প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অব্যবস্থাপনায় লাগাতার প্রশ্ন ফাঁস

তারেক : দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে ঘটছে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই প্রশ্ন পৌঁছে যাচ্ছে পরীক্ষার্থীদের হাতে। ইংরেজি মাধ্যমে কখনো প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা না ঘটলেও বাংলা মাধ্যমের অবস্থা হ য ব র ল। প্রশ্ন ফাঁসে জড়িতদের ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করলেও লাগাম টানা যায়নি অপরাধীদের। লাগাতার প্রশ্ন ফাঁসের জন্য কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনাকে দুষলেও মিলছে না সমাধান।

প্রমাণ পেয়েছে যাচাই কমিটি : চলতি এসএসসি পরীক্ষার একটি বিষয়ের সম্পূর্ণ এবং কয়েকটির আংশিক প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পেয়েছে যাচাই কমিটি। এ কারণে সেসব পরীক্ষা বাতিলের সুপারিশ করতে যাচ্ছে এ সংক্রান্ত কমিটি। প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ সংক্রান্ত তথ্য যাচাই-বাছাই কমিটির প্রধান মো. আলমগীর গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা জানান। এসএসসিতে প্রায় প্রতিটি বিষয়ের প্রশ্ন ফেসবুকসহ ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে আসার পর সমালোচনার মুখে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীরকে প্রধান করে এ কমিটি করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রশ্ন ফাঁসের কোনো প্রমাণ পেয়েছেন কি— এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, ‘আছে, কিছু কিছু আংশিক আছে। কিছু কিছু পুরোপুরি আছে। যেসব বিষয়ের আংশিক ফাঁস হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে পুরো পরীক্ষা বাতিলের সুপারিশ করবে না কমিটি। সচিব বলেন, যদি অবজেকটিভ টাইপের প্রশ্ন ফাঁস হয়ে থাকে বাকিটার পরীক্ষা নতুন করে নেব না, শুধু অবজেকটিভের জন্য পরীক্ষা হবে। তবে পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগে প্রশ্ন ফাঁস হলে সেগুলো বাতিলের পক্ষপাতী নন তিনি। আর যদি দেখা যায়, পরীক্ষা চলাকালীন বা আধা ঘণ্টা আগে ৫০০ ছেলেমেয়ে এর সঙ্গে জড়িত, এ জন্য তো ২০ লাখ ছেলেমেয়ের পরীক্ষা বাতিল করা ঠিক হবে না। আলমগীর বলেন, বাতিল করবে মন্ত্রণালয়, আমরা সুপারিশ করার মালিক। প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ সংক্রান্ত তথ্য যাচাই-বাছাই কমিটির প্রধান জানান, আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি আরেকটি সভা করে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করবেন তারা। আর ওই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে ২৬ ফেব্রুয়ারি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে তথ্য দিচ্ছে জানিয়ে সচিব বলেন, ফেসবুক গ্রুপে কখন প্রশ্ন দিচ্ছে, কে কে প্রশ্ন কেনাবেচা করছে এ বিষয়ে তাদের গ্রেফতার করে তারা জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

বিতরণ ব্যবস্থার ফোকর গলে বেরিয়ে যায় প্রশ্ন : সারা দেশে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার অধিকাংশ প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগেই পরীক্ষার্থীদের হাতে চলে যাচ্ছে। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে দিনদুপুরে। এবার ৩০ মিনিট আগে হলে প্রবেশের বাধ্যবাধকতা করলেও শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানো যায়নি। শুধু ইংরেজি, বাংলা নয়, এখন বিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁসেরও সত্যতা মিলেছে। বাংলা প্রথম পত্র, বাংলা দ্বিতীয় পত্র, ইংরেজি প্রথম পত্র, ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রসহ অনুষ্ঠিত অধিকাংশ পরীক্ষারই প্রশ্নপত্র পরীক্ষার অন্তত এক ঘণ্টা আগেই পাওয়ার খবর বেরিয়েছে। মুঠোফোনের বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে এসব প্রশ্ন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্নের সমাধানও পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিন থেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও মুঠোফোনে এসব প্রশ্ন পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা শেষ হয়। অভিভাবকদের অভিযোগ, এবার প্রশ্নপত্রের নৈর্ব্যক্তিক অংশের বেলায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটেছে।

ইংরেজি মাধ্যম সুরক্ষিত বাংলা অরক্ষিত : ইংরেজি মাধ্যমে প্রায় ৫০টির মতো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছর নিয়মানুযায়ী এসব পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ কখনই ওঠেনি। প্রাযুক্তিক নিরাপত্তায় এই পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে দুশ্চিন্তায় কাটাতে হয় না শিক্ষার্থীদের। বিশ্বব্যাপী ব্রিটিশ কাউন্সিল প্রতিবছরই পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে অথচ এটা নিয়ে নেই কোনো অভিযোগ। কিন্তু বাংলা মাধ্যমে প্রতিবছরই ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ হচ্ছে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ। বিশ্বের মানদণ্ডে ইংরেজি মাধ্যমের পরীক্ষায় ফলাফলকে সবাই একবাক্যে স্বীকৃতি দেয়। নতুন তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে এই পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অথচ বাংলা মাধ্যমে প্রযুক্তির অপব্যবহারে ফাঁস হচ্ছে প্রশ্ন। প্রশ্ন ফাঁসে জড়িয়ে পড়ছে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অভিভাবকরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে ঘটছে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। বিভিন্ন ব্যক্তির আইডি থেকে এসব বার্তা ছড়ানো হলেও তারা থেকে যাচ্ছে অধরা। তথ্য-প্রযুক্তির উন্নতিতে সবকিছুর পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসেও এসেছে আধুনিকায়ন, ফাঁসের ধরনেও লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। পূর্বের প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি এখন প্রশ্ন ফাঁসে ব্যবহার করা হচ্ছে মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, ঘড়ি ও ইন্টারনেট। এসব অপরাধ বিষয়ে আইন থাকলেও দেখা মিলছে না সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও সরকারদলীয় বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা জড়িত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না তারা। ফলে আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যাচ্ছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র।

কেন্দ্রে শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণহীন মোবাইল ফোন ব্যবহার : পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির সময় থেকে প্রতিটি ধাপে নেওয়া হয় কঠোর গোপনীয়তা। এ সময় মোবাইল ব্যবহারে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। পরীক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষকদের মোবাইল ফোন ব্যবহারেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। গত ১০ ফেব্রুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে মোবাইল ফোন ব্যবহার করার অভিযোগে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় কেন্দ্রের দায়িত্ব থেকে পাঁচ শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভূমি কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান পরীক্ষা চলাকালীন কেন্দ্রে স্মার্ট মোবাইল ফোন ব্যবহার না করার জন্য মৌখিকভাবে সতর্ক করে দেন। এর পরেও পরীক্ষা চলাকালীন রংমালা দারুস্ সুন্নাহ্ মডেল আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রে মোবাইল ফোন ব্যবহার করায় পাঁচ শিক্ষককে এসএসসি পরীক্ষার সব কার্যক্রম থেকে তাত্ক্ষণিক অব্যাহতি দেন। একই সময় তিনি কেন্দ্রে দায়িত্বরত শিক্ষকদের মোবাইল ফোনগুলো জব্দ করেন। এ ছাড়া দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে কেন্দ্রে ফোন নিয়ে যাওয়ায় এক শিক্ষককে পরীক্ষা কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

ঘোষণা দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস : ইংরেজি প্রথম পত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে ফেসবুকে দেখা গেছে ব্যাপক অপতৎপরতা। এক পক্ষ প্রশ্ন দেওয়ার আশ্বাসে দর হাঁকছে, অন্য পক্ষ উৎকণ্ঠার সঙ্গে বলছে, কখন পাওয়া যাবে প্রশ্ন। ‘আগে যাদের দিয়েছিলাম সবার কমন আইছে, এবার ইংরেজি দিব, যাদের লাগবে মেসেজ কর।’ একটি ফেসবুক পেজে এভাবেই স্ট্যাটাস দিয়ে প্রশ্নপত্রের অনলাইন বাজার বসানো হয়। ফেসবুকের আরও অনেক পেজ ও গ্রুপে ইংরেজির প্রশ্নপত্র ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে দরকষাকষি করতে দেখা গেছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয় টাকা-পয়সাও। রাখঢাক ছাড়া এভাবেই চলছে লেনদেন, যেন এটি কোনো অপরাধই নয়। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে এ ধরনের অপরাধ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে দণ্ডনীয়। এর মধ্যেই প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ১১ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। ঘোষণা হয়েছে, প্রশ্ন ফাঁসকারীকে ধরিয়ে দিলে মিলবে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার। বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত