ দেখিয়ে আজাদ মিয়াকে সহসভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে নোটারি পত্রে। প্রকৃতপক্ষে তিনি পদত্যাগ করেননি। সাবেক সচিব ড. এমএ সাত্তার ছিলেন স্বনির্ভর ওয়ার্কার্স ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক। তাকেও ২০০০ সালে পদত্যাগ দেখানো হয়। প্রকৃতপক্ষে এমএ সাত্তার ১৯৯২ সালের ২৬ মে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মৃত্যুবরণ করেন। এমনভাবে স্বনির্ভর ওয়ার্কার্স ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতাদের স্বাক্ষর নকল ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ট্রাস্টটি দখলের চেষ্টা চলছে।

তিনি জানান, এ ব্যাপারে ঢাকার মুখ্য মহানগর আদালতে মামলা হয়েছে। এই মামলায় সিআইডি তদন্ত করে জালিয়াতির প্রমাণসহ প্রতিবেদন দাখিল করেছে। মামলাটি এখন বিচারাধীন।সমকাল।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত